Saturday, October 20, 2012

ক্রমবর্ধমান কিশোর অপরাধ :: সম্পাদকীয় :: কালের কণ্ঠ

ক্রমবর্ধমান কিশোর অপরাধসব মহলকে যত্নবান হতে হবে
কিশোর অপরাধ বলতে একসময় অন্যের গাছের ফল চুরি, খেলাধুলা করতে গিয়ে সমবয়সী অন্য কারো সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দেওয়া বা মারামারি করা, শিক্ষক বা অভিভাবকদের আদেশ-নিষেধ অমান্য করা, স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখা- এসবকে বোঝাত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে কিশোর অপরাধের সে সংজ্ঞা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এতটাই চরমে, এখন অনেক কিশোরও জড়িয়ে পড়ছে লোমহর্ষক সব অপরাধের সঙ্গে। জড়িয়ে পড়ছে মাদকের নেশা, মাদক ব্যবসা, চোরাকারবার, এমনকি খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনার সঙ্গে। বিদেশি চলচ্চিত্র, ইন্টারনেটসহ নানা কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এসব অপরাধপ্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এ নিয়ে একদিকে যেমন অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন, তেমনি পাড়া-প্রতিবেশীরা কোমলমতি কিশোরদের ওপর হারাচ্ছে আস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপরাধী কিশোরদের আদালতে সোপর্দ করার ক্ষেত্রে বিব্রত হতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করার সময় এসেছে।
এদিকে কিশোর অপরাধের আইন নিয়েও রয়েছে জটিলতা। বাংলাদেশে সাধারণত সাত থেকে ১৬ বছর বয়সীদের কিশোর-কিশোরী বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সাবালকত্ব আইন, ১৮৭৫-এর ৩ ধারা অনুযায়ী একজন কিশোরের ১৮ বছর পূর্ণ হলে নাবালকত্বের অবসান ঘটে। দণ্ডবিধির ৮২ ধারা অনুসারে, ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর কোনো ধরনের অপরাধই আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য নয়। ১৮৭৪ সালের চিলড্রেন অ্যাক্ট অনুসারে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীদের কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আবার জামিনের ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীদের বেলায় আইন অত্যন্ত মানবিক। যেমন- ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭(১) ধারা অনুযায়ী, ১৬ বছরের নিচে যে কাউকে, এমনকি জামিন অযোগ্য অপরাধেও আদালত জামিন দিতে পারবেন। এমনকি ১৬ বছরের নিচে যে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে এবং সঙ্গে সঙ্গে আদালতে উপস্থিত করা সম্ভব না হলে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাকে জামিন দিতে পারবেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মূলত এই আইনগুলোরই এ মানবিকতার সুযোগ নিয়ে থাকে দুষ্টচক্র। এরই পরিণতিতে বাড়ছে কিশোর অপরাধ। সুতরাং কিশোর অপরাধে যাতে শিশু-কিশোররা জড়িয়ে না পড়ে, সেদিকটায় সমাজ ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সবাইকে নজর দিতে হবে।
বর্তমানে শিশু-কিশোরদের গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ মাদক সেবন এবং পরবর্তী সময়ে মাদক ব্যবসায় জড়িত হওয়া। এই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে শিশু-কিশোরদের অপরাধ অনেকটা হ্রাস পাবে। আর শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিনোদন যেমন- খেলাধুলা, সংগীত, গ্রন্থপাঠ, শিক্ষাসফর, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। সুস্থ বিনোদনের অভাব থাকলে শিশু-কিশোরদের অতি কোমল স্পর্শকাতর মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেইসঙ্গে অভিভাবকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। জনপ্রিয় স্লোগান- আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ না ঘটলে জাতির জন্য ভবিষ্যতে মেধাবী নেতৃত্ব পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। সুতরাং এখনই শিশু-কিশোরদের মঙ্গল ও কল্যাণের ব্যাপারে রাষ্ট্র তথা সরকার ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

Thursday, October 18, 2012

সমকাল :: আজকালের বিশ্ববিদ্যালয় ::


আজকালের বিশ্ববিদ্যালয়
 
রেটিং :
 
0%
 
গড় রেটিং:
 মনোজিৎ মিত্র
'বিশ্ববিদ্যালয়' নামের মাহাত্ম্য বাংলার বুকে আজ সাদামাটা শুকনো খড়খড়ি। সেই কবেকার নালন্দার স্বপ্ন আজ অতীতের অতিকল্পনা। এমনকি এই সময়ের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধাত্রীমাতা 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' কেবলই সুবিধা লাভের নামফলক। শহরের মোড়ে মোড়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয়। টাকার জোরে ঘরে বসে ডিগ্রি লাভের দিন আর খুব বেশি দূরে নয়। হয়তো গোপনে চলেও এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কী বা কেন বিশ্ববিদ্যালয়_ এসব প্রশ্নের অন্তরালে প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ঢাকা পড়ে যায়। মৃতপ্রায় জীর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা কী শিখছি? এই শেখার জায়গা থেকে বিচার করতে বসলে দেখা যায়, যাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলে আমরা আসলে ভাবছি, তা কেবলই এক সংকীর্ণ কূপমণ্ডূক শিক্ষা কারখানা। শিক্ষার্থীরা এখানে বেকারি কারখানার ময়দা বা আটার মতো, বিস্কুট বা পাউরুটি হয়ে কেবল বেরিয়ে যাওয়া। এই বেরিয়ে যাওয়ার ভেতরেই চলে মূল প্রতিযোগিতা। কে কীভাবে বের হলো? কার ফ্লেভার কেমন? দর্শন বা ইতিহাস বা বাংলার ফ্লেভার একেবারের পাতে তোলার অযোগ্য। মার্কেটিং, অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স, আরে বাব্বা কাড়াকাড়ির কী বাড়াবাড়ি! এই যেখানে শেখানো হয় তার পেছনে হাজারো বিশ্ববিদ্যালয় লাগানো থাকলেও তা কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় নয়। দ্বিতীয়ত, যেখানে শিক্ষার্থী কেবল মুখস্থ করে পাস করে যায় সেই প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় নয়। সর্বোপরি কোনো শিক্ষার দোকান বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না।
একটি চাকরি, স্রেফ ভালো একজন চাকর হওয়ার জন্য যে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে থাকে তার কাছে বিশ্বের সন্ধান মিলবে কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে স্কুল-কলেজের এত চেনামুখের সবাই কোথায় হারিয়ে যায়? কীভাবে হারায়? কেন হারায়? এ বিষয়ে খুব সহজ একটা প্রতারক উত্তর সমাজে প্রচলিত আছে_ 'তুমি যোগ্য তাই, টিকে আছ।' একজন ছাত্র যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় না, কিংবা আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা ছাত্র যখন বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না, তখন তাদের দুইয়ের অবস্থা একই দাঁড়ায়। আসলে শিক্ষা ব্যবস্থার কৌশলী ধারা এই হীনম্মন্যতাকেই সবসময় পরিপুষ্ট করে রাখে। যাতে সত্যিকারের শিক্ষার আবেদন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে না পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রক্রিয়ায় পুরোটা জুড়ে কেবল শিক্ষা নামের আপাত লেবাস। যার অন্তরালে কেবল অশিক্ষা আর কুশিক্ষার কুৎসিত দেহ। সবচেয়ে প্রধান দুই উপাদান শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক কেবল ক্লাসের রোলকল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রকে জোর করে ক্লাসে আটকে রাখার জন্য প্রশাসনের কী আপ্রাণ প্রচেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আগের শিক্ষাজীবন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটে, সেহেতু তিনি জানেন এর সব খারাপটা। এই খারাপ দেখে দেখেই তার বেড়ে ওঠা, ফলে তিনি বের হতে পারেন না এই বৃত্ত থেকে। আজকের অধিকাংশ তরুণ শিক্ষকই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সত্যিকারের শিক্ষা না
পেয়েই শিক্ষা শেষ করেছেন। ফলে তাদের কাছে যারা শিখছে তাদের অবস্থা আরও গুরুতর এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, অনেক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও এর শিক্ষা প্রক্রিয়া দ্রুতই এ ব্যবস্থার প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তৈরি করে। এসব বিরূপতা এখন অসন্তোষের দিকে একটু একটু করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় তো আজ কেবল একটি সার্টিফিকেট দেওয়ায় মাধ্যম মাত্র। এখানে পদার্থবিদ্যা যা ভূগোলও তাই। কোনো বিজ্ঞানী তো দূরের কথা একজন বিজ্ঞানমনস্ক লোকও আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় গড়ে ওঠা সম্ভব কি?
তারপরও প্রতি বছর হাজার হাজার প্রাণোচ্ছল শিক্ষার্থী নতুন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে আর সবকিছু হারিয়ে কেবল একটি সার্টিফিকেট নিয়ে প্রাণসর্বস্ব হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তবে এই মানুষগুলোর মাঝে বর্তমানে ভোগী, কপট, স্বার্থপর কুশিক্ষার বদলে নতুন মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা আনার চিন্তাও বাড়ছে।
য় মনোজিৎ মিত্র : শিক্ষার্থী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সমকাল :: নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ::


নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা
 
রেটিং :
 
