Saturday, June 23, 2012

সংক্ষেপে বাংলাদেশের ইতিহাস


উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। ধারণা করা হয় দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠী এখানে সেসময় বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। আর্য জাতির আগমনের পর খ্রিস্টীয় চতুর্থ হতে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত গুপ্ত রাজবংশ বাংলা শাসন করেছিল। এর ঠিক পরেই শশাঙ্ক নামের একজন স্থানীয় রাজা স্বল্প সময়ের জন্য এ এলাকার ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে অভিহিত করা হয়) শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ বাংলার অধিকাংশের অধিকারী হয়, এবং পরবর্তী চারশ বছর ধরে শাসন করে। এর পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। দ্বাদশ শতকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১২০৫ - ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী নামের একজন তুর্কী বংশোদ্ভূত সেনাপতি রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে সেন রাজবংশের পতন ঘটান। ষোড়শ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগে পর্যন্ত বাংলা স্থানীয় সুলতান ও ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মোঘল বিজয়ের পর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীর নগর।

বাংলায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানির হাত থেকে বাংলার শাসনভার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্রিটিশ রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ভাইসরয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে বহুবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লাখ লোক মারা যায়।

১৯০৫ থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ফলশ্রুতিতে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যার রাজধানী ছিল ঢাকায়। তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরম বিরোধিতার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে। ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ধর্ম গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পুনর্বার বাংলা প্রদেশটিকে ভাগ করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশভুক্ত হয়; অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশভুক্ত হয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়।

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ভূমিস্বত্ব সংস্কারের মাধ্যমে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে থেকে যায়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈরীতার প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়। পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এসময় বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসাবে আওয়ামী লীগের উত্থান ঘটে, এবং দলটি বাঙালি জাতির প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ৬ দফা আন্দোলনের সূচনা ঘটে যার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বাধিকার আদায়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে কারাবন্দী করা হয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চাপিয়ে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়; কিন্তু ঊনসত্তরের তুমুল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার পতন ঘটে ও মুজিব মুক্তি পান।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ১১ নভেম্বর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হযে ওঠে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না-হওয়ার পর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লাখ হতে শুরু করে ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে যুদ্ধ করে। মুক্তি বাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে। মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে ১৯৭১ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পন করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানী সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয় ও শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শুরুতে মুজিব দেশে বাকশাল নামীয় রাজনৈতিক দল গঠনকরতঃ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট সেনাবাহিনীর কিয়দংশ ও কিছু রাজনীতিবিদের ষড়যন্ত্রে সংঘটিত অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন। পরবর্তী ৩ মাসে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থান চলতে থাকে, যার পরিসমাপ্তিতে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় প্রবর্তন করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়া আরেকটি অভ্যুত্থানে নিহত হন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পরবর্তী শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতবিহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। রাষ্ট্রপতি এরশাদ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তার পতন হয় এবং একটি তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অতঃপর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হয় এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী হিসাবে ১৯৯১ হতে ১৯৯৬ ও ২০০১ হতে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ হতে ২০০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দারিদ্র ও দুর্নীতির সত্বেও বাংলাদেশ বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসাবে তার অবস্থান সমুন্নত রেখেছে।


তথসূত্র: ইন্টারনেট।

Friday, June 22, 2012

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানী পরাজিত হলেও ফিরে আসার আশা ত্যাগ করে নাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধটা যেমন হঠাৎ করে হয়ে গেল, ২য় বিশ্বযুদ্ধ তেমন ছিল না। বরং এটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিনার ফসল! জার্মানী-ইটালি এবং জাপান পরিকল্পিতভাবে তৎকালীন বিশ্ব ব্যাবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে এই যুদ্ধ বাধায়!

বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই যুদ্ধটি সহজ ভাবে বুঝার চেষ্টা করবো আজকে! যথারীতি তথ্যভিত্তিক নয় বরং বিশ্লেষনমুলক আলোচনা করবো। কি কারনে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কিভাবে যুদ্ধ লাগে সেটারই একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষন আপনাদের সাথে শেয়ার করবো!


১ম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নতুন বিশ্বব্যাবস্থা এবং মনে রাখার মত একটি ফ্যাক্ট :

-------১ম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্য, অটোমান সাম্রাজ্য এবং রাশিয়ান সম্রাটের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে খেলোয়াড় বদল হয়। মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসন্ন হয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগমনে সবমিলিয়ে নেতৃত্ব উঠে যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের হাতে! ওদিকে লেনিনের নেতৃত্বে রাশান রাজনীতিও ভিন্ন পথে চলে যায়।

উইলসন ছিলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে, গণতন্ত্র এবং লিবেরালিজমের প্রবক্তা ও বাস্তবায়নের অন্যতম নায়ক।

যুদ্ধপরবর্তীকালীন নেতারা সবাই এই মর্মে একমত হয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধ একটা অভিশাপ। সবাই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়ানোর লক্ষ্যে একমত হয়ে উইলসনের সাথে একমত হয় যে, যেহেতু যুদ্ধের পুরো ক্ষতিটাই বহন করে জনগণ তাই জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যদিও তাদের কাজকর্ম সেই সময়ের তুলনায় বেশ "ইউটোপিয়ান" ছিল, কিন্তু তারা বেশ কিছু সমস্যার সঠিক কারন খুজে বের করে , গোপন সামরিক চুক্তি এবং গোপন আন্তর্জাতিক রাজনীতি যুদ্ধের সহায়ক ধারনা করে, "ওপেন ডিপ্লোম্যাসি"র প্রচলন শুরু হয়।

সরকারব্যাবস্থায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সচ্ছতার নিশ্চয়তা করার লক্ষ্যেই জন্ম নেয় "লীগ অব নেশন্স"! সহজ ভাষায় যেটার দায়িত্ব ছিল বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ প্রতিরোধে একটি "মুরুব্বী" কাউন্সিল হিসেবে কাজ করা! পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থা যা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্যে গঠিত হয়!

আজকের " জাতিসংঘ" এর পুরানো বা ব্যার্থ ভার্সনই হলো এই "লীগ অব নেশন্স"।

এক কথায় বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো আন্তর্জাতিক রাজনীতি উল্টো পথে চলা আরম্ভ করে। রাষ্ট্রগুলো শতাব্দী প্রাচিন "রিয়েলিজম" Click This Link দর্শনকে খারিজ করে বিশ্বব্যাপী " লিবেরাল" দর্শন গ্রহনে পদক্ষেপ নেয়।



জেনেভায় লীগ অব নেশন্সের সদর দপ্তর।







১ম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ঘটনা যা ২য় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছিল :

সহজ ইতিহাসকে সহজ রাখার উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে পরবর্তী ঘটনাবলী : সহজ ইতিহাসের ক্ষেত্রে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের চেয়ে যুদ্ধের আগের ঘটনাবলী বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধে পরাজিত জার্মানীকে ২৬৯ বিলিয়ন "গোল্ড মার্ক" জরিমানা করা হয়ে। এবং ১৮৭২ এর যুদ্ধে জার্মান দখলকৃত "আলসাক-লরেন" এলাকা ফ্রান্স নিয়ে নেয়! জার্মানীকে অস্ত্রহীন করে ফেলা হয়। এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যকে একদম খন্ড খন্ড করে ফেলা হয়।

অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য বেদখল করা হয় এবং তুরস্কের নানা অংশ দখল করার লক্ষ্যে ব্রিটেন-ফ্রান্স-ইটালী-গ্রিস তুর্কী ভুখন্ডে ঢুকে যায় ( যদিও কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক নিজেদের ভুমি রক্ষা করতে সক্ষম হয় )।

