Wednesday, August 15, 2012

মুক্তিযুদ্ধের জয়রথের মাইলফলক



মুক্তিযুদ্ধের জয়রথের মাইলফলক
মুহম্মদ সবুর

 সারা বাংলা তখন জেলখানা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দখল করে নিয়েছে বাংলার সীমান্ত অঞ্চলগুলো। প্রতিদিন চলছে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালি হত্যা, ঘরবাড়ি-দোকানপাটে অগি্নকাণ্ড, লুটপাট, ধর্ষণ, অপহরণ। বীভৎসতার ভেতর অবরুদ্ধ বাংলার সাত কোটি মানুষ। অর্ধকোটি শরণার্থী দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র, রসদ সরবরাহ নেই তেমন। শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য নেই ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও যথাযথ প্রশিক্ষণ। সাহায্যকারী এবং আশ্রয়দাতা দেশ ভারতও তখন প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র জোগানে দ্বিধাগ্রস্ত। তাদের সৈন্যরাও প্রত্যক্ষ সমরে তখনো দাঁড়ায়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত তখন সঙ্গীহীন। তাই তাকে নিতে হচ্ছে সতর্ক পদক্ষেপ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান তবুও ভারত অব্যাহত রাখে। তাদের সেনাবাহিনী এই প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। জুলাই মাস পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা বড় ধরনের হামলা চালাতে পারেনি। তবে গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত রাখে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন চলছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের হানাদার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে আঁতাত করে। গোপনে মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার চীন সফর করেন জুলাই মাসে। চীন-মার্কিন আঁতাতে ভারত এবং বাংলাদেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যাকে শুধু সমর্থন নয়, তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ দিয়ে সাহায্য করে এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্রান্তিকালে এক অস্থির সংকটময় পরিস্থিতি। একদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান ত্রিশক্তি বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান থেকে ভারতবিরোধিতায়। আর ভারত তখন বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ সর্বার্থে। এ পরিস্থিতিতে সম্পাদিত হলো ভারত-সোভিয়েত ১৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি। ভারত ও বাংলার মুক্তিকামী জনগণ বুঝল, এই মৈত্রী চুক্তি সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য। এই চুক্তির পর পরই বাঙালি যোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায়। গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দূর হয়ে আসে। প্রবাসী সরকার সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে। চুক্তিতে প্রতিরক্ষা বিষয়ে একটি ধারা রাখা হয়। চুক্তির ৯ নম্বর ধারায় 'যেকোনো সংঘর্ষে এবং বাইরের শত্রুর হুমকি ও আক্রমণের সময় পরস্পরের সাহায্যে এগিয়ে আসার' প্রতিশ্রুতি রাখা হয়। এই যৌথ চুক্তি ভারতের জনগণ এবং ভারত সরকারের মনোবলও যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়। এই চুক্তি তখন প্রমাণ করে, বিশ্ব অঙ্গনে ভারত আর একা নয়। তারা আশ্বস্ত হয়, বাংলাদেশ প্রশ্নে এবং শরণার্থীসহ এ সমস্যা সম্পর্কে ভারতের যেকোনো যৌক্তিক পদক্ষেপ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন লাভ করবে। বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত একা নয়। বরং বৃহৎ শক্তি তার পাশে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই চুক্তির আগে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টায় খুব সতর্ক এবং হিসেবি পদক্ষেপ নিয়েই এগোচ্ছিলেন। চুক্তি সইয়ের ফলে ইন্দিরা আরো বলিষ্ঠ এবং সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করার পদক্ষেপ নেন। ভরসা তখন, এই সহায়তা দানে যদি ভারতের সংহতি বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় কিংবা তাতে কোনো আক্রমণের সম্মুখীন হয়, তাহলে ভারতের সহায়তায় সরাসরি, প্রত্যক্ষভাবে এগিয়ে আসবে সোভিয়েত ইউনিয়ন। মুক্তিযুদ্ধে এই চুক্তির প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছিল। ভারত ও বাংলাদেশ_উভয় দেশের সরকার এবং জনগণের মধ্যে সাহস ও উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো।
মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এক নতুন উৎসাহ, শক্তি-সাহস ও অনুপ্রেরণা। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ভূমিকা অনেকাংশে বেড়ে গেল। এই প্রথমবারের মতো মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ নিউটনের আপেলের মতো যোদ্ধাদের পক্ষেই গড়িয়ে পড়ছে।
ভারতের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নতুন মোড় এনে দিয়েছিল। 'গণচীনের বিরুদ্ধে ভারত তার নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে'_এমনটা বিবেচনা করার পর ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সামরিক বাহিনীকে পরোক্ষ অবস্থান থেকে প্রত্যক্ষ ভূমিকায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেন। 'নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা উপেক্ষা করে কোনো সরকারই সামরিক তৎপরতা পরিচালিত করতে পারে না'_ইন্দিরা গান্ধীর উপলব্ধিতে এটা ছিল। সেদিক থেকে পাকিস্তানের পক্ষে গণচীনের প্রত্যক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ হুমকি নিষ্ক্রিয় করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এই চুক্তির সামরিক অংশ সংযোজনের পর ভারতের দৃঢ় অবস্থান অনেকটাই নিশ্চিত হয়। এরই প্রতিফলনে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। ভারতীয় বাহিনী দূরপাল্লার ভারী কামান থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। কোথাও কোথাও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অপারেশনেও নামে। ইন্দিরা গান্ধীর জানা ছিল, পাকিস্তানের পক্ষে এককভাবে ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্য কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অবশ্য পাকিস্তান-চীন সম্মিলিত সামরিক তৎপরতা ভারতের জন্য যে বিপজ্জনক, সেই উপলব্ধি ইন্দিরা ১৯৭১ সালের জুনেই করেছিলেন। তবে চুক্তির পর ইন্দিরা নিশ্চিত হন, পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সরাসরি সামরিক তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়। আর সেপ্টেম্বরে তো খোদ চীনের ক্ষমতা দখল নিয়ে মাওবাদীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব তুঙ্গে।