0%
 
গড় রেটিং:
 তানিম ইশতিয়াক
আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনে সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। জনগণের পছন্দের সরকারকে ক্ষমতায় আসতে না দেওয়া এবং দীর্ঘদিনের শোষণ-বঞ্চনার কারণেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হয়। দুঃখজনক যে, গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন হওয়া এ দেশটিই অনেককাল থেকে গেছে গণতন্ত্রের বাইরে। গণতন্ত্রের জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন দরকার তা বাংলাদেশে দেখা যায়নি। দুর্নীতি, অনৈতিকতা, দলীয়করণ ও পরিবারতন্ত্রের কারণে এক অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা, অবিশ্বাস ও কোন্দলে রাজনীতি সবসময় সংঘাতময় থেকেছে। স্বাধীনতার পর আজ অবধি নয়টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার পাঁচটিই ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে। সেসব নির্বাচন কারচুপি, ভোট চুরি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, দলীয় প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগে যথার্থ গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন '৯০, '৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এ ব্যবস্থার কিছু নেতিবাচক প্রভাব বিচার বিভাগের ওপর পড়ে। বিচারপতিদের অবসরের বয়স ২ বছর বাড়ানো এবং কেএম হাসানের উপদেষ্টা হওয়ার পথ তৈরি হওয়া উদ্দেশ্যমূলক বলে বিরোধী দল আন্দোলন শুরু করে। দেশ সাংঘাতিক নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ে। পরে ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর ক্ষমতায় থেকে যায়। অতঃপর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় পর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। সম্প্রতি ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আদালতের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর আগামী নির্বাচনের ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ কয়েকটি দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন করছে। সরকারের অবস্থান অনমনীয়, তারা দলীয় নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে চায়। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে পাঁচটি নির্বাচন ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এসেছিল? সেসব রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এখন শেষ হয়ে গেছে? বলা হতে পারে, সেই সরকারগুলো নির্বাচিত ছিল না। এখন নির্বাচিত সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। কিন্তু আমাদের সামনে '৯৬ সালের মাগুরা নির্বাচনের উদাহরণ রয়েছে। উপরন্তু নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম নয়।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হতে হলে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়কে বাস্তবতা ও আদালতের নির্দেশনার আলোকে ভাবতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দল শুধু আন্দোলন করে কোনো সুফল পাবে বলে মনে হয় না। তারা সংসদে গিয়ে এ বিষয়ে কথা বলা ও পারস্পরিক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টিতে চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে সব দলকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। যদি একতরফাভাবে নির্বাচনের আয়োজন করা হয় এবং প্রধান বিরোধী দলসহ কিছু দল নির্বাচনের বাইরে থেকে যায়, তবে সে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এ ছাড়া সংঘাতময় ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হলে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হতে পারে। এর দায়ভার আওয়ামী লীগের ঘাড়েই চাপবে। আদালতের রায়ে অবশ্য আগামী দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে বলে বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নতুনভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, 'সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, অসাংবিধানিক ও অবৈধ হইলেও জাতীয় সংসদ ইহার বিবেচনা এবং সিদ্ধান্ত অনুসারে উপরে বর্ণিত নির্দেশাবলী সাপেক্ষে দশম ও একাদশ সাধারণ নির্বাচনকালীন সময়ে প্রয়োজনমতো নূতনভাবে ও আঙ্গিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।' সুতরাং এখন ভরসা জাতীয় সংসদ। নিজেদের দেশে কোন সরকার আসবে তা বাছাই করার 'মালিক' বা 'মাস্টার' হিসেবে কাজ করে ভোটাররাই, ভোট দিয়ে একটি সার্বভৌম ব্যবস্থাকে চালু রাখে জনসাধারণই। জনসাধারণের পছন্দমতো সরকার গঠনের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা একান্ত জরুরি।
য় তানিম ইশতিয়াক :শিক্ষার্থী
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রেটিং দিন :
 

সমকাল :: বৌদ্ধবিহার থেকে মার্কিন নির্বাচন ::


বৌদ্ধবিহার থেকে মার্কিন নির্বাচন
 
রেটিং :
 
0%
 
গড় রেটিং:
কণ্ঠস্বর
 রাহাত খান
লিখতে চাইছি ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে। তবে উত্তম বড়ূয়ার মা ও বোনকে কেন গ্রেফতার করা হলো, আগে এই প্রশ্ন না করে পারছি না। তদন্তেই প্রমাণিত হয়েছে, উত্তম বড়ূয়ার ফেসবুকে ইসলামবিরোধী, কোরআন শরিফবিরোধী যে বক্তব্য, তা সুকৌশলে ট্যাগ করা হয়েছে। ট্যাগ করার পেছনে যে ছেলেটি যুক্ত, সেই অপরাধীকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ট্যাগ করার কথা পুলিশের কাছে স্বীকারও করেছে গ্রেফতারকৃত ফারুক। সে এই ট্যাগ জালিয়াতের পেছনে জড়িত আরেক ব্যক্তির নামও প্রকাশ করেছে এবং ফারুকের স্বীকারোক্তির খেই ধরে সেই ব্যক্তিকেও ধরা হয়েছে। ফারুক ছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য। রামু, টেকনাফ ও উখিয়ার বহু প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট ও বৌদ্ধদের ঘরবাড়িতে অগি্নসংযোগ কারা করতে পারে, অতঃপর সেটা বোঝা কঠিন নয় মোটেও। জ্ঞানপাপীরাই শুধু খামোকা শব্দের অপচয় ঘটিয়ে হাস্যকর উক্তি করতে পারে।
১৯৭২ সালে বাঙালিদের ওপর ঠিক এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট ও অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছিল বর্বর পাকিস্তান বাহিনী আর তাদের মদদ জুগিয়েছিল আলবদর, রাজাকার ও আলশামসের দালালরা। বৌদ্ধবিহার ধ্বংসের নারকীয় ঘটনা সেই বর্বর ধ্বংসযজ্ঞের স্টাইলকেই মনে করিয়ে দেয়। মওদুদিবাদী জামায়াত এবং অধুনা তাদের রাজনীতির পরিবারভুক্ত বিএনপির কিছু লোকই সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণা বিষবাষ্প উস্কে দিয়ে রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধবিহারের এই ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করেছে। এ বিষয়ে বিএনপির মওদুদির রিপোর্ট সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য! তারা তো নিজেদের করা সব অপকর্ম চাপা দিতে এ ধরনের ঘটনায় আওয়ামী লীগ দায়ী বলে রায় দেন বরাবরই। ২১ আগস্টে জঘন্য গ্রেনেডবাজিতে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যাচেষ্টার পেছনেও নাকি দায়ী ছিল আওয়ামী লীগ নিজেই! সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া দম্ভভরে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার কাছে নাকি প্রমাণপত্রও ছিল!
সেই প্রমাণপত্রের নাম কি জজ মিয়া নাটক? আওয়ামী লীগ এবার ক্ষমতাসীন হওয়ার দেড় মাসের মধ্যে ঘটেছিল পিলখানায় ৪৭ জন দক্ষ, মেধাবী সমরকর্তাদের নির্মম-নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এটাও নাকি বিএনপি-জামায়াতের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগই করেছিল! কেন করেছিল? আওয়ামী লীগ নাকি 'বাংলাদেশ আর্মি'র ওপর নাখোশ!
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ আর্মির ওপর নাখোশ হবে কেন? স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তো গড়ে তুলেছিল বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দীন আহমদের সরকারই। তা ছাড়া ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটা ছিল দেশি-বিদেশি নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ দল ও রাজনৈতিক মহলের মতে, সবচেয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন। সেই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ৪৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারকে হত্যার ষড়যন্ত্র করবে কেন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার?
এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই বিএনপি-জামায়াতের কাছে। সদুত্তর নেই পিলখানা গার্নেজের দিন খুব ভোর-সকালে কালো কাচে ঘেরা গাড়িতে করে তদানীন্তন ক্যান্টনমেন্টের 'বাড়ি' থেকে বেরিয়ে পরবর্তী তিন দিন কোথায় পালিয়ে ছিলেন বিএনপির প্রধান বেগম খালেদা জিয়া! বিশেষ একটি দেশের হাইকমিশনে? সম্ভবত তাই। কিন্তু পালিয়ে তিন দিন নিখোঁজ ছিলেন কেন? খালেদা জিয়া কোনোদিন এ প্রশ্নের উত্তর দেননি। যেমন উত্তর দেননি ফখরুদ্দীন সরকার আমলে তার ও তার 'যোগ্য' অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের কালো টাকা সাদা করার ঘটনাটির। এটা কি দুর্নীতির চরম পরাকাষ্ঠা নয়? অন্য কোনো সভ্য দেশ হলে শুধু কালো টাকা দণ্ড দিয়ে সাদা করার অপরাধেই রাজনীতিতে ডিসকোয়ালিফাইড বলে গণ্য হতেন তারা। এসব লোক এবং তাদের দল ও মিত্ররা যখন সবকিছুর জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে, অবাক হই না। কারণ, কে না জানে এক কান কাটা চোর কাটা কান হাতচাপা দিয়ে বাজারে ও জনসমাগমে চলাফেরা করে। কিন্তু চুরির দায়ে দুই কান কাটা চোর কান হাতচাপা না দিয়েই চলাফেরা করে! ন্যাংটার আবার বাটপারের ভয় কি?
আওয়ামী লীগ, সরকারের সংযুক্ত অন্যান্য দল, কমিউনিস্ট পার্টিগুলো (হক, তোয়াহা, মতিনের অনুসারী ছাড়া) অসাম্প্রদায়িক, এটা বহু বছর ধরে রাজনীতিতে পরীক্ষিত সত্য। এরপরও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘৃণ্য অনুসারীরা দেশে সংঘটিত যে কোনো বড়মাপের হত্যাযজ্ঞ এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হত্যা ও লুটপাটের মতো জঘন্য ঘটনার জন্য দায়ী করে আওয়ামী লীগকে! এতে আর কিছু না হোক, দুই কান কাটা সাম্প্রদায়িক দলগুলোর নির্লজ্জতা নানাভাবে নানারূপে ঠিকই প্রকাশ পায়।
বৌদ্ধবিহারের ঘটনার নেপথ্যে উত্তম বড়ূয়ার ফেসবুককে কৌশলে ব্যবহার করা হয়েছে। এটা এখন প্রমাণিত সত্য। এরপরও উত্তমের মা-বোনকে গ্রেফতার করা হয়েছে কেন? পুলিশ বা প্রশাসনের কারা এই কাজটা করেছে? যারাই করে থাকুক, তারা যে দেশের সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তানপন্থি লোকদের অনুসারী ও এজেন্ট এবং সরকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা সরকারের শত্রু, এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এদের চিহ্নিত করা উচিত। সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকর সরকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা এসব আমলা ও পুলিশকে সরিয়ে না দিলে এর ফল সরকারকেই ভোগ করতে হবে। মনে রাখা দরকার, বৌদ্ধবিহার ধ্বংসে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় এমনিতে সংক্ষুব্ধ। তার ওপর সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ঘরের শত্রু বিভীষণরা যদি উত্তম বড়ূয়ার মা ও বোনকে গ্রেফতারের প্রশ্নে আরও সংক্ষুব্ধ হয়, তাহলে আর কোনোভাবে না হোক, ২০১৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে এই সংক্ষোভের প্রতিফলন ঘটবেই। আর চক্রান্তবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি তো সেটাই চায়।
আমি যখন এই লেখা তৈরি করছি, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান দুই প্রার্থী_ বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক এইচ ওবামা এবং তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মিট রমনির মধ্যে দ্বিতীয় দফা তর্কযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। প্রথম তর্কযুদ্ধে ওবামা ছিলেন রক্ষণাত্মক এবং ম্রিয়মাণ। এতে করে তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা মিট রমনির ঔজ্জ্বল্যের কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। প্রথম তর্কযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ওবামা রমনির চেয়ে বরাবর পাঁচ থেকে দুই পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু বিতর্ক শেষ হওয়ার পর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পেশাদার জরিপের ফলাফলে মিট রমনি শুধু সেই ব্যবধান কমিয়েই আনেননি, সব বিচারেই ওবামার চেয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন দুই থেকে পাঁচ পয়েন্টে। রিপাবলিকান পার্টি বিভক্তি মতভেদ ও স্ববিরোধিতা কাটিয়ে যেন নবজীবন লাভ করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলো তাদের হাত থেকে জনগণের গ্রহণযোগ্যতার গুণে বারাক ওবামার আয়ত্তে চলে গিয়েছিল, অথচ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রশ্নে অত্যাবশ্যক সেসব রাজ্যের কোনো কোনোটি এখন আবার চলে গেছে রিপাবলিকানদের আয়ত্তে।
অবশ্য দ্বিতীয় তর্কযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ওবামা তার সেই অবিস্মরণীয় বাগ্মিতা, যুক্তিগুণ এবং সপ্রতিভতা বহুলাংশে ফিরে পেয়েছেন বলেই বিভিন্ন গ্যালপ পোলের সূত্রে জানা গেছে। দ্বিতীয় তর্কযুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। বিশেষ করে, ওবামার ট্যাক্স আরোপ, পররাষ্ট্রনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা আইনের বিপক্ষে এবার রমনি আগেরবারের মতো প্রায় ওয়াক পাওয়া দূরে থাকুক, বিতর্কে এসব বিষয়ে ওবামাকে অতিক্রম করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
ওবামার নির্বাচনী ট্রাম্পকার্ড হচ্ছে আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ গোষ্ঠী, উদার নীতিতে বিশ্বাসী মার্কিন শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র ভোটারশ্রেণী এবং মার্কিন মহিলাদের গরিষ্ঠ অংশ। ওবামার নির্বাচনী দুর্বলতা হচ্ছে অর্থনীতিতে ধস, বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আরব বসন্ত আন্দোলনে সঠিক নেতৃত্ব দিতে না পারা। তবে এখন ওবামার পক্ষে যাবে অর্থনীতি শ্লথগতিতে হলেও গতি সঞ্চার হওয়া, বেকারত্ব আগের তুলনায় দেড় পার্সেন্ট কমিয়ে আনা, ইসরায়েলি যুদ্ধবাজ নেতা নেতানিয়াহুর গর্জনে অটল থেকেও ইরান-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়া এবং ইহুদি লবির একটা বড় অংশের সমর্থন পাওয়া। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য দেশে ফিরিয়ে আনতে পারা এবং অতি অবশ্যই, নাইন-ইলেভেনের 'ভিলেন' ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার কৃতিত্ব। সবই নির্বাচনে ওবামার পক্ষে যাবে বলে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।
অন্যদিকে মিট রমনির ট্রাম্পকার্ড হচ্ছে বারাক ওবামার যা কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, সবকিছু বিতর্কে তিনি সুনিপুণ_ সামান্য ব্যর্থতাকেও অসামান্য করে তুলতে পারেন ভোটারদের কাছে। মার্কিনিদের চিরকালীন আদর্শ হচ্ছে পুঁজিবাদকে সম্প্রসারিত করা এবং ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকাকে সমর্থন করা। মার্কিন পুঁজিবাদকে 'ওয়েলফেয়ারের' একটা রূপ দিতে চাইছেন ওবামা_ এই অভিযোগ রক্ষণশীল মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের বড় অংশটিকে ওবামাবিরোধী করে তুলতে পারে। এ ছাড়া লিবীয় দূতাবাসে হামলা ও রাষ্ট্রদূতসহ কয়েকজন মার্কিনির মৃত্যু নির্বাচনে ওবামার গ্রহণযোগ্যতাকে চাপের মধ্যে ফেলতে পারে।
নির্বাচনে মিট রমনির দুর্বলতা হচ্ছে, নিজের ব্যবসা-সাম্রাজ্যে আউট সোর্সিংয়ের সুবাদে কয়েক হাজার মার্কিনিকে বরখাস্ত করা। নির্বাচনে পরিষ্কার কোনো অঙ্গীকার তুলে ধরতে না পারা। দুনিয়ার যত ভালো ভালো কথা, সব উচ্চারণ করা এবং রাজনীতিকে ধোঁয়াটে করে তোলা। তার নিশ্চিত ভোটব্যাংকের পরিধি ক্রমে প্রসারিত হচ্ছে বটে, তবে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ওবামার নিশ্চিত ভোটব্যাংকে কতটা হানা দিতে সক্ষম হবেন, তা বলা সহজ নয়। আগামী ৬ নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জয়ের সম্ভাবনা এখনও ওবামার বেশি। তবে এক মাসে কত কিছু ঘটতে পারে। তাই নির্বাচনে ফলাফল কী হবে, সেটা সময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