সবচেয়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে , যুদ্ধ পরবর্তী মূল নেতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের সাথে! মার্কিন নেতৃত্বে পুরো দুনিয়া বদলে দেবার স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপ থেকে দেশে ফেরার পর মার্কিন কংগ্রেস উইলসনের সমস্ত প্ল্যান খারিজ করে দেয়, এবং নিজেদের ইউরোপীয়ান ঝামেলা থেকে দুরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়!!!!! ( যেটা শুরুতেই বর্ণিত নতুন বিশ্ব ব্যাবস্থা সফল করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে যায় )

এই অবস্থায়, ১০ বছর পেরিয়ে যায়। তখনো বিশ্ব জুড়ে ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্য ছিল এবং নিদৃষ্ট যোগ্য কোন নেতৃত্ব না থাকায় দেশগুলো নব্য লিবেরাল আইডিয়া ঠিক মত আত্মস্থ করতে ব্যার্থ হওয়ায়, ফলে "লীগ অব নেশন" কার্যত কাজ করতে পারছিল না! এবং রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষা করার নীতি এবং সামগ্রিক চিন্তার অভাবে ধীরে ধীরে এটা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে

এই অবস্থায়, বিজয়ী ব্রিটেন বা ফ্রান্স আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রনে অনাগ্রহী হয়ে নিজ নিজ হিসাব ঠিক রাখায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। ফ্রান্সের লক্ষ্যে ছিল জার্মানীর ভবিষ্যত যুদ্ধ করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্হ করে ফেলতে, কিন্তু ব্রিটেন হয়তো "নেপোলিয়ান" যুগের কথা স্বরন করে "ব্যালেন্স অব পাওয়ার" ঠিক রাখার জন্যই জার্মানীর সামরিক উপস্থিতির সমর্থন করে! এবং জার্মানী আবার নিজেদের সামরিক বাহিনী গঠনের অনুমুতি পায়! ( এটা একটা মহা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কারন ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত হয় এর দ্বারাই)

এরই মাঝে বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় "অর্থনৈতিক মহামন্দা" ( বর্তমান সময়ের মতই অবস্থা! ) করুন অর্থনৈতিক পরিবেশে ইটালীতে ফ্যাসিস্ট মুসলিনির আবির্ভাব ঘটে এবং জার্মানীতে নির্বাচিত হয়ে যায় এডলফ হিটলার!!!

অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় সব দেশই নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং চিরসত্য হলো, সামাজিক-অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল পরিবেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চেয়ে স্বৈরাচারী শাষন বেশী কার্যকর। তাই ফ্রান্স-ব্রিটেনের তুলনায় জার্মানী-ইটালী'র অর্থনীতি দ্রুত সংগঠিত হচ্ছিল!

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম পক্ষ, তুর্কী এইবার নিজেদের বেশ কৌশলে যুদ্ধ থেকে দুরে রাখে। যদিও তুর্কি জনগণ জার্মানদের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিল, কিন্তু তুর্কি সরকার মিত্র বাহিনীর সাথে মিত্রতা রক্ষা করে চলে পুরো সময়জুড়ে!

এবং এশিয়ার শক্তি জাপানও যখন ফ্যাসিস্ট নীতি গ্রহন করে তখন, জার্মানী-ইটালী ও জাপান ৩টি দেশ মিলে সারা বিশ্বে তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ব্যাবস্থা বদলে "জাতিভিত্তিক" নতুন ব্যাবস্থা প্রণোয়নের পরিকল্পনা গ্রহন করে।

এবং সেই লক্ষে কাজ করা শুরু করে দেয় শীঘ্রই!





যুদ্ধের নিরেট ইতিহাস :

পরবর্তী ইতিহাস বেশ সহজ!

ফ্যাসিস্ট ইটালি এবং জার্মানীর সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আংশিক জয়ী জাপানও সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়ে ফ্যাসিস্ট রিজিম কায়েম হয়!

এবং এই ৩ দেশ তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করে। ওদের দাবী ছিল, তৎকালীন ব্যাবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন এবং ফ্রান্সেরই সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করছে, অন্যদের ঠকাচ্ছে ঐ ব্যাবস্থা!

প্রথম আগ্রাসী হয় জাপান, ১৯৩১ সালে চীনের মাঞ্চুরিয়া, ১৯৩৭ সালে চীনের মুল ভুখন্ড দখল করে।

ইটালী ১৯৩৫ সালে আবিসিনিয়া এবং ১৯৩৯ আলবানিয়া দখল করে।

এবার এ্যাকশন শুরু করে হিটলার! তারও স্বপ্ন ছিল তৎকালীন বিশ্বব্যাবস্থা বদলে দিয়ে একটি জাতিভিত্তিক ব্যাবস্থা প্রনোয়ন করা। তার মতে তৎকালীন ব্যাবস্থা বদলে জার্মান জাতির সন্মান পুনরুদ্ধার এবং শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়!

১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়াকে জার্মানীর সাথে একীভুত করা হয়। ( যদিও অস্ট্রিয়ানরা বলে হিটলার এমনটা জোর করে করেছিল , কিন্তু আমার মনে হয় ঘটনা ভিন্ন )

১৯৩৯ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় বসবাসরত জার্মানদের নিরাপত্তার অজুহাতে চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে ফেলে!

ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ততদিনে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু জার্মান শক্তির কথা মাথায় রেখে ধৈর্য্য ধরে পর্যবেক্ষন করে যাচ্ছিল এবং নাৎসিদের চেক দখল পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল।

কিন্তু নাৎসীদের পরবর্তী সম্ভাব্য শিকার পোল্যান্ডের উপর নজর রাখছিল! এই অবস্থায় ২৩ আগস্ট ১৯৩৯ সালে দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়ে নাৎসি হিটলারের সাথে রাশিয়ার কম্যুনিস্ট নেতা স্ট্যালিন একটি অনাগ্রাসন চুক্তি সম্পন্ন করে!

রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যাবার পর ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এখন কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না চিন্তা করে জার্মানী একসপ্তাহ পরই ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমন করে!

কিন্তু নাৎসীদের অবাক করে দিয়ে, পোলিশদের পাশে দাড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স এবং তারা জার্মানীর বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করে দেয়!

হিটলার দ্রুতই প্রচন্ড শক্তিশালী জার্মান সেনাবাহিনীকে বলকান অঞ্চল, উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা করায়। তারা নরওয়ে, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, হল্যান্ড দখল করে নেয়। ফ্রেঞ্চ-ব্রিটিশ সব প্রতিরোধ উড়ে যায়! ১৯৪০ সালেই জুলাই মাসের মধ্যে প্যারিস পর্যন্ত দখল করে ফেলে নাৎসি জার্মানী! এবং ব্রিটেনের উপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়!

এরপরই ঘটে অদ্ভুদ সেই ভুল! কোন এক অজানা কারনে ব্রিটেন সম্পুর্ণ দখল না করেই সদ্য মিত্র রাশিয়া আক্রমন করে বসে! ( একই ভুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে করেছিল করেছিল জার্মান কাইজার দ্বিতীয় উইলহেইম )

এরপর অপেক্ষা করছিল তারচেয়ে বড় ভুল! জাপান পার্ল হার্বারে তখন পর্যন্ত যুদ্ধের বাইরে থাকা মার্কিন ঘাটি আক্রমন করে বসে!
( একই ভুল এর আগে করেছিল জার্মানি মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে)

এবং একই সময়ে জার্মানীও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করে!

জাপানী আক্রমন এবং জার্মান যুদ্ধ ঘোষনার প্রেক্ষিতে একঘরে নীতি বাদ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট ব্রিটেন ও সোভিয়েত বাহিনীর সাথে মিত্রতা করে যুদ্ধে যোগ দেয়!

এরপর আরো ৪ বছর জার্মানী চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া ফ্রন্টে যুদ্ধ করে যায় এবং কনসান্ট্রেশন ক্যাম্পে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে! রাশিয়ায় ব্যাপক সৈন্য হারিয়ে এবং মিত্র বাহিনীর বিমানহামলায় জার্মানীর অভ্যন্তর বিদ্ধস্ত হয়ে ব্যাপক শক্তি হারিয়ে এক পর্যায়ে ১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পন করে!

এরপর পরাজয়ের দাড়প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা জাপান সাধ্যমত লড়ে যাচ্ছিল কিন্তু জার্মানীর আত্মসমর্পনের ৩ মাস পর হিরোশিমা ও নাগাসাকির ২ টা এ্যাটম বোমার বিস্ফোরন তাদেরও আত্মসমার্পন তড়ান্বিত করে!

এবং ৫ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের প্রানের বিনিময়ে ৬ বছরের যুদ্ধ শেষে দুনিয়ার রাজনৈতিক ব্যাবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিবর্তনকামীদের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়!



বিজয়ের স্বাদ এরাই পেয়েছিল!



শেষ কথা :

২য় বিশ্বযুদ্ধের পেছনে প্রধান কারন ছিল, হিটলারের উচ্চাভিলাষী, আগ্রাসী স্বপ্ন। ২য় বিশ্বযুদ্ধের কারন হিসেবে হিটলারের "ইল এ্যাডভাইসড ডিসিশন" কে চিন্হিত করা হয়। এছাড়াও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি এবং কঠিন চুক্তির হাত থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্খা! এবং তৎকালীন সমাজে ফ্যাসিজমের জনপ্রিয়তা ( মুসোলিনি, হিটলার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্বৈরাচার ছিল! )

জার্মানী এমন সুযোগ পায় মূলত তৎকালীন বিশ্বে কোন একক ক্ষমতার উপস্থিতি ছিল না, যে মুরুব্বী রোল প্লে করতে পারবে। এবং "লীগ অব নেশন্স" গঠিত হলেও রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যমত না থাকায় এর অকার্যকর ভূমিকা শান্তিকামী মানুষদের হতাশ করেছিল!

ভাল অবস্থানে থেকেও "অক্ষ শক্তি"র ( জার্মানী-ইটালী-জাপান) যুদ্ধে পরাজয়ের মূল কারন আমার চোখে, ভুল স্ট্র‌্যাটেজি! ব্রিটেনের পতন নিশ্চিত করার আগেই রাশিয়ার শক্তিকে খাটো চোখে দেখে কাইজার উইলহেইমের মতই ভুল উপায়ে শীতকালে রাশিয়া আক্রমন করা। এর ফলে , পূর্ব-পশ্চিম উভয় ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হয়! তবে, জাপানের কারনে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে আগমন, ছিল সবচেয়ে বড় ভুল!

এছাড়াও নাৎসীদের চুড়ান্ত বর্বর উপায়ে মানুষ হত্যার একটি এফেক্টও ছিল হয়তো!





পরশিষ্ট : এমন একটি বিজয়ের পর বিশ্ব আর আগের ভুল করে নাই। যুক্তরাষ্ট্র আবার তার খোলশে গিয়ে ঢুকে নাই বরং আগ বাড়িয়ে এসে নেতৃত্ব নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। "জাতিসংঘ" প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব শান্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।

কিন্তু ততদিনে সোভিয়েত রাশিয়াও শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রিয়াল হয়ে গেছে! আর ততদিনে আক্ষরিক অর্থে "গ্লোবাল" দুনিয়ায় কম্যুনিস্ট সোভিয়েত এবং পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী নিজ আদর্শ ও স্বার্থ সংরক্ষন এবং প্রসারের লক্ষ্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই একে অপরের প্রতি সন্দেহবাদী হয়ে উঠে!

তাই তো, বিজয়ীদের মিত্রদের মাঝে সবচেয় শক্তিশালী ২টি রাষ্ট্রের ভেতরেই শুরু হয় স্নায়ু যুদ্ধ / কোল্ড ওয়ার! যা পৃথিবীকে কাঙ্খিত শান্তির স্পর্ষ থেকে দুরে রেখেছিল প্রায় ৪৪ বছর!

আগামীতে স্নায়ু যুদ্ধ / কোল্ড ওয়ার নিয়ে লিখবো!


আসলে ইতিহাস জানানো নয় বরং ইতিহাস বিশ্লেষনের উদ্দেশ্যে লেখা হচ্ছে এই সিরিজ। যেকোন তথ্যগত বা বিশ্লেষনজনিত ভুল পেলে জানাবেন দয়া করে, অথবা প্রশ্ন থাকলে সেটাও আলোচনার জন্য পেশ করুন। সবাই মিলে মিশে "সহজ ইতিহাস ও সহজ রাজনীতি"র উপর বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করা গেলে এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে ?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ


বর্তমান বিশ্ব ব্যাবস্থার রুপায়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করা একটি ঘটনা হচ্ছে ইউরোপীয়ান মহাযুদ্ধ যা প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ নামেই বেশী খ্যাত। ৪ বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে দেড়কোটি মানুষ প্রাণ যায় এবং ২ কোটি মানুষ আহত হয়, ৩টি সাম্রাজ্যের পতন হয়, নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং বিশ্বের মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে !!! 


ইতিহাস এমন ভয়াবহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কমই প্রত্যক্ষ করেছে!


এই ভয়াবহ দূর্যোগ কিভাবে বিশ্লেষন করা যায়? 


আজকের সহজ ইতিহাসে, সংক্ষেপে এবং সহজ ভাষায় এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারন খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো। তথ্যভিত্তিক নয় বরং বিশ্লেষন ভিত্তিক এই লেখাটির উদ্দেশ্য মূলত সাধারন ব্লগার পাঠক বন্ধুদের, ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার কারন সম্পর্কে অবগত করা , সেই সাথে অল্প কথায় যুদ্ধের গতি প্রকৃতিও জানিয়ে দেয়া । তবে বিষয়টা একটু ঝামেলার কারন, এই যুদ্ধের কোন নিরেট কারন খুজে বের করা যায় না! সেই চেষ্টা করলে ইতিহাসের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই আমরা কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনাবলী'র বিশ্লেষন করবো, এবং সবকিছুর একটা মিলিত যোগসুত্র স্থাপন করার চেষ্টা করবো! 




মনে রাখার ২টি বিষয় :


একটা বিষয় সব সময় মনে রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোন শত্রু-মিত্র নাই, আন্তর্জাতিক রাজনীতি'র মূলনীতিই হচ্ছে ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগীতা এবং "ব্যালেন্স অব পাওয়ার"! মানে, কোন রাষ্ট্রই চায় না অন্য একটা রাষ্ট্র এতটা শক্তিশালী হোক যা আগামীতে নিজেদের জন্য হুমকি হতে পারে।


এবং : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভুমি হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ন আরেকটা মনে রাখার বিষয় হলো, জার্মানী-অস্ট্রিয়া এবং ইটালীর মাঝে ১৮৮২ সাল থেকে সামরিক জোট গঠনের চুক্তি বলবৎ ছিল, ১৯০২ এ সেটা নবায়ন হয়। 


এবং এটার "কাউন্টার ওয়েট" হিসেবে ১৯০৪ সালে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স যৌথ সামরিক চুক্তি করে। 


ব্যাকগ্রাউন্ড :


এবার যুদ্ধের কারন ভাল করে বুঝার জন্য, আমরা তৎকালীন সময়ের দেশগুলোর অবস্থান কেমন ছিল সেটা দেখি :


মাত্র ১৮৭১ সালে জার্মানী একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদের যুগে ১৮৯৮ এ এসেই তাদের উচ্চাকাঙ্খী সম্রাট, কাইজার দ্বিতীয় উইলহেইমের মনে ইউরোপের বাইরেও সাম্রাজ্য স্থাপনের খায়েশ জাগে। অবশ্য জার্মান অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি সেই স্বপ্ন দেখার মত অবস্থানে ছিলও।


অপরদিকে রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসও ক্ষয়িষ্ণু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যের এলাকায় নিজ প্রভাব বিস্তারের দিকে নজর ছিল, এবং ঘরোয়া সমস্যা মানে তৎকালীন কম্যুনিস্ট বিপ্লব থেকে জনগণের নজর ফেরানোর জন্য এবং ক্ষমতা নিশ্চিতের জন্য একটি যুদ্ধজয় খুব ইতিবাচক মনে করে। এছাড়াও অস্ট্রিয়ার সুত্র ধরে সার্বিয়ায় জার্মান উপস্থিতি রাশিয়া একটি নিশ্চিত হুমকি স্বরূপ দেখে!