রাহাত খান :কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

এক ঘণ্টা টিভি দেখে আয়ু কমে ২২ মিনিট! - প্রথম আলো


এক ঘণ্টা টিভি দেখে আয়ু কমে ২২ মিনিট!

প্রথম আলো ডেস্ক | তারিখ: ১৮-১০-২০১২
অবসরে কিংবা প্রয়োজনে টেলিভিশন না দেখলে চলে না। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য এটা সত্য। দীর্ঘ সময় টেলিভিশনের সামনে বসেও থাকেন কেউ কেউ। এবার বিজ্ঞানীরা তাঁদের নতুন করে ভাবার জন্য একটি তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, প্রতি ঘণ্টা টিভি দেখায় ২২ মিনিট পর্যন্ত আয়ু কমায়।
তবে এটি সবার জন্য নয়। টেলিভিশন দেখার সঙ্গে শারীরিক অন্যান্য সমস্যা ও নেতিবাচক অভ্যাসগুলো যুক্ত হয়ে আয়ু কমানোর পরিমাণটি নির্ধারণ করে।
গবেষণাটি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। ব্রিটিশ সাময়িকী স্পোর্টস মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখানো হয়, টিভি দেখাও মৃত্যুর হারের ওপর প্রভাব ফেলে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত ১১ হাজার ২৪৭ জনের ওপর পরিচালিত এ সমীক্ষা থেকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, টিভি দেখা ও না-দেখা দর্শকদের প্রত্যাশিত জীবনকালের মধ্যে পার্থক্য আছে। 
গবেষকেরা বলেছেন, কম কাজ করা, মোটা শরীর ও ধূমপান—এমন সব অভ্যাস ও শারীরিক সমস্যার সঙ্গে বাড়তি টেলিভিশন দেখা মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয়। যাঁরা প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে টিভি দেখেন, তাঁরা শারীরিক শ্রমের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, এমন অবসর কাটানো ব্যক্তিদের চেয়ে পাঁচ বছর আগেই মারা যেতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার নির্দেশিকাতে শিশুদের দুই ঘণ্টার বেশি টিভি দেখতে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু বড়দের ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা নেই। টেলিগ্রাফ।