ভৌগলিকভাবে ইউরোপের বাইরে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র ব্রিটেন, প্রচন্ড শক্তিশালী নৌ-শক্তির অধিকারী সাম্রাজ্যটা এবং নৌ- সামরিক শক্তি দ্বারা তৎকালীন সময়ের অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে একক আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এর কলোনিগুলোর সাহায্যে তৎকালীন বিশ্বে ব্রিটেন ছিল একক পরাশক্তি। জার্মান উত্থান ছিল তার চোখে নিজ শক্তির প্রতি হুমকি! এবং জার্মান দৃষ্টি ছিল ব্রিটেনকে চ্যালেঞ্জ করা!


অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরী ও অটোমান সাম্রাজ্য ২টি অতীতে প্রচন্ড শক্তিশালী কিন্তু সেইসময় পতনের মুখে থাকা শক্তি, জার্মানীর সাহায্যে তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পাবার স্বপ্ন ছিলই।


ফ্রান্স তখন, আফ্রিকার কলোনী থেকে প্রাপ্ত সম্পদের কারনে বেশ ভাল কন্ডিশনে থাকলেও একটি শক্তিশালী জার্মানী মানেই তাদের ভয়াবহ ক্ষতি।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভৌগলিক ও সামরিক শক্তি ব্যাপক থাকলেও তাদের নীতি ছিল যেকোন ইউরোপীয়ান ঝামেলার বাইরে থাকা।












নিরেট ইতিহাস :


এমন অবস্থায়, ১৯১৪ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যের হবু সম্রাট, ডিউক ফার্ডিনান্ড সিংহাসনে আরোহনের কিছুদিন আগে সারায়েভো শহরে স্ত্রী সহ সার্বিয়ান বিচ্ছিন্নতাবাদী আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়! ( এটাকে দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হত্যা অথবা সবচেয়ে ভুল হত্যাকান্ড বললে ভুল হবে না! )
এর ফলে সিংহাসন বসা নিয়ে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্য মুশকিলে পড়ে, এবং সার্বিয়ার উপর যার পর নাই ক্ষুদ্ধ হয়। সার্বিয়া একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কিন্তু অস্ট্রিয়া একটি নিদৃষ্ট সময় বেঁধে দেয় প্রতিবেদন পেশ করার জন্য এবং বিচারের কিছু শর্ত বেঁধে দিয়ে তদন্ত কমিটিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি নিয়োগের দাবী জানায়। কিন্তু সার্বিয়া এর সব শর্ত মানতে অস্বীকার করে।


তখন জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেইম অস্ট্রিয়াকে সম্পুর্ন সমর্থন দেবার ঘোষনা দেয় এবং অস্ট্রিয়ান দাবীর সাথে সহমত পোষন করে। 


আক্রমানাত্মক পদক্ষেপ নেবার জন্য জার্মান সমর্থন অস্ট্রিয়ার জন্য ব্যাপক প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু জার্মানী-অস্ট্রিয়ার এই যৌথ শক্তি'র উত্থানের বিপক্ষে জার্মানীর ২ প্রতিবেশী ফ্রান্স এবং রাশিয়া সার্বিয়ার পেছনে এসে দাড়ায়। 


এবং অস্ট্রিয়ার দ্বারা সার্বিয়া আক্রমনের পরপর ভিন্ন ভিন্ন চুক্তি অনুসারে জার্মানী-অস্ট্রিয়ার সাথে ফ্রান্স- রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। 


এবং অন্য একটি জার্মান-অটোমান চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া যুদ্ধে যোগ দিলে অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানীর পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়ার কথা ছিল, তাই অটোমান সাম্রাজ্যও যুদ্ধে যোগ দেয়! 


জার্মানী নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমন করলে তখন পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন জার্মানীর বিপক্ষে যুদ্ধে ঘোষনা করে! 


১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক ( কম্যুনিস্ট) বিপ্লবের ফলে রাশিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করে। 


কিন্তু ফ্রান্স-ব্রিটেনকে রসদ যোগান দেয়ার অভিযোগে জার্মান সাবমেরিন যখন ৭টি যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ডুবিয়ে দেয় তখন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত যুদ্ধে যোগ দিয়ে এটাকে বিশ্বযুদ্ধ রূপ দেয়! এবং মুলত এরপরই জার্মান পরাজয় নিশ্চিত হয়! 


এটা তো ইতিহাস কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এর বিশ্লেষন, ইতিহাস কেন এমন হলো সেটার বিশ্লেষনই আমাদের লক্ষ্য!




বিশ্লেষন :


যুবরাজের হত্যার পর, জার্মানীর হিসাবে ছিল যে, সার্বিয়ার বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত, আঞ্চলিক যুদ্ধে বিজয়ের সম্ভাবনা আছে। তাই তারা অস্ট্রিয়াকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সার্বিয়ায় হামলা করার অনুমুতি দিয়ে দেয়। যা হয় বিরাট ভুল! 


জার্মানী অস্ট্রিয়াকে নজিরবিহীন সমর্থন দেয়ায় ভবিষ্যৎ জার্মান শক্তি'র সম্ভাবনায় আতংকিত ফ্রান্স এবং রাশিয়ার তরফ থেকে অনাকাঙ্খিত শত্রুতা ডেকে আনে!


রাশিয়া এবং ফ্রান্স সাথে সাথে যুদ্ধে যোগ দিলেও জার্মানী তাদের ভালই মোকাবেলা করছিল, কিন্তু ব্রিটেনের চোখে রাশিয়া এবং ফ্রান্সের তুলনায় একটি নতুন ও শক্তিশালী জার্মানী ছিল বড় হুমকী তাই তারা পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী ও নিজেদের ক্ষমতার সুরক্ষিত করার জন্যই জার্মানীর বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করে দেয়। ব্রিটেনের মত পরাশক্তির আগমন জার্মানীর জন্য ব্যাপক থ্রেট হয়ে দাড়ায়!


আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেই রাশিয়া পরাজিত হয়ে যুদ্ধত্যাগ করে। ব্যাপক সৈন্য ও সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি ও কম্যুনিস্ট প্রোপাগান্ডাই সম্রাটের পতন ও রাশান পরাজয় নিশ্চিত করে!


ইতিমধ্যেই ৩ বছর ধরে চলা যুদ্ধে এবং শীতকালে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমন করে ব্যাপক ক্ষতির শিকার জার্মান সেনাবাহিনী অদুরদর্শীতার পরিচয় দেয় আমেরিকান জাহাজে আক্রমন করে! জার্মান নৌ-বাহিনীর আক্রমন ঘুমন্ত দৈত্য যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে ডেকে এনে চুড়ান্ত জার্মান পরাজয় নিশ্চিত করে! ( এমন স্ট্র‌্যাটেজিক ভুল জার্মানদের দ্বারাই সম্ভব তা আবারো প্রমানিত হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধে ) 




আরেকটি কারন :


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম একটি কারন বলে চিন্হিত করা যায়, নব্য ও উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রসার! 


অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্য, অটোমান সাম্রাজ্য ২টিই তাদের মানচিত্রের বিভিন্ন অংশে এবং মুলত বলকান অঞ্চলে জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এলাকা হারাচ্ছিল। 


রাশিয়ার সম্রাট ( জার ) ধর্মীয় ( খ্রিষ্টান অর্থোডক্স ) ও ( স্লাভিক ) জাতীগত নৈকট্যের কারনে এবং রাশিয়ান নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে ও জাতীয় "প্রাইড" সমুন্নত রাখতে সার্বিয়ানদের পাশে দাড়ায়। 


১৮৭৮ এর যুদ্ধে জার্মানীর নিকট পরাজিত ফ্রান্স জাতীগতভাবেই জার্মানীর বিরোধীতাকারী ছিল! এবং আরো বেশী শক্তিশালী জার্মানী মানেই ফরাসী জাতি'র জন্য হুমকী!


আর যেই হত্যাকান্ড নিয়ে এত কাহিনী সেটাও জাতীয়তাবাদীরই কাজ! অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যের দক্ষিনের একটি অংশকে সার্বিয়ার সাথে একীভুত করার লক্ষ্যেই এক উগ্র জাতীয়তাবাদী সার্ব বসনিয়াক, যুবরাজ ফার্ডিনান্ডকে প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে হত্যা করে!








শেষ কথা :


প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে তাই গ্লোবালিজমের প্রথম পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রমান করা এবং ক্ষমতার লড়াই বললে বেশ সঠিক হয়। 


কারন শিল্পন্নোয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে নব্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা জার্মানীর উত্থান ফ্রান্স, ব্রিটেনের সাম্রাজ্যের জন্য নিশ্চিত হুমকি ছিল এবং এটা ঠেকানোর জন্যই ফ্রান্স-রাশিয়া-ব্রিটেন এবং সবশেষে যুক্তরাষ্ট্র একজোট হয়! এবং ৪ বছর ধরে চলা ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি নিশ্চিতের পর হাবসবুর্গ (অস্ট্রিয়ান) অটোমান (তুর্কিশ) এবং রোমানভ (রাশিয়ান) সাম্রাজ্যের মত ৩ টা শতাব্দী প্রাচীন একসময়ের প্রবল আধিপত্য বিস্তারকারী সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিতকারী পরজয় ভাগ্যে জুটে!


এবং নিজেদের আড়াল করার নীতি থেকে সরে এসে যুদ্ধের শেষ দিকে যোগ দিয়েই মুল নায়কের আসনে বসে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র! এবং প্রেসিডেন্ট উইলসনের নেতৃত্ব শুরু হয় দুনিয়ায় নতুন ধরনের রাজনীতি!




এই দম্পতি'র হত্যাকান্ড থেকেই এই দূর্যোগের সূচনা বললে ভুল হবে না!






কিন্তু যুদ্ধের পর পর সবাই যখন ভাবছিল যে এমন মানবসৃষ্ঠ দুর্যোগের আর পূনরাবৃত্তি ঘটবে না তখনই তৎকালীন বিজয়ী ও পরাজিত শক্তিগুলো এমন সব কান্ড করতে থাকে যা সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধের চেয়ে ভয়াবহ এবং দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরী করছিল!!!!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালিত হয়। এই যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল জার্মানি, ইটালি, জাপান, রুমানিয়া। এদের বলা হতো অ্যাকসিস পাওয়ার্স বা অক্ষশক্তি। অপর পক্ষে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা, সোভিয়েত রাশিয়া, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নরওয়ে। এদের বলা হতো এলাইস বা মিত্রশক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) সমাপ্তির পর যে ভার্সাই চুক্তি সম্পাদিত হয় তা খুবই অন্যায্য ছিল এবং এটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি এবং তুরস্ক এই পরাজিত দেশগুলোর প্রতি যে ব্যবহার করা হয় তা ছিল খুবই প্রতিহিংসামূলক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকার যে নীতি আমেরিকা অবলম্বন করে তাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ। ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ডকে আক্রমণ করে। এর ফলে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স তোষণনীতি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শিগগিরই অন্যান্য দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আকার ধারণ করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। ইউরোপীয় রণক্ষেত্রে যুদ্ধ শেষ হওযার পরও এশিয়া মহাদেশে আরো তিন মাস যুদ্ধ চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপের পর জাপান ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট আত্দসমর্পণ করে। এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। -মো. আশিফ হোসেন