অনভিপ্রেত উক্তি এবং বাস্তবতার যুক্তি


অনভিপ্রেত উক্তি এবং বাস্তবতার যুক্তি

লেখক: ড. আব্দুল লতিফ মাসুম  |  বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১২, ৩ কার্তিক ১৪১৯
বেফাস কথা বলা আমাদের রাজনীতিকদের অভ্যাস। বেশি বেশি কথা বলার বদনাম রয়েছে আমাদের লোকদের। তর্কযুদ্ধ নয় বরং গায়ের জোরে, কথার তোড়ে জিততে চায় সবাই। বাংলাদেশে যারা নিয়মতান্ত্রিক, সাংবিধানিক নন্দন তাত্ত্বিক রাজনীতির রূপকার তারা হালে পানি পায় না। অথচ যাদের সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে লম্বা-লম্বা কথা বলার জোর আছে তারাই পার পেয়ে যায়। নির্বাচনে অসম্ভব অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে বাক চাতুর্যে মোহিত করে। এদেরকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে ‘ড্যামাগগ’। এভাবে অস্বাভাবিক উক্তি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায় তারা। কিন্তু জনগণকে অতটা বোকা ভাবা ঠিক নয়। তারা এধরনের অনভিপ্রেত, অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক উক্তিকে আদৌ অনুমোদন করে না বরং যে ব্যক্তি, দল  বা পদাধিকারী এসব উক্তি করেন তারাই অবশেষে অবমূল্যায়িত হন গেল দু’-এক সপ্তাহে এধরনের কিছু উক্তি এবং প্রতি উক্তি নিয়ে বাংলাদেশে সুশীল  সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
খ. গত সোমবার ১৫ অক্টোবার মন্ত্রী পরিষদের নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কিছু মন্তব্য-পরামর্শ এবং পর্যবেক্ষণ রীতিমত উদ্বেগজনক। যার ফলে একটি জাতীয় দৈনিক তাদের শীর্ষ প্রতিবেদনে লাল অক্ষরে “ভয়াবহ ষড়যন্ত্র” শিরোনামে  সংবাদটি প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রী এ বৈঠকে দেশকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের কথা বলেন এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের সতর্ক থাকার জন্য বলেন।
গ. এর আগে ১৩ অক্টোবার আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির বৈঠকে প্রারম্ভিক বক্তব্যে বলেন যে, ১/১১ সরকারের মত অনির্বাচিতদের ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আবারো ১/১১ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, কিছু মানুষ আছে যাদের ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশ থাকলেও নির্বাচন করার সাহস নেই। জনগণের সামনে দাঁড়াতে পারে না। জনগণের উপর তাদের ভরসা নেই। ভরসা অসাংবিধানিক পথে। অসাংবিধানিক ধারায় তারা ক্ষমতায় যেতে চান। তাদের খায়েশের কারণেই দেশ বারবার বিপদে পড়ে। তারা এখন আবার খেলা শুরু করেছেন। তিনি আরো বলেন, ক্ষমতার  খায়েশধারীদের কারণে বারবার দেশে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা বারবার অসাংবিধানিক ব্যবস্থাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
ঘ. বাংলাদেশের একটি মর্যাদাপূর্ণ নিরপেক্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে জাতীয় স্বার্থে অনেকগুলো গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সরকার বা বিরোধীদলের তোয়াক্কা না করে তারা বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে প্রধান দু’টি দলই তাদের উপর ক্ষুব্ধ । গত ১৫ অক্টোবর টি.আই.বি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় অধিকাংশ এমপি দখল, টেন্ডার ও চাঁদাবাজিতে জড়িত। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান জাতীয় সংসদের ৯৭ ভাগ সংসদ সদস্য নেতিবাচক কাজে জড়িত। এদের মধ্যে ৫৩ দশমিক পাঁচ ভাগ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। ২৪ দশমিক এক ভাগের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা রয়েছে। এছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই দলীয় নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সংসদ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
টি.আই.বি’র এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকের পরপর তিনি এসব মন্তব্য করেন। তিনি প্রকাশিত প্রতিবেদনকে উদ্দেশ্যমূলক বলে অভিহিত করেন। তিনি প্রকাশিত রিপোর্টের সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে টি.আই.বি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এরকম নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তিনি প্রতিবেদনটি সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, যখন বিশ্ব ব্যাংকের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ পরিদর্শন করছেন তখনই এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হল। এর উদ্দেশ্য কি? তিনি ড. কামাল হোসেন এবং অন্যদের সাথে বিশ্ব ব্যাংক বিশেষজ্ঞদের বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। আওয়ামী লীগের অন্য একজন শীর্ষ নেতা বিদেশের টাকায় দেশের সর্বনাশ করার জন্য টি.আই.বি.কে দায়ি করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও টিআইবির বিরুদ্ধে এরকম ক্ষুভ প্রকাশ করেছিলেন।
ঙ. বহুল আলোচিত রামু সহিংসতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কোন রকম রাগ-ঢাক না করেই বলেছেন, ঐ ঘটনায় বিএনপি সরাসরি জড়িত। বিএনপির এমপির উস্কানিতেই রামুতে হামলা হয়েছে। বিগত ৮ অক্টোবর রামুর সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বসতি ঘুরে দেখার পর তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য এসে সেদিন কি বলে গেল তার যাওয়ার পর হামলা হল। প্রধানমন্ত্রী রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসত বাড়িতে হামলার ঘটনায় বিরোধীদলের প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বিএনপির তদন্ত কমিটির প্রধান ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের সততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। ১২ অক্টোবর শ্রমিক লীগ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে  ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে জীবিত বানিয়ে বিদেশিনীর বাড়ি ভাইয়ের নামে দখল করেন, যিনি গুলশানের একটি বাড়ির লোভ সামলাতে পারেন না, যিনি দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আর রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত তার তদন্ত প্রতিবেদন জনগণ গ্রহণ করবে না। মওদুদ আহমেদকে প্রতারক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির এই নেতার বিশটি নামে বিশটি এ্যাকাউন্ট আছে। এত বড় ফ্রড! বিশটি নামে এ্যাকাউন্ট করে যে প্রতারণা করে সে করবে তদন্ত? উল্লেখ্য, এর আগে বিএনপির তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে গিয়ে মওদুদ আহমেদ বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে জঙ্গি প্রমাণ করতেই রামুর ঘটনা ঘটিয়েছে। এর প্রতি উত্তরে মওদুদ আহমেদ ১৩ অক্টোবর এক আলোচনা সভায় বলেন, ক্ষমতায় এসে নিজের দুর্নীতির ১৪টি মামলা প্রত্যাহার না করলে এবং দেশের প্রচলিত আইনের বিচার হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০৮ বছরের জেল হত। আপাদ-মস্তক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত তার সরকারকে বিশ্বচোর হিসাবে আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। তার মুখে দুর্নীতির কথা শোভা পায় না। দুর্নীতির মামলায় তিনিও জেল খেটেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে বিএনপির তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা তুলে ধরে মওদুদ বলেন, ‘সরকারের মদদেই ওই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী এই সত্য যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে না পেরে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন। যুক্তিতে না পারলে  ব্যক্তিগত আক্রমণ করা আওয়ামী লীগের পুরনো সংস্কৃতি। প্রতিবেদনে আমরা বৌদ্ধদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনার সত্যতা তুলে ধরেছি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর সরকারই হামলা করে জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
বাস্তবতার যুক্তি
এই সময় বাংলাদেশ একটি কঠিন বাস্তবতার মধ্যদিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। চলমান সংঘাতের রাজনীতি বংলাদেশকে কোন দিকে ঠেলে দেয় তা নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ উদ্বিগ্ন। উপরে সন্নিবেশিত অনভিপ্রেত উক্তিসমূহ কোন সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে আসেনি। যারা রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত তাদের পক্ষ থেকে উচ্চারিত। কথিত উক্তিসমূহ বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে তা ইতিমধ্যে প্রকাশিত সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ইত্যাদিতে প্রমাণিত। টিভি চ্যানেলসমূহে উপস্থাপিত উষ্ণ উচ্চারণ থেকে প্রমাণিত হয় কতটা গভীরভাবে উক্ত উচ্চারণসমূহ সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষ চিঠি-পত্রে, ফেসবুকে তাদের কথা-বার্তায় এসবের তীব্র প্রতিবাদ করছে। কার মুখে কি মানায় এসব মানদণ্ড নিয়ে কথা বলছে।
প্রথমত:যে ‘ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের’ কথা বলা হয়েছে তার কি কোন অস্তিত্ব আছে? বাংলাদেশ কি অন্যদের শক্তি বা দেশ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে? বাংলাদেশে কি অভ্যন্তরীণ সংঘাত এতটাই তীব্রতর হয়েছে যে শাসকগোষ্ঠী সিভিল ওয়ারের ভয় দেখাচ্ছেন? যাদের পক্ষ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিক সাধারণের জীবন সম্পদ ও সম্মানের নিশ্চয়তা দেয়ার কথা তারা কি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন?
দ্বিতীয়ত: তার কথিত ১/১১-এর পুনরাবৃত্তির হওয়ার প্রসঙ্গ। দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত প্রধান ব্যক্তি যখন এরকম আশংকা করেন তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তার ঐ আশংকার উত্স কী? তিনি কি তার গোয়েন্দা সংস্থা থেকে অনুরূপ কোন সংবাদ পেয়েছেন? যদি তার হাতে এরকম তথ্য-প্রমাণ থাকে তাহলে তার উচিত জনসন্মুখে তা প্রকাশ করা। তার মনে রাখতে হবে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অবিভাবক। তাকে মনে রাখতে হবে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে রাষ্ট্র বড়। জাতীকে বিতর্কিত এবং ভীতগ্রস্ত করার কোন অধিকার তার নেই।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় তিনি এ ধরনের আপদ-বিপদ থেকে জাতীকে রক্ষা করার জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ঘটিয়েছেন। তিনি বারংবার বলেছেন, অসাংবিধানিকভাবে যাতে কেউ ক্ষমতা দখল করতে না পারে সেসব ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে দিয়েছেন। তাহলে তিনি শংকিত কেন? তিনি কি বুঝতে পেরেছেন যে, কেবল কাগজী বিধি-বিধান এ ধরনের অসাংবিধানিক পথকে রুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়!
তৃতীয়ত:মধ্য রাতের টকশো প্রসঙ্গ। এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক যে, প্রধানমন্ত্রীর আসন থেকে তিনি দেশের নামি-দামি ব্যক্তিবর্গকে  সিঁধেল চোরের সাথে তুলনা করেছেন। এই বক্তব্য তার মর্যাদা, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্বের সাথে বেমানান এবং অসঙ্গতিপূর্ণ। এর আগেও তিনি সন্মানীয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি করেছেন। তিনি যদি কাউকে চোর-ডাকাত-চাঁদাবাজ বলতেই চান তাহলে তারতো অসংখ্য লোক রয়েছে যে কোন একজনকে দিয়ে তা বলাতে পারেন। নিজে কেন নিজকে অসন্মান করবেন? তার এ উক্তি প্রকারান্তরে তাদের বাক স্বাধীনতার প্রতি হুমকি স্বরূপ। ইতিমধ্যে তার বাকপটু তথ্যমন্ত্রী প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর সাথে রুদ্ধদার বৈঠক করেছেন। তাহলে ম্যাসেজটি কি এই যে, তিনি তাদেরকে শাসিয়েছেন?
চতুর্থত: রামুর ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রী কোন রকম তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পূর্বেই সরাসরি ঐ ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াত তথা স্থানীয় সংসদ সদস্যকে দায়ী করেছেন তা হতাশাজনক। একটি সংবেদনশীল ধর্মীয়  ইস্যুকে যেভাবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের বহন করা হয়েছে তা নিন্দনীয়। সুচতুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো এক ধাপ এগিয়ে কখন চারদলীয় জোট আবার কখন রহিঙ্গা মুসলমান আবার কখন বা আন্তর্জাতিক এনজিও চক্রকে দায়ী করছেন। বিরোধীদল তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে সরকারি দলকে দায়ী করেছে। এরকম পরস্পর দোষারোপের কারণে মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে। সুতরাং সকলের উচিত স্থায়ী শান্তির স্বার্থে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোতভাবে চেষ্টা করা।
পঞ্চমত: টি.আই.বি’র প্রতিবেদন প্রসঙ্গে। টি.আই.বি’র মত মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ গবেষণা ফলাফলকে প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তা জনগণকে হতাশ করেছে। যে কোন বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা জাতীয় সংসদকে সমৃদ্ধ করবে। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভুল-ত্রুটি নির্ণয়, আচরণ সমীক্ষা এবং জনগণের প্রতি তাদের কর্তব্য সমাপনে এ ধরনের গবেষণা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে না দেখে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেছেন। এটি গণতন্ত্র এবং জাতীয় সংসদ সদস্যদের পেশাদারিত্ব উন্নয়নে সহায়ক নয়। উল্লেখ্য, টি.আই.বি. বিএনপি আমলেও বিরূপ আচরণের সম্মুখীন হয়েছিল। প্রধান দু’দলের বিরূপতা, এর স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রমাণ করে।
উপসংহার
পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি গোটা জাতীকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নাগরিক সাধারণ নিয়মতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর বিশ্বাসী। ইতিমধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে তা দিনে দিনে অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উচ্চারিত অনভিপ্রেত উক্তিসমূহ উদ্দিষ্ট অভিষ্ট লক্ষ্যের পরিপন্থী। বিশ্লেষকরা মনে করেন ঐসব উক্তিসমূহ প্রত্যাশিত রাজনীতিক সংস্কৃতির পরিপূরক নয়। বরং এর মধ্যদিয়ে একটি নেতিবাচক নীল নকশার আভাস পাওয়া যায়। রাজনীতির কঠিন আবর্তন এবং রণকৌশল নির্ণয় করে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রী নিজেই কি আর একটি ১/১১ চাচ্ছেন? যার জন্যই তিনি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে যাচ্ছেন বলে অনেকের ধারণা। কারণ তিনি হয়তো তার দল এবং ক্ষমতার জন্য অনুরূপ কার্য ব্যবস্থাকে অপরিহার্য মনে করেন।
n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যাল