অ্যাডলফ হিটলার


পৃথিবীজুড়ে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দুঃস্বপ্নে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতে সফল হতে পারেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত পরিসমাপ্তিতে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল জার্মানির বার্লিন শহরের এক গোপন বাংকারে আত্দহত্যা করে পুরো পৃথিবীকে এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ থেকে মুক্ত করে দিয়ে যান হিটলার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্টির পেছনের এই অন্যতম নায়ক অ্যাডলফ হিটলার ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার ব্রাউনাউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মসূত্রে একজন অস্ট্রিয়ান হওয়ার পরও ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সমগ্র জার্মানিকে শাসন করেছেন তিনি। জীবনের শুরু থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধানোর স্বপ্নে মাতোয়ারা হননি তিনি; বরং ইচ্ছে ছিল নামকরা চিত্রশিল্পী হওয়ার। পড়াশোনায় তেমন একটা ভালো ছিলেন না। ১৯০৭ সালে তাঁর মা মারা যাওয়ার পর তিনি ভিয়েনাতে এসে একাডেমী অব ফাইন আর্টসে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সে বছর আর ভর্তি হতে পারেননি। হতাশা আর ব্যর্থতা আঁকড়ে ধরতে শুরু করে তাঁকে।পরবর্তী বেশ কয়েক বছর তেমন আর কিছু করা হয়নি তাঁর। জীবন থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ১৯১৩ সালে হিটলার চলে আসেন মিউনিখ শহরে। এখানে আসার পরের বছর ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অস্ট্রিয়ান মিলিটারি সার্ভিসে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেনাবাহিনীতে কাজ করার মতো পরিপূর্ণ শারীরিক যোগ্যতা তাঁর ছিল না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে জার্মান সেনাবাহিনী এত কিছু আর যাচাই-বাছাই করেনি। জার্মানির ১৬তম ব্যারাভিয়ান রিজার্ভ ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্টের ভলান্টিয়ার সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান তিনি। ১৯১৬ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধে গুরুতর আহত হন হিটলার। দুই বছর পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যখন সমাপ্তি ঘটে তিনি তখন পর্যন্ত হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। যুদ্ধে বীরত্ব দেখানোর জন্য তাঁকে বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা দেওয়া হয়। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির পরাজয় হিটলারকে বিক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ করে তোলে। ১৯১৯ সালে ৩০ বছর বয়সে হিটলার মিউনিখের ছোটখাটো একটি ডানপন্থী দলে যোগ দেন। কিছুদিন পরেই এই পার্টির নাম পাল্টে রাখা হয় ঘধঃরড়হধষ ঝড়পরধষরংঃ বেৎসধহ ডড়ৎশবৎং' চধৎঃু সংক্ষেপে নাৎসি। পার্টিতে যোগ দেওয়ার দুই বছরের মধ্যে হিটলার হয়ে উঠলেন এই নাৎসি পার্টির অবিসংবাদিত নেতা। জার্মান ভাষায় যাকে বলা হতো ফুয়েরার।
হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টি দ্রুত শক্তি সঞ্চার করতে থাকে। ১৯২৩ সালের নভেম্বরে নাৎসিরা একটি ব্যর্থ অভ্যুথান প্রচেষ্টা চালায়। ইতিহাসে এটি ঞযব গঁহরপয ইববৎ ঐধষষ চঁঃংপয নামে খ্যাত। অভ্যুথান প্রচেষ্টা বরবাদ হয়ে গেলে হিটলার ধৃত ও কারারুদ্ধ হন। কিন্তু এক বছরেরও কম সময় জেল খাটার পর মুক্তি পেয়ে যান তিনি। ১৯২৮ সালেও নাৎসি পার্টির পরিসর অতটা চোখে পরার মতো ছিল না। কিন্তু তিরিশের দশকের শুরুতে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেওয়ার পর জার্মানির রাজনৈতিক অবস্থা পাল্টে যেতে শুরু করে।
জার্মানির পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জার্মানির সাধারণ মানুষ বীতশ্রাদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ১৯৩৩ সালে জানুয়ারি মাসেই জার্মানির শাসন ক্ষমতায় চলে আসে নাৎসিরা। আর হিটলার হয়ে যান জার্মানির চ্যান্সেলর। তাঁর বয়স তখন ৪৪ বছর। চ্যান্সেলর হয়েই হিটলার খুব দ্রুত একনায়কত্ব কায়েম করতে শুরু করেন। বিরোধী মতামতের তোয়াক্কা না করেই নিজের মতো করে জার্মানিকে শাসন করতে শুরু করেন। হিটলার যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নকশা আঁকতে শুরু করেছিলেন তখন কারো পক্ষেই তাঁকে বাধা দেয়া সম্ভব হয়নি। হিটলার যখন ভার্সাই চুক্তি অমান্য করেন তখন ব্রিটেন কিংবা ফ্রান্স কেউ কোনো প্রতিবাদ করার সময় পায়নি। নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান নিয়েই ক্রমাগত হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল তারা। আশপাশে সবাই এমন নিশ্চুপ থাকায় ১৯৩৬ সালের মার্চে রাইনল্যান্ড দখল করে নেন হিটলার। ১৯৩৮ সালের মার্চে অস্ট্রিয়াকে সংযুক্ত করলেন জার্মানির সঙ্গে। ওই বছরেরই সেপ্টেম্বরে হিটলার যখন চেকোস্লাভিয়ার সুরক্ষিত সীমান্ত পেরিয়ে সুডেটানল্যান্ড দখল করে নিলেন তখনো নিশ্চুপ ছিল ফ্রান্স এবং ব্রিটেন। চেকোস্লাভিয়ার সাহায্যে কোনো দেশ এগিয়ে না আসায় হিটলার কয়েক মাস পরেই সমগ্র দেশটাই কব্জা করে নিলেন।
কিন্তু হিটলারের পরবর্তী টার্গেট পোল্যান্ড রক্ষার্থে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স বদ্ধপরিকর ছিল। হিটলার প্রথমত নিজের সুরক্ষার খাতিরে ১৯৩৯ সালের অগস্টে স্টালিনের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির ৯ দিন পর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করল। আর চুক্তির ষোল দিন পর সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ চালাল পোল্যান্ডে। এদিকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।
এভাবেই তার হিটলার একে একে জড়িয়ে ফেললেন অনেকগুলো দেশকে, আর লাগিয়ে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (ইংরেজি: World War II, Second World War, WWII, WW2) মানবসভ্যতার ইতিহাসে এযাবৎকাল পর্যন্ত সংঘটিত সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ যা ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ এই ৬ বছর ধরে চলে। জার্মানির সাথে মিত্রপক্ষের যুদ্ধের মাধ্যমে এর সূচনা ঘটে। মিত্রপক্ষে প্রথমদিকে ছিল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং পোল্যান্ড। জার্মানির সাথে পরবর্তীতে ইতালি, জাপান যুক্ত হয়ে অক্ষশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জার্মানি কর্তৃক দখলকৃত কিছু দেশ হতেও অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী প্রেরিত হয়। বিশেষত পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধে এই সকল দেশের সৈন্যরা অংশগ্রহণ করে; অন্যান্য জাতিসমূহ মিত্রশক্তির সাথে যোগদান করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির সাথে যে-কোন ধরণের আক্রমণ থেকে বিরত থাকার মর্মে অনাক্রমণ চুক্তি নামে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালের ২২ জুন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে এবং এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর তারিখে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির সাথে যোগ দেয়। মূলত জার্মানি এবং জাপান দুই অক্ষশক্তিই যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ করার মাধ্যমে একে যুদ্ধে ডেকে আনে। অপরদিকে চীনের সাথে জাপানের ছিল পুরাতন শত্রুতা; ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ চলছিল। এর ফলে চীনও মিত্রপক্ষে যোগদান করে। ১৯৪৫ সালে জার্মানি এবং জাপান উভয় দেশের নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
এই ভয়াবহ যুদ্ধে আনুমানিক ৬ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ মারা যায় যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল রাশিয়ার নাগরিক। নিহতের এই সুবিশাল সংখ্যার মূল কারণ ছিল কিছু গণহত্যামূলক অভিযান। যেমন:


হলোকস্ট

জেনারেল ইশি শিরো নিয়ন্ত্রিত ৭৩১ নম্বর ইউনিট কর্তৃক পিংফানে পরিচালিত অভিযান
উত্তর আফ্রিকা, প্রশান্ত মহাসাগর এবং ইউরোপের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধসমূহ
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণ
জার্মানির ড্রেসডেন এবং ফর্ত্‌স্‌হাইম (Pforzheim), টোকিওসহ জাপানের অন্যান্য শহর এবং কোভেন্ট্রি ও লন্ডনসহ বৃটেনের কিছু শহরে অগ্নিবিস্ফোরণ
এই যুদ্ধে নব্য আবিষ্কৃত অনেক প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রয়োগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের। মহাযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই এই মারণাস্ত্র উদ্ভাবিত হয় এবং এর ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়েই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। সকল পুণর্গঠন কাজ বাদ দিলে কেবল ১৯৪৫ সালেই মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই যুদ্ধের পরপরই সমগ্র ইউরোপ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়; এক অংশ হয় পশ্চিম ইউরোপ আর অন্য অংশে অন্তর্ভুক্ত হয় সোভিয়েত রাশিয়া। পরবর্তীতে এই রাশিয়ান ইউনিয়নই ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহের সমন্বয়ে গঠিত হয় ন্যাটো আর সমগ্র ইউরোপের দেশসমূহের সীমান্তরেখা নির্ধারিত হতে শুরু করে। ওয়ারস প্যাক্টের মাঝে অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ নিয়ে দানা বেঁধে উঠে স্নায়ুযুদ্ধ। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বমঞ্চে অভিনব এক নাটকের অবতারণা করে।

কারণ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। তবে এ নিয়ে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যা অনেকাংশে গ্রহণযোগ্য। এই কারণটি যুদ্ধোত্তর সময়ে মিত্রশক্তির দেশসমূহের মধ্যে তোষণ নীতির মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় যা নির্দেশক শক্তির ভূমিকা পালন করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্স। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এবং জাপানের আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদকে দায়ী করে এই কারণটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে যার বিস্তারিত এখানে উল্লেখিত হচ্ছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি তার সম্পদ, সম্মান এবং ক্ষমতার প্রায় সবটুকুই হারিয়ে বসে। এর সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারার মূল কারণ ছিল জার্মানির হৃত অর্থনৈতিক, সামরিক এবং ভূমিকেন্দ্রিক সম্পদ পুণরুদ্ধার করা এবং পুণরায় একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। এর পাশাপাশি পোল্যান্ড এবং ইউক্রেনের সম্পদসমৃদ্ধ ভূমি নিয়ন্ত্রণে আনাও একটি উদ্দেশ্য হিসেবে কাজ করেছে। জার্মানির একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর সম্পাদিত ভার্সাই চুক্তি হতে বেরিয়ে আসার। এরই প্রেক্ষাপটে হিটলার এবং তার নাজি বাহিনীর ধারণা ছিল যে একটি জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে দেশকে সংগঠিত করা সম্ভব হবে।


যুদ্ধ শুরু

পোল্যান্ড যুদ্ধ

কোবরিনের যুদ্ধ (সেপ্টেম্বর ১৭,১৯৩৯)-মানচিত্রে জার্মান দ্বিতীয় মোটোরাইজড ডিভিশনের অগ্রযাত্রা এবং পোলিশ বাহিনীর পিছু হটা
নাৎসি বাহিনীর পোল্যান্ড আক্রমণএর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিষ্ক্রিয় রাখার জন্য জার্মানী অনাক্রমণ চুক্তি করে। অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের সাথে সহায়তা চুক্তি করে। ১লা সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড অভিযান শুরু হল। ৩রা সেপ্টেম্বর মিত্রবাহিনী জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল এবং শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
প্রথম দিনই জার্মান ঝটিকা বাহিনী পোল্যান্ডকে ছিন্নবিছিন্ন করে দিল। ফরাসি ও ব্রিটিশ বাহিনী সাহায্য করবার সুযোগ পেল না। এটি পশ্চিমের বিশ্বাসভঙ্গতা হিসেবে পরিচিত। ১৭ই সেপ্টেম্বর গোপন সমঝোতা অনুসারে সোভিয়েত বাহিনীও আক্রমণে যোগ দিল। পরদিনই পোলিশ কর্তাব্যক্তিরা দেশ ছাড়লেন। ওয়ারস পতন হলো ২৭শে সেপ্টেম্বর। শেষ সেনাদল কক্ দূর্গে যুদ্ধ করে ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত।

[সম্পাদনা]সোভিয়েত ফিনল্যান্ড যুদ্ধ

জার্মানী বনাম মিত্রপক্ষীয় যুদ্ধ চলাকালীন সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করে শীতকালীন যুদ্ধের সূচনা করল। এর আগেই লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়ায় সোভিয়েত সৈন্য প্রবেশ করে ক্ষতিপূরণসহ একটি অনুরূপ প্রস্তাবে ফিনল্যান্ড রাজী না হওয়ায় ৩০শে নভেম্বর ১৯৩৯ সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করল। ফিন লোকবল খুবই কম হলেও তাদের দেশরক্ষার ইচ্ছা ছিল অনেক বেশী। স্তালিন একটি নিজস্ব ঝটিকা যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্ত প্রতিটি ফ্রন্টে তার বাহিনী প্রতিহত হয়। ১৪ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বহিষ্কার করা হলো।
নতুন বছরের ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে সোভিয়েত বিমানট্যাঙ্ক ও স্লেজবাহিত সেনাবাহিনী একযোগে ফিনদের প্রতিরক্ষা রেখায় আক্রমণ চালানো শুরু করে। ১৫ দিন পর অবশেষে তারা একটি ফাঁক তৈরি করতে পারল। ফলে যুদ্ধের ভাগ্য পরিষ্কার হয়ে গেল। ৬ই মার্চ ১৯৪০ ফিনল্যান্ড শান্তির জন্য আবেদন করল। সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের আগের দাবী অনুযায়ী লেলিনগ্র্রাদের কাছাকাছি বেশকিছু এলাকার মালিকানা ছেড়ে দিতে হয় ফিনল্যান্ডকে। এ যুদ্ধে ২ লক্ষ ফিন সৈন্যের মধ্যে ৭০ হাজার সৈন্য মারা যায়। যুদ্ধ থেকে স্তালিনের সেনাদল গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিক্ষা লাভ করলো। অন্যদিকে সোভিয়েত শক্তি সম্পর্কে হিটলারের ভ্রান্ত নিম্ন-ধারণা তৈরি হয়-যা পরবর্তীতে জার্মানীর রাশিয়া আক্রমণের সময় কাজে এসেছিলো।

[সম্পাদনা]নরওয়ে ও ডেনমার্ক

নরওয়ে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তার ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য। সুইডেনের কিরুনা খনি থেকে গরমকালে বাল্টিক সাগর দিয়ে এবং শীতকালে নরওয়ের বরফমুক্ত নারভিক বন্দর ও নরওয়ের রেলপথ দিয়ে লোহা চালান যেত জার্মানীতে। প্রথমে হিটলার নরওয়েকে নিরপেক্ষ থাকতে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওদিকে মিত্রপক্ষ নারভিকের ঠিক বাইরের সমুদ্রে মাইন পেতে রাখার পরিকল্পনা করে।পরিকল্পনাটি ফাঁস হয়ে গেলে হিটলার ফ্রান্স আক্রমণের ইচ্ছা স্থগিত রেখে নরওয়ে অভিযানের নির্দেশ দিল। ৯ই এপ্রিল একই সাথে নরওয়ে ও ডেনমার্কে নরওয়ের সাথে যোগাযোগের সুবিধার্থে আগ্রাসন শুরু হল।
একদিকে নারভিকসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলি দখল করে নিল জার্মান বাহিনী। অন্যদিকে বিমানবন্দরগুলিতে অবতরণ করলো প্যারাশ্যুট বাহিনী। এরপর বিমানবন্দর দখল করে সেখান থেকে অতর্কিতে শহরে প্রবেশ করলো জার্মান সেনা। ডেনমার্ক বিনাবাধায় আত্মসমর্পণ করলেও নরওয়ে লড়াই করতে লাগলো। ১৪ই এপ্রিল মিত্রবাহিনী নামলো নরওয়েতে। কিন্ত মে মাসেই পিছু হটলো তারা। নারভিকে জার্মানরা পাঁচগুণ বেশী শত্রুর সাথে লড়াই চালিযে যাচ্ছিল ২৭শে মে পর্যন্ত। কিন্ত ততদিনে ফ্রান্সের পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে ওঠায় মিত্রসৈন্যদের ফিরিয়ে নিতে হল নরওয়ে থেকে। নরওয়ে বাহিনী আত্মসমর্পণ করলো এবং রাজা সপ্তম হাকোন ব্রিটেনে আশ্রয় নিলেন। জার্মানীর জন্য নরওয়ে আর্কটিক সাগর এবং ব্রিটেনের নিকটবর্তী একটি দরকারী নৌ ও বিমান ঘাঁটি হিসেবে কাজে দিল।

[সম্পাদনা]ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ

১০ই মে ১৯৪০ একসাথে চারটি দেশ আক্রমণ করে ভুয়া যুদ্ধের ইতি টানল জার্মানী। ফরাসিরা ভেবেছিল আক্রমণ আসবে ফ্রান্স জার্মানী সীমান্তের রণরেখা ম্যাগিনোট লাইনের ওপর। অথবা বেলজিয়ামের ভিতর দিয়ে আমুর হয়ে। তারা ভেবেছিল জার্মানীর প্যানজার বাহিনী আরদেনের জঙ্গল ভেদ করে আসতে পারবে না। ১৪ই মে নেদারল্যান্ডের পতন ঘটলো। ১৪ই মে আরদেন থেকে জার্মান বাহিনী বেরিয়ে এসে দিশেহারা মিত্র সেনাদের ছিন্নবিছিন্ন করে প্রবল বেগে এগোতে থাকল। ডানকার্ক বন্দর দিয়ে তড়িঘড়ি ফরাসি ও ব্রিটিশ অভিযানবাহিনীর সেনা পশ্চাদপসরণ শুরু হলো। ২৬শে মে থেকে ৪ঠা জুন ইতিহাসের বৃহত্তম সেনা অপসারণের কাজ শেষ হলো। তবে ফেলে আসতে হলো বেশীরভাগ যন্ত্রাদি। এরমাঝে ২৭শে মে বেলজিয়ামের পতন হলো।
১০ই জুন ইতালিও যুদ্ধ ঘোষণা করল। তবে তারা আক্রমণ শুরু করে ২০শে জুন থেকে। ফরাসি সরকার প্রথমে তুর ও পরে বোর্দোতে সরে গেল। ১৪ই জুন প্যারিসের পতন ঘটল। ১৬ই জুন প্রধানমন্ত্রী রেনো পদত্যাগ করলেন ও তার বদলে এলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নায়ক পেত্যাঁ। ২২শে জুন জার্মান-ফরাসি এবং ২৪শে জুন জার্মান-ইতালীয় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফ্রান্সের বেশিরভাগ এলাকা জার্মানী নিয়ে নেয়। অল্প কিছু জায়গা জুড়ে পেঁত্যা একটি নিরপেক্ষ কিন্তু জার্মানীর প্রভাবাধীন সরকার গঠন করেন। এটিভিশি ফ্রান্স নামে পরিচিত হয়।