সোনালী আঁশের নতুন সম্ভাবনা


সোনালী আঁশের নতুন সম্ভাবনা

লেখক: মোস্তাক আহমেদ ইমন  |  বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১২, ৩ কার্তিক ১৪১৯
একদা বিশ্ববাজারে ৮০% পাট রপ্তানি হতো বাংলাদেশ হতে। উনিশ শতকের দিকে দেশ থেকে নিয়মিত পাট ইউরোপে রপ্তানি হতো কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে পাট উত্পাদনের এই অঞ্চলটি থেকেছে বার বার অবহেলিত। শিল্পের স্থানীকরণের সকল শর্ত পূরণ করা সম্ভব হলেও পাট শিল্প কারখানা এ দেশে স্থাপিত হয়নি, উপমহাদেশে প্রথম পাটকলটি স্থাপিত হয় ১৮৫৫ সালে কলকাতায় হুগলী নদীর তীরে। এভাবে এ দেশের কাঁচামালকে কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডের ডান্ডি ও ভারতের কলকাতা নগরে পাট শিল্পের স্থানীয়করণ হলে আরও নিজ ভূমিতে পরবাসী ছিল পাট। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের সময়ও বেশিরভাগ পাটকল পড়ে ভারতের অধীনে। তবে ’৪৭-এর পর বেশ ক’টি পাট শিল্প দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হয়, যার বেশিরভাগেরই মালিকানা ছিল পাকিস্তানিদের হাতে। ফলে স্বাধীনতার পরে পাট শিল্প একটি অব্যবস্থাপনার মধ্যে পড়ে। এই মালিকানাহীন জটিলতা ও বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার মূল্য আমাদেরকে দিতে হয়েছে দীর্ঘদিন কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে, ফলে সরকার বাধ্য হয়ে এক সময় বড় বড় পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়। পাটের উপর শুধু এই সব বিপর্যয়ই নয়, ১৯২৯ সালে “অর্থনৈতিক মহামন্দার সময়” ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও পাট শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে বসেছিল। এতে নতুন করে ঢেউ লাগে পলিপ্রপাইলিনের (পিপি) আবিষ্কারের পর হতে। এই পিপি ও পাট এখন এক সাথে প্রতিযোগিতা করে বিশ্ববাজারে টিকে আছে। নানা সংকটময় পথ অতিক্রম করে টিকে থাকার লড়াই এ প্রাকৃতিক এই তন্তুর সুদিন দিনে দিনে মজবুত হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশই আজ পাটের ব্যবহারের গুরুত্ব বুঝতে পারছে।
সাম্প্রতিককালে পাটের বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে এবং দেশে অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা মজবুত না হওয়াতে পাট চাষে বিপাকে পড়েছে চাষিরা। পাট চাষ করে কৃষক সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। অথচ ১ কেজি ধান চাষ করতে ৩-৪ কেজি পানির প্রয়োজন হয়, তাই ধান একটি পানি খেকো খাদ্যশস্য। অপরদিকে পাট আমাদের প্রধান অর্থকরী ফসল এবং এটি চাষে তেমন বেশি পানির প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমরা জমিতে সেচ নির্ভর ধান চাষ করে ক্রমাগতভাবে জমির উর্বরা শক্তিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছি অথচ কৃষকরা এক সময় মিলেমিশে জমিতে ধান ও পাট চাষ করতো। পাটের পাতা জমিতে উত্কৃষ্ট ‘সবুজ সার’ হিসাবে কাজ করে। ভালো মানের বীজ, পাট পচানোর জলাশয়, পুকুর ডোবা ও নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া অথবা শুকনো মৌসুমে পানি না থাকা, সেই সাথে পাট চাষে সঠিক দাম না পাওয়াতে কৃষক পাট চাষ করে হতাশ হচ্ছে। তারা দিনে দিনে সেচনির্ভর ধান চাষ করে ভূমি ও পানির মারাত্মক ক্ষতিসাধন করছে। সরকার পাট এর ক্রয়মূল্য প্রতিমণ ২ হাজার ২০০ টাকা বেধে দিলেও নির্ধারিত দামে কেউ পাট কিনছে না। বিভিন্ন অঞ্চলের চাষিরা প্রতিমণ পাট ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বা কোন কোন অঞ্চলে তার চেয়েও কম দামে পাট বিক্রয়ের খবর আসছে। সরকারি পাট কলগুলোতে ও এবার পাটের চাহিদা কম, গতবার যেখানে পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ লাখ ৬০ হাজার বেল তা এবার কমে দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ বেলে কিন্তু পাট ক্রয় কেন্দ্রর সংখ্যা ১৩৭ থেকে ১৬৮ তে উন্নতি হলেও কৃষকরা সঠিক দাম পাচ্ছে না এবং তা মনিটরিং করার দায়িত্বও যেন কারো নেই।
এ কথা সত্য পাটের সোনালী অতীতকে ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকেই কান্ডারির ভূমিকা পালন করতে হবে। এবার চাষীরা ধানের দাম কম পাওয়াতে পাটের দাম নিয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল, তাই ধানের পর পাটের দরপতন কৃষককে করেছে হতাশ। এবার শুধুমাত্র রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলাতেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১১ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি পাট চাষের উত্সাহ সম্পর্কে কৃষকদের আগ্রহের পরিচয় দেয়। কিন্তু পাট চাষে অতীত সমস্যাগুলো এখনো বিদ্যমান, চাষীরা এখনো পাট চাষে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল সেই সাথে আমদানী নির্ভর বীজের ব্যবহার পাটের মান ও ফলন কম দিচ্ছে এবং পাট পচাতে প্রয়োজনীয় পানি সংকট ইত্যাদি সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে। এমনকি পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর উদ্ভাবিত “বিরন রেটিং” পদ্ধতিও চাষীরা গ্রহণ করছে না, এটি বেশি পরিমাণে নিয়ম মাফিক ব্যবহার করতে হয় তা না হলে ভালো ফল আসে না।
পাট শিল্পের সোনালী অতীতকে ফিরে পেতে চাইলে আমাদের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাটে উত্পাদিত প্রথাগত পণ্য যেমন পাকানো সুতা, শক্ত কাপড়, চটের ব্যাগ, টুইল কাপড়, কার্পেট ব্যাকিং, উলপ্যাক, দেয়ালের আচ্ছাদন, গালিছা ও বিভিন্ন ধরনের গৃহসজ্জার বস্ত্র ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন নতুন কলাকৌশল প্রয়োগ করে এর বহুবিধ ব্যবহার বাড়াতে আরো বেশি কাজ করা প্রয়োজন। সেই সাথে বন্ধ পাটকলগুলো চালুকরণ, পাটের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারটি মজবুত করা, স্থানীয়ভাবে পাটের বীজ উত্পাদনে নজর দেওয়া, পাটশিল্পকে প্রয়োজনে আরো সহজে ঋণ বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া, দক্ষ ব্যবস্থাপনাসহ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চত করা এবং সর্বোপরি প্রয়োজন কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। দেশে পাটকলগুলো আবার কর্মমুখর হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশায়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে আর্থিক খাতে জালিয়াতি