[সম্পাদনা]বাল্টিক অঞ্চল

পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের জন্য রুমানিয়ার প্লোইস্তি তেলের খনি হিটলারের প্রয়োজন ছিল। ১৯৪০ সালে জার্মানী-রুমানিয়া তেল-অস্ত্র চুক্তি হল। হাঙ্গেরি ও রুমানিয়ার মতবিরোধ ঘটায় জার্মানী মধ্যস্থতা করে। রুমানিয়ার জনগণ এতে আন্দোলন শুরু করায় রাজা ২য় ক্যারল ছেলে মাইকেলের কাছে মুকুট হস্তান্তর করলেন ও সেনাপ্রধান আন্তনেস্কু জার্মান সেনা আহ্বান করলেন। ১২ই অক্টোবর ১৯৪০ বুখারেস্টে জার্মান সৈন্য অবতরণ করে। এতে কুটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিরক্ত মুসোলিনি ২৮শে অক্টোবর, ১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দে আলবেনিয়া থেকে গ্রীস আক্রমণ করলেন। কিন্তু গ্রীকরা যে শুধু প্রতিহত করল তাই না, উল্টো ডিসেম্বরের মধ্যে আলবেনিয়ার এক-তৃতীয়াংশ দখল করে ফেলল। উপরন্তু ক্রীটে ব্রিটিশ সৈন্য নামল। তুরস্কও সৈন্যসমাবেশ করে রাখল। আপাত-নিরপেক্ষ বুলগেরিয়া এবং যুগোস্লাভিয়াও বেঁকে বসল।
হিটলার দ্রুত হাঙ্গেরি, রুমানিয়া ও স্লোভাকিয়াকে অক্ষচুক্তিতে টেনে নিল। বুলগেরিয়ায় জার্মান সৈন্য নামল ২রা মার্চ। যুগোস্লাভিয়ার যুবরাজ পল অক্ষে যোগ দিলেন ২৭শে মার্চ। দু'দিন পর জেনারেল সিমোভিচের নেতৃত্বে রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে এবং সিংহাসনে আরোহন করেন ১৭ বছর বয়সী রাজা ২য় পিটার। রাষ্ট্রীয় নীতিরও পরিবর্তন ঘটে। ৬ই এপ্রিল একই দিনে আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ এবং বুলগেরিয়া ও অস্ট্রিয়া দিয়ে সৈন্য পাঠিয়ে জার্মানী গ্রিস ও যুগোস্লাভিয়া আক্রমণ করল। ১৭ই এপ্রিল যুগোস্লাভিয়া ও ২২শে এপ্রিল গ্রিস আত্মসমর্পণ করে। এরপর ক্রীট দখল করা হয়। যুগোস্লাভিয়াকে খন্ড-বিখন্ড করে অক্ষশক্তিরা ভাগ করে নেয়। তবে পুরো যুদ্ধজুড়ে দ্রজা হিমাজলোচির নেতৃত্বে সেন্টিক দল এবং জোসেফ টিটো'র নেতৃত্বে কমিউনিস্ট দল গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে যায়।


Wednesday, June 20, 2012

Semiconductor Symbols and Abbreviations


Semiconductor Symbols and Abbreviations
AAmpere (AC rms or DC)hieCommon emitter small-signal short-circuit input impedance (base input)
aAmpere (peak)hobCommon base small-signal open-circuit output admittance (emitter input)
BBase electrodehocCommon collector small-signal open-circuit output admittance (base input)
BVBreakdown voltagehoeCommon emitter small-signal open-circuit output admittance (base input)
BVCOBBreakdown voltage, collector-to-base junction reverse biased (emitter open)hrbCommon base small signal open-circuit reverse transfer voltage ratio (emitter input)
BVCEOBreakdown voltage, collector-to-emitter junction reverse biased (base open)hrcCommon collector small signal open-circuit reverse transfer voltage ratio (base input)
BVCERBreakdown voltage, collector-to-emitter junction reverse biased (specified resistance)hreCommon emitter small signal open-circuit reverse transfer voltage ratio (base input)
BVCESBreakdown voltage, collector-to-emitter junction reverse biased (base shorted)isurgeSurge current
BVCEXBreakdown voltage, collector-to-emitter junction reverse biased (base-emitter back biased)IBAverage base current (DC)
CCapacitance; collector electrodeIbInstantaneous base current (AC rms)
CeInternal collector junction capacitance.ibBase current (peak)
C(dep)Depletion layer capacitancemWMilliwatt (Max., Average, or rms)
C(dif)Diffusion capacitancemwMilliwatt (peak)
CibInput Capacitance, common baseNFNoise figure
ICCollector current (DC)nsecNanosecond (Millimicrosecond)
IcCollector current (AC rms)PPower dissipation of all terminals (average total)
icCollector current (peak)pPower dissipation of all terminals (peak)
ICBO, ICOCollector cutoff current (emitter open)PbPower dissipation of base (average)
ICEOCollector cutoff current (base open)pbPower dissipation of base (peak)
ICERCollector cutoff current (specified resistance base-emitter)PcPower dissipation of collector (average)
ICERVCollector cutoff current (reverse voltage on base)pcPower dissipation of collector (peak)
IEAverage emitter current (DC)PdPower dissipation of device (average)
IeInstantaneous emitter current (AC rms)PePower dissipation of emitter (average)
ieInstantaneous emitter current (peak)pePower dissipation of emitter (peak)
IEBOEmitter cutoff current (collector open)PIVPeak inverse voltage
IFForward current (DC)QTransistor
iFForward current (DC)rb', rBB'Internal base spreading resistance
iFrForward recovery current (specified instantaneous value)RBExternal base resistance
IOOutput current (DC)RCExternal collector resistance
IRReverse current (DC)REExternal emitter resistance
iRReverse current (peak)RsatSaturation resistance
iRrReverse recovery current (specified instantaneous value)RLResistance, load
IZAverage Zener currentTTemperature
IZKZener knee currenttTime
IZMZener maximum currentTATemperature, ambient
IZTZener test currentTCTemperature, case
iZInstantaneous Zener current (AC rms)TCBVTemperature coefficient of breakdown voltage
KKilohmtdPulse delay time
LCConversion losstfPulse fall time
mAMilliampere (average)tfrForward recovery time
maMilliampere (peak)TjJunction temperature
mAa-cMilliampere (AC rms)tPPulse time
mAd-cMilliampere (DC)trPulse rise time
µAMicroampere (average)tsPulse storage time
µaMicroampere (peak)VVolt (DC)
CLLoad capacitancevVolt (peak)
CobOutput capacitance, common baseVa-cVolt (AC)
CoeOutput capacitance, common emitterVBBBase voltage (DC) supply
EEmitter electrodeVBEEmitter voltage (DC) (base to emitter)
fabCommon base small-signal short-circuit forward current transfer-ratio cutoff frequency (emitter input)VCCCollector voltage (DC) supply
faeCommon emitter small-signal short-circuit forward current transfer-ratio cutoff frequencyVCEsatCollector to emitter saturation voltage
frefReference frequencyVECEmitter voltage (DC) (emitter to collector)
foscMaximum frequency of oscillationVEEEmitter voltage (DC) supply
fpgPower gain cutoff frequencyVfeFloating potential
GbPower gain (common base)VFForward voltage drop
GcPower gain (common collector)VOOutput voltage (DC)
GePower gain (common emitter)vOOutput voltage (DC)
gM, gFEStatic or DC transconductanceVPTVoltage, punch-through
gmSmall-signal transconductanceVRReverse voltage (DC)
GM, GFELarge-signal transconductanceVrReverse voltage (peak)
hfbCommon base small signal short-circuit forward current transfer-ratioVZZener voltage
hfeCommon emitter small-signal short-circuit forward current transfer-ratio (base input)WWatts (Max., Average, or rms)
hFECommon emitter DC short-circuit forward current transfer-ratio current gain (IC / IB)wWatts (peak)
HFECommon emitter large-signal short-circuit forward current transfer-ratioZzZener impedance
hibCommon base small-signal short-circuit input impedance (emitter input)ZzkZener impedance, knee
  ZztZener impedance, test