দেশে আর্থিক খাতে জালিয়াতি

লেখক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী  |  বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১২, ৩ কার্তিক ১৪১৯
দেশে সাম্প্রতিককালে আর্থিক খাতে জালিয়াতি চরম আকার ধারণ করেছে। কেবল ব্যাংকিং সেক্টর নয়, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চরম জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। গ্রাহকদের সেবার মান নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অবশ্য এ ধরনের আর্থিক খাতে জালিয়াতির ঘটনা নতুন নয়। আবার এ ধরনের অপতত্পরতা কেবল যে বাংলাদেশে ঘটে তা কিন্তু নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঘটে থাকে। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭ সালে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাপী আর্থিক অনিয়ম এখন ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে ইউরোপে। অন্যদিকে এদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে যে ধরনের আর্থিক অনিয়ম ঘটেছে তার সিংহভাগের ষড়যন্ত্রকারী ও হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। এক ধরনের ব্লেইম গেইম চলতে থাকে, বড় বড় করে সংবাদ প্রচারিত হয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলমত নির্বিশেষে ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছেন। এমনকি, সামরিক-বেসামরিক শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিপরায়ণরা একটি মাফিয়া চক্র তৈরি করে রাখে। বড়জোর গুটিকয়েক ব্যক্তি অপকর্মের জন্যে শাস্তি পান। আর অন্যরা সাধুর বেশে নিজেদের সমাজে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নেন। তাইতো ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু দুর্নীতির ধরন ও অপকর্ম সংকুচিত না হয়ে বরং পরিধি ক্রমশ প্রশস্ত হতে থাকে।
ব্যাংকিং সেক্টরে বহুল আলোচিত ঘটনা হচ্ছে সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্কের লুটপাট। এই লুটপাটে কেবল সোনালী ব্যাংক নয়, আরো ২৬টি ব্যাংকও জড়িত। প্রথমদিকে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেবল রাজনৈতিক প্রভাবে দেশের এতগুলো ব্যাংক একযোগে জড়িত হয়ে পড়ল কেমন করে? ব্যাংকিং সেক্টরে কি আর তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই? না কি ইচ্ছেমত নিজস্ব মনগড়া ব্যাখ্যা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে? ইনল্যাণ্ড বিল পার্চেজের সিস্টেমকে অপব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে। অথচ সুস্পষ্ট আইন-কানুনের মধ্যদিয়ে ইনল্যান্ড বিল পার্চেজের সামগ্রিক প্রক্রিয়া সম্পাদনের নিয়ম রয়েছে। নিয়ম বহির্ভূত ঘটনা ঘটার জন্যে এখন চলছে ব্যাংকিং সেক্টরে ধামাচাপা দেয়ার পালা। এই ধামাচাপা দেয়ার প্রয়াস কিন্তু মোটেই শোভন নয়। কেননা এ পর্যন্ত দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে যথাযথভাবে মামলা দায়ের করেনি। ফলে মামলাগুলো যেমন পরিচালনা করা সঠিকভাবে সম্ভব হয় না, তেমনি বিজ্ঞ বিচারকের কাছেও সঠিক তথ্য সম্বলিত জোরালো কাগজপত্র উপস্থাপন ব্যাংকিং-এ সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে পেশ করা হয় না। আজ যারা টিভি টক শো-তে গলা ফাটাচ্ছেন আর্থিক জালিয়াতি রোধ করার জন্যে, তারা ভুলে যাচ্ছেন-দেশের প্রচলিত ফৌজদারী আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। দুভার্গ্য যে, কোন ঘটনা ঘটলেই আমরা নতুন কিছু করা দরকার বলে ঝাঁপিয়ে পড়ি-উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদের চেনা মুখগুলোকে শানিয়ে নেয়া, প্রকান্তরে দুর্নীতিগ্রস্তদের সুযোগ করে দেয়া তদ্বির এবং সময়ের অসত্ ব্যবহারের জন্যে। সেদিন একজন প্রাক্তন ব্যাংকার, বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যিনি প্রায়শই ব্যাংকিং সেক্টরে সংস্কার, সংস্কার করে চিত্কার করেন, তত্ত্বাবধায়কের সময়ে খুব গলা ফাটিয়েছেন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে, এক রাশ বললেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহের বিপক্ষে। আসলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক তো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে যারা দুর্নীতি করছে তাদের বিচারের আওতায় আনা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং সেক্টরে থেকে স্বচ্ছতার সাথে কাজ করলে নিশ্চয়ই কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। প্রশ্ন থেকে যায়, হলমার্ক ছাড়াও আরো যে কয়টি কোম্পানি লুটপাট করে সহস্রাধিক কোটি টাকার উপরে আত্মসাত্ করছে তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? কেনইবা নেয়া হচ্ছে না? অন্যদিকে সোনালী ব্যাংকের আত্মসাত্কৃত টাকার হলমার্ক কোম্পানির একটি বড় অংশ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি ব্যাংকে রয়ে গেছে বলে ১৫ই অক্টোবরের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্টে বেরিয়েছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী প্রশ্ন থেকে যায় টাকাগুলো যারা আমানত হিসাবে নিয়েছেন এবং যারা রেখেছেন যেমন তানভীরের স্ত্রী, তাকে কত দ্রুত আইনের আওতায় নেয়া হবে? অন্যদিকে আরো যে ২৬টি ব্যাংক হলমার্কের সাথে লেনদেনে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে? কেনইবা এ সমস্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের কাগজপত্র ঠিক করার জন্যে সময় দেয়া হচ্ছে? আসলে বেসরকারি কিংবা মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক হোক, তারা অনেক সময় সত্য ঘটনা চাপা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে জনগণের টাকা নিয়ে বর্তমানে যেভাবে ব্যাংকিং চ্যানেল সামগ্রিক অর্থে ছিনিমিনি খেলছে সে তুলনায় কোন ধরনের শাস্তি পাচ্ছে না। আজ যতই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিপক্ষে বলা হোক, কিন্তু আমাদের দেশের মূল ব্যাংকিং-এর উন্নয়ন শুরু হয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের হাত ধরে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঞ্চয় বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আসলে বর্তমান অর্থমন্ত্রী এরশাদ সরকারের আমলেও অর্থ-উপদেষ্টা হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলেন। যদিও তার পূর্বেই ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ গ্রহীতারা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল সত্তরের দশকের শেষে, যাতে সহযোগিতা করেছিলেন তদানীন্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও শিল্পমন্ত্রী জামাল উদ্দীন আহমেদ। এই প্রক্রিয়া সেখানে থেমে থাকেনি, বরং ক্রমশ বিকশিত ও পরিব্যাপ্ত হয়েছে। দুর্বৃত্তায়নের আকার ও পরিধি ক্রমশ এত বেড়েছে যে, আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় দশ ভাগ এবারের সুনামীতে ব্যাংকিং সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, একই কুমীর ছানাকে শিয়াল বার বার দেখিয়ে যেমন কুমীরকে ধোঁকা দিয়েছে তেমনি জনগণকে ধোঁকা দেয়ার অপপ্রয়াস সবসময়ে চলেছে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে অর্থমন্ত্রী জনগণের কাছে সবচেয়ে বেশি অপছন্দের মানুষ। মাঝখান থেকে ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। পত্রিকান্তরে রিপোর্টে দেখলাম যে, আসন্ন ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়ার জন্যে ব্যাংকিং ঋণ পাবেন কিনা সে ব্যাপারে চিন্তায় আছেন। অন্যদিকে দেশের সত্ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা ঋণ পাচ্ছেন না। ফলে দেশের শিল্প উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট মন্তব্য করেছেন যে, দেশে কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি হওয়ায় সামাজিক ভারসাম্যহীনতা নষ্টের সম্মুখীন। তার এই মন্তব্যের সাথে দ্বিমতের কোন সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন থেকে যায়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কি শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের তিমিরে থেকে যাবে? দেশের শিল্প উন্নয়নের জন্যে ঘোষিত শিল্পনীতি ২০১০ কি আর কার্যকর হবে না? শুধু-ই কি আশ্বাসের উপর আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? অথচ বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার গুরুত্বের সাথে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশের উপর জোর দিবেন। রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারির মত মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকগুলোও দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিতরণ করবেন। যতক্ষণ না নতুন আইন হচ্ছে, বর্তমানে প্রচলিত আইনের আওতায় দুষ্কৃতকারী ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দলীয় আনুগত্য, দূর সম্পর্কের ক্ষমতালোভী আত্মীয়দের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বিচারের ব্যবস্থা নেয়া হোক। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য সার্বিক দিকনির্দেশনা আরো উন্নত হওয়া উচিত। ব্যাংকারদের নৈতিকতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কেবল নৈতিকতা শিক্ষা দিলেই হবে না, বরং একদিকে যেমন প্রেষণার প্রয়োজন, তেমনি দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থা হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথের মত। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার ব্যাংকিং ডিভিশন চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে কর্ম পরিধি নিয়ে নীরবে এক ধরনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। ক্ষমতার ভাগাভাগিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থা হয়েছে যত দোষ আছে, সব মুখ বুঁজে সহ্য করতে হয় আর ব্যাংকিং ডিভিশন যেন ধোয়া তুলসী পাতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব খাটো করতে করতে স্বাভাবিক মুদ্রানীতির অভিভাবক হিসাবে তাদের কোন ভূমিকা নেই বললেই চলে— কেবল মুদ্রানীতি ঘোষণার মত কিছু কাজ ছাড়া। অন্যদিকে ব্যাংকিং ডিভিশন সুস্পষ্টভাবে ব্যাকিং কোম্পানির আইনের ধারাকে নিষ্ক্রিয় করে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। এতে ব্যাংকিং সেক্টরে বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা সুযোগের অসত্ ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন উগান্ডা, জাম্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়েও কম ক্ষমতার অধিকারী। অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেয়া দরকার, নচেত্ এর দায়-দায়িত্ব কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুযোগ সন্ধানীরা সরকারের ঘাড়েই চাপাবে।
এদিকে দেশে ডেসটিনি যেভাবে জনগণের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তা সত্যি এক তাজ্জব ব্যাপার। ডেসটিনির বিরুদ্ধে বর্তমানে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ যে সমস্ত মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বেইল আউটের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতোপূর্বে কাজল সিন্ডিকেট, যুবকসহ বিভিন্ন কোম্পানি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কয়েক বত্সর ৩/৪ জন ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি জেল খেটে বেরিয়ে এসেছেন। অথচ কখনো শক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য যে ধরনের কঠোরতার সাথে মামলা দায়ের করা দরকার সে ব্যাপারে সব সময়ে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করা হয়েছে। আর তাই অন্যরা যখন দেখে যে, কিছুদিন কষ্ট করে সহজেই ছাড়া পাওয়া যায়, তখন তারা উত্সাহিত হয়। আবেদন থাকবে সাধারণ মানুষের কাছে, খুব দ্রুত বড়লোক হওয়ার জন্য শর্টকাট পদ্ধতি ব্যবহার না করার জন্য। ইউনিপে-২ এর মাধ্যমেও যারা প্রতারিত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তাদের সান্ত্বনা জানানোর ভাষা আমার নেই। আইনের ফাঁক গলে যাতে আসল দোষী ব্যক্তি বেরিয়ে আসতে না পারে সে জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। দুর্ভাগ্য হলো, বাংলাদেশে আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে উপযুক্ত সাজা দেয়া হয় না। আর সাজা না হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে মামলা রুজু করার সময়ে মামলাকে দুর্বলভাবে উপস্থাপন করা হয়। এজন্য মামলা রুজু করার সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অধিকতর সচেতন হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেউ কর্তব্যকর্মে গাফিলতি করলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কোন বিশেষ জেলার অধিবাসী হলেই সে ঐ সময়ে বিশেষ সুবিধা পাবে এ ধারণা থেকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ব্যবসা করতে গেলে কিছু আর্থিক অনিয়ম হতে পারে। কিন্তু আর্থিক অনিয়ম যখন হিমালয়ের এভারেস্ট শৃঙ্গের মত উচ্চতায় আসীন হয় তখন তা দেশ এবং জাতির জন্য অমঙ্গলজনক। বারবার এ অমঙ্গল বার্তা আমাদের দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুলেছে। আবার সামষ্টিক অর্থনীতি যে সমস্ত ব্যাষ্টিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোকে ভঙ্গুর করে তুলছে। জিডিপি গ্রোথ রেইট আমরা ৭% এর উপরে অনায়াসে উন্নীত করতে পারতাম, যদি দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়ন না থাকত। এদেশের উন্নয়নের জন্য অবশ্যই একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র থাকা দরকার। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে দুর্বল করে ব্যাংকিং  ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করে যে ভুল করা হয়েছে তার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। জনদরদী সরকার আজ আর্থিক খাতে নানা অনিয়মের মারপ্যাঁচে আবদ্ধ। কৌশলগত নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় এ অব্যবস্থা দূর করতে পারেন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দিতে পারেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকিং-এ অভিজ্ঞ দীর্ঘ ত্রিশ বছরের অধিককাল কাজ করেছেন এমন কাউকে, অতীতের ট্র্যাক রেকর্ড ভাল এবং এমডি হিসাবে কখনো ঋণ খেলাপীদের পক্ষে কাজ করেননি এমন কাউকে ডেপুটি গভর্নর পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ করা দরকার। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্সপেকশান টীমকে ঢেলে সাজানো দরকার। এ জন্য দক্ষ ও সত্ বাণিজ্যিক ব্যাংকারকে সরাসরি মহাব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ দেয়া উচিত। যারা এখনো ব্যাংকিং সেক্টর এবং নন ব্যাংকিং সেক্টরে নানাবিধ দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। দুর্ভাগ্য হলো, শেয়ার মার্কেটের কেলেংকারির বিচার না হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে ক্রাইম বেড়ে গেছে। আসলে শেয়ার মার্কেটের ক্ষতিগ্রস্তরা আজ নিঃস্ব হয়ে গেছে। শেয়ার মার্কেটের জালিয়াতির সাথে সংশ্লিষ্টদের উপযুক্ত বিচার করা দরকার, নচেত্ ক্ষতিগ্রস্তরা দুঃখের সাগরে ভাসতেই থাকবে। আর্থিক অনিয়মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে আরো মারাত্মক অনিয়ম হতে পারে—এক্ষেত্রে লোক দেখানো ব্যবস্থা না নিয়ে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—শীঘ্রই শুভাসম।
n লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকনোমিস্ট, বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক, ব্যবসা বিভাগ, প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল:pipulbd@gmail.com

দুর্যোগের ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা


দুর্যোগের ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা

বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১২, ৩ কার্তিক ১৪১৯
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান সিকিউরিটি, অ্যালায়েন্স ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কস এবং দি নেচার কনজারভেন্সি দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলির তালিকা প্রকাশ করিয়াছে। তালিকা অনুযায়ী দুর্যোগ ঝুঁকির দিক হইতে বিশ্বের ১৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম স্থানে। বৈশ্বিক পর্যায়ে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে ঝড়, বন্যা, খরা ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার দিন দিন বাড়িতেছে। একই কারণে কমিতেছে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা। আর এই দুইয়ে মিলিয়া ক্রমে বাড়িয়া চলিয়াছে দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি। কিন্তু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা লইয়া চারিদিকে সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি মিলিয়া যথেষ্ট তোড়জোড় চলিলেও এদেশের মানুষ এখনও প্রবল ঝুঁকির মধ্যে বাস করিতেছে বলিয়াই উক্ত প্রতিবেদন প্রতীয়মান করিতেছে।
অন্যদিকে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষজন নিয়মিতভাবে জানমাল খুয়াইয়া কাগজে প্রতিবেদনটির সত্যতা প্রমাণ করিতেছে। রিপোর্ট প্রকাশিত হইবার মাত্র একদিন আগেই গত বুধবার আকস্মিক টর্নেডোর আঘাতে নোয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ উপকূল অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হইয়া গিয়াছে। নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ৪৫ জনের মৃত্যুর খবর পত্রিকাগুলিতে বাহির হইয়াছে। এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক জেলে এবং দুই শতাধিক ট্রলার নিখোঁজ রহিয়াছে। এই ঘূর্ণিঝড়ে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হইয়াছে। সেই সঙ্গে ২৫ হাজার একরেরও বেশি ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। ঝড়ের তোড়ে ভাসিয়া গিয়াছে অসংখ্য ট্রলার ও জেলে নৌকা। আকস্মিক এই ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে নোয়াখালীর হাতিয়া। ভোলা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের জেলা কর্তৃপক্ষ বলিয়াছে, যদিও সেখানে আগে হইতেই তিন নম্বর সতর্কবার্তা ছিল, কিন্তু একটি ঝড় আসিতে যাইতেছে এইরূপ কোনো তথ্য তাহাদের কাছে ছিল না। সতর্কীকরণের এই ব্যর্থতার কারণে অসংখ্য জেলে নৌকা নির্ভয়ে মাছ ধরিতে গিয়া এখনও নিখোঁজ হইয়া রহিয়াছে। কিন্তু, সেই নিখোঁজদের উদ্ধারে কিংবা দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাইতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তত্পরতা নাই বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। নদীর মোহনায় জেলেরা অনেকের লাশ ভাসিতে দেখিলেও উদ্ধার তত্পরতা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করিতেছে নিখোঁজ জেলেদের স্বজনরা।
প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উন্নয়নের যুগে সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যর্থতা ও গাফিলতি ঠিক মানিয়া লওয়া যায় না। একটু সতর্ক হইলেই অসংখ্য অমূল্য জীবন ও সম্পদ রক্ষা পাইতো। একইভাবে আমরা দেখিতেছি, দুর্যোগ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের ঢিমে তাল প্রত্যন্ত উপকূলীয় জনপদগুলির আক্রান্তদের জীবন দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছে। সতর্কতা, সচেতনতা ও দায়বদ্ধতার চর্চা গড়িয়া তোলা দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেইরূপ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক তত্পরতা আমরা দেখিতে পাইতেছি না। যদিও বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত দুর্যোগ-সহনশীল ও লড়াকু ; তবু উষ্ণতা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত পরিবর্তন তাহাদের জীবন ও জীবিকা প্রবলভাবে হুমকিগ্রস্ত করিয়া তুলিয়াছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ বিপর্যয়কারী দেশগুলির নিকট হইতে ইতোপূর্বে বাংলাদেশ তাহার হিস্যা আদায়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে। কিন্তু, ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য জোটবদ্ধভাবে তত্পরতা চালাইবার যোগ্য হইয়া উঠিবার বিকল্প নাই। একইভাবে, স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করিতে উপকূল জুড়িয়া সবুজ বেষ্টনী নির্মাণসহ নানামুখী তত্পরতা গ্রহণে আর বিলম্ব করিলে বিপর্যয় এড়ানো যাইবে না।

Wednesday, October 17, 2012

শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ



লেখক: হায়দার আহমদ খান  |  বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১২, ২ কার্তিক ১৪১৯

মা নবসম্পদ উন্নয়ন নির্ভর করে সমাজের সার্বিক পরিকল্পনা, তার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সমাজে সুশাসনের উপর। সমাজ উন্নয়ন একদিনে সম্ভব নয়; কিন্তু প্রতিদিনের কার্যকলাপের প্রভাব পড়ে উন্নয়নের উপর। মানুষ জন্মসূত্রে শিক্ষিত হয় না। তবে জন্মসূত্রে জ্ঞানী এবং সম্পদশালী হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। সমাজপতিদের চিন্তা-চেতনা, যোগ্যতা-ক্ষমতা, সততার উপর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা। সমাজের বেশ কিছু কাজ আছে যা ব্যক্তি পর্যায়ে সম্ভব নয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রাইমারি শিক্ষা। অবশ্য উন্নত বিশ্বে তার ব্যতিক্রম পাওয়া যাবে। যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশ, বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, গরিবের সংখ্যা, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সমসাময়িক সময়ে প্রাপ্ত স্বাধীন অন্য দেশের মানুষের জীবনমান তুলনায় বড় কষ্ট পেতে হয়, লজ্জা পেতে হয়। জাতীয় উন্নয়নের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় বহির্বিশ্বের বন্ধুদের সাহায্যের উপর। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ আসবে এবং তা ব্যবস্থাপনার জন্য মানবসম্পদও আসবে এমন চিন্তা করতে হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪১ বছর পরেও।
আমার এই আলোচনার সূচনায় একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাই। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের যোগ্যতা এবং ক্ষমতা নিয়ে, যাদের উপর অর্থাত্ আমাদের মানবসম্পদের উপর নির্ভর করছে সমাজের সার্বিক উন্নতি। পেশাগত কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশের সাথে আমি জড়িত। ফলে তাদের চাকরি বাজারের খবর আমার কাছে থাকে। মানসম্মত শিক্ষার সমস্যার সাথে বাংলাদেশের ৮৭,৩৭২টি গ্রামের মধ্যে আজ পর্যন্ত  ১৫০০ গ্রামে কোন প্রাইমারি স্কুল নেই। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান প্রাথমিক এবং গণশিক্ষামন্ত্রীর ভাষায় দেশের ৪৭ ভাগ মানুষ এখনও নিরক্ষর। বাংলাদেশের বর্তমান ১৬ কোটি মানুষের উন্নয়ন ছাড়া সার্বিক উন্নতি অসম্ভব। আমাদের অপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বর্তমানে আমাদের শহরকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো। অবশ্য শহর এলাকার মায়েরা যে কষ্ট, ত্যাগ স্বীকার করেন তাদের সন্তানের জন্য সে তুলনায় আমার মনে হয় শহরকেন্দ্রিক ছেলেমেয়েদের ফলাফল আরও ভালো হওয়া উচিত। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয় বছরে ২৩৮ দিন; কিন্তু ক্লাসের শ্রমঘণ্টার অপচয় কত হয় তা মনে হয় আমরা সবাই জানি। ক্লাসের শ্রমঘণ্টার শতভাগ ব্যবহার ছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানদানের আর কোন সহজ পন্থা আছে কিনা আমার জানা নেই। আমার মূল আলোচনায় ফিরে যাই।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের একতরফা সম্পৃক্ততা অনেক কমেছে। সরকারের কাজ দেশের আইন-শৃঙ্খলা এবং বিচার ব্যবস্থার নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবশ্য স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাখাতের দায়িত্বও সরকারের। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব। মনে রাখতে হবে অশিক্ষা এবং দরিদ্রতা জমজ দুই ভাই। দুইজনকেই একসাথে মানুষ করতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থায় শিক্ষিত এবং ধনীর সন্তানের জন্য শিক্ষা অর্জন মোটামুটি সহজ। তার জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার তেমন প্রয়োজন হয় না। সরকারের অযোগ্যতার জন্যই হোক বা সময়ের পরিবর্তনেই হোক এই মুহূর্তে বিশ্বের সকল দেশেই সকল উন্নয়ন কাজ এখন করছে ব্যবসায়ীরা। কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারও করছে, তবে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেই। যেমন বাংলাদেশের যমুনা সেতুর টোল আদায় করে তার বাণিজ্যিক সার্থকতা প্রমাণ করছে। অবশ্য জনগণও এই দৃষ্টিকোণকে সহজভাবেই নিচ্ছে সারাবিশ্বে। কারণ জনগণও চায় মানসম্মত সেবা এবং তার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সুবিধা।
১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। এই দেশ হতে পারে বিনিয়োগের জন্য বিশ্বে প্রধান স্থান। কারণ ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য থাকে ক্রেতার কাছে বিক্রয়যোগ্য দ্রব্য পৌঁছানো। বর্তমানের ১৬ কোটি মানুষকে আমরা যদি উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে জ্ঞানী এবং কর্মক্ষম করতে পারি তাহলে তারাই হবে ক্রেতাদের একটি অংশ এবং তারাই হবে ব্যবসা-বাণিজ্যের চালিকাশক্তি। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য যাই বলি না কেন সব কিছুর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। দক্ষ, কর্মক্ষম মানবসম্পদের অভাবে সমাজে শুধু দরিদ্র লোকের সংখ্যাই বৃদ্ধি পায় না, বরং শিল্প বাণিজ্য পরিচালনাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ী দেশি হোক বা বিদেশি হোক তার প্রথম এবং প্রধান বিবেচ্য বিষয় উক্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনের জন্য উপযুক্ত মানবসম্পদ পাওয়ার নিশ্চয়তা। সম্প্রতি শিল্পসমৃদ্ধ দেশ জাপানের পূর্ব ওসাকার ১৮ জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এসেছিলেন বাংলাদেশে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এফবিসিসিআই আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থেকে তাদের সাথে কথা বলার। মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে আমাদের দেশের শ্রমিকের বেতন কম এই প্রসংগে তাদের বক্তব্য ছিল ‘সস্তায় খারাপ উত্পাদনের চেয়ে উত্পাদন না করাই ভালো। কারণ উত্পাদনের উদ্দেশ্য উত্পাদিত দ্রব্য ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া নয়, ক্রেতার চাহিদা পূরণ করা’। তাদের বক্তব্য থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। তাদেরও সমস্যা আছে, তবে আমাদের সমস্যা যোগ্যতার, তাদের সমস্যা অতিযোগ্যতার। আমাদের সমস্যা চাহিদা মোতাবেক পুষ্টি গ্রহণের ক্ষমতা আহরণের যোগ্যতায়। আমাদের সমস্যা প্রাইমারি শিক্ষায়, তাদের সমস্যা শিক্ষায় সর্বশেষ পর্যায়ে অর্থাত্ থিসিস লেভেলে। আয়তনের দিক থেকে জাপান আমাদের দেশের দ্বিগুণের চেয়ে বড়। তারপরও জনসংখ্যা আমাদের ১৬ কোটির থেকে প্রায় চার কোটি কম। প্রাকৃতিক বিপর্যের দিক থেকেও জাপান আমাদের দেশের সমপর্যায়ে। মানুষের মতো বেঁচে থাকার সব উপকরণ জাপানের মানুষের জন্য সে দেশের সরকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করে সফলকাম আর আমাদের দেশের মানুষকে কয়দিন পরপর আন্দোলন করতে হয় এসবের দাবিতে। এখনও আমাদের দেশের সোয়া দুই কোটি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নেই। আমরা যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। আমাদের দেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান হওয়ার পরেও অন্য একটি মুসলিম দেশে প্রবেশের জন্য ভিসা পায় না, অর্থাত্ ব্ল্যাক লিসটেড। বাংলাদেশ সরকারের শ্রমমন্ত্রীর ভাষায় এটা আমাদের ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য শাস্তি। আমার প্রশ্ন, ব্যবসায়ীরা কি এ দেশের সরকারের অধীনে নয়? সকল সমস্যার মূলে অভাব। চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা অত্যধিক হওয়ায় ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ করার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। কথায় আছে ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’। গরিবের সুন্দরী বউ সবার ভাবী এ প্রবাদও আছে আমাদের সমাজে। আল্লাহও বলেছেন, ‘তোমরা দরিদ্রতা থেকে পানাহ চাও’। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ তার ক্ষুধার জ্বালায় অমানুষ হয়ে যায়।   
 শেষ কথা, ১৬ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশের মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য সার্বিক পদক্ষেপ নিতে হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত আউটপুট নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে প্রাইমারি শিক্ষায়। শিক্ষকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার মতো বেতন কাঠামো করতে হবে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নেয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি এবং অনুপ্রাণিত করতে হবে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি মোটামুটি যথেষ্ট। বর্তমান সিলেবাসের সুফল ১০০% অর্জনের পরই আরও উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। পরীক্ষার পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নের লক্ষণ নয়। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ানোর অনেক পন্থা বুদ্ধিমান সরকারি কর্মকর্তাদের জানা আছে বা উপরের মহলকে খুশি করার জন্য তারা অনেক কিছু করার যোগ্যতা রাখেন। দেশে মানবসম্পদ নিশ্চিত করতে পারলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য প্রচারের যেমন প্রয়োজন হবে না, তেমনি এদেশের মানুষের বিদেশের মাটিতে শ্রমিকের চাকরির জন্য ভিসা প্রার্থীও হতে হবে না। ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য আমাদের বিদেশ গমন ব্যাহত হবে না। বৈদেশিক মুদ্রার জন্য কঠিন শর্ত মেনে ঋণ নিতে হবে না। মনে রাখতে হবে, দরিদ্রতা থেকে মুক্তি বা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির একমাত্র পন্থা হচ্ছে শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান উপার্জন, যা সরকারের কর্মপরিকল্পনা এবং সুশাসনের উপর শতভাগ নির্ভরশীল। দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশও ব্যাহত হয় দরিদ্রতার জন্য।    
লেখক: এফসিএ
akc@akc-bd.com