কোসিগিন ও ইন্দিরার পক্ষে সম্পাদিত মৈত্রী এবং সহায়তা চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধারাও দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারও মার্কিন-চীন আঁতাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিল। এই দুই দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকে তখনো সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমর্থন দিতে থাকে। বাংলাদেশ এ অবস্থায় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন লাভের জন্য সরাসরি প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু আশানুরূপভাবে ফলপ্রসূ হয়ে উঠছিল না। আর সোভিয়েত সমর্থনও ভারতের মাধ্যম ছাড়া পাওয়ার কোনো বিকল্প ছিল না। সেই সময় এই মৈত্রী চুক্তি যেন বাংলাদেশকে চীন-মার্কিন-পাকিস্তান_এই ত্রিশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে আরো দৃঢ় করে। মুক্তিযোদ্ধারা 'জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য' পদক্ষেপে শত্রু হননে মত্ত হয়। মার্কিন ও চীন মিলে বাংলাদেশের বিষয়টিকে মার্কিন বনাম রাশিয়ার মধ্যে একটি প্রতিযোগিতায় দাঁড় করিয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত করেছিল। যদিও নিঙ্ন বাংলাদেশের সমস্যাটিকে দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করার জন্য স্মৃতিকথায় বলেছেন। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এই চুক্তিকে একটি 'বম্বশেল' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি নিশ্চিত করেন, ভারত এবার পাকিস্তান আক্রমণ করতে যাচ্ছে। কিসিঞ্জার এর আগে সব সময় দাবি করে এসেছেন, ভারত পাকিস্তানকে গ্রাস করতে বদ্ধপরিকর। নিদেনপক্ষে 'আজাদ কাশ্মীর' দখলে নিতে সে দৃঢ়। কিন্তু মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিশেষজ্ঞরা কিসিঞ্জারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তাঁদের ভাষ্য, এই চুক্তি মোটেই কোনো 'বম্বশেল' নয়। এ ধরনের একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে, এ কথা এক বছর আগে থেকেই সবার জানা ছিল। চুক্তি সইয়ের পরও এ নিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট কোনো বাড়তি উত্তেজনা দেখায়নি। তাদের দৃষ্টিতে অবশ্য চুক্তিটি ইন্দিরা গান্ধীর জন্য অবশ্যই একটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয় ছিল। সেই সময়কার বাস্তবতায় দেখা যায়, অভ্যন্তরীণভাবে এই চুক্তির ফলে দেশের ভেতর ইন্দিরা তাঁর অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে চীন এবং আমেরিকা তার পক্ষাবলম্বন করবে_এমন একটা আশঙ্কা ভারতের মতো বাংলাদেশের জনগণেরও অনেকের মধ্যেই ছিল। এই চুক্তির ফলে সেই ভয় দূর এবং যোদ্ধা ও জনগণের মধ্যে সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল। স্টেট ডিপার্টমেন্টের দলিল থেকে দেখা যায়, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আঁতাতের যে গোপন তৎপরতা চলছিল, ভারতের অগোচরে পাকিস্তানের হাত ধরে সেই পথে এগোনোর ফলে কিসিঞ্জার ও নিঙ্ন ভারতকে জোর করেই সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।
১৯৬৯ সাল থেকে যে প্রক্রিয়া ইয়াহিয়ার মাধ্যমে নিঙ্ন-কিসিঞ্জার চালিয়ে আসছিলেন চীন-মার্কিন সম্পর্কোন্নয়নে, সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের জন্য যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাসে নাম লেখানোর জন্য নিঙ্ন-কিসিঞ্জার ২৫ মার্চের ইয়াহিয়ার গণহত্যাসহ বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার নারকীয় বীভৎস অপকর্মকে সমর্থন দিতে থাকেন। ঢাকা ও দিলি্লর মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাংলাদেশে প্রতিদিন গণহত্যা ও ধর্ষণসহ পাকিস্তানি বাহিনীর অপকর্মের ওপর প্রতিবেদন হোয়াইট হাউসে পাঠালেও নিঙ্ন-কিসিঞ্জার তা গ্রাহ্য না করে ইয়াহিয়াকে সমর্থন দিতে থাকেন। অথচ পাকিস্তানি বাহিনী মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে বাংলাদেশে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল। সামরিক সন্ত্রাসকে নিঙ্ন-কিসিঞ্জার শেষ পর্যন্ত সমর্থন করেছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত বিষয়ে রাশিয়া ও পোল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দেশকে সেই সময় পায়নি ভারত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আসে। আর প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে রাশিয়া দুই দফা ভোট দেয়। পরে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি এলে এর পক্ষে ছিল ১০৪টি দেশ আর বিপক্ষে ছিল মাত্র ১১টি দেশ। ভারত ও রাশিয়া তখন প্রায় একা। ভুটান ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশ তখন ভারতকে সমর্থন জানায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে হুমকি দেওয়ার যে চেষ্টা করে, তাও অসার মাত্র। সেই নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পেঁৗছার আগেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। নিঙ্ন ও কিসিঞ্জার পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন_চীনের সঙ্গে আঁতাত সেই সময় আমেরিকার জন্য সবচেয়ে প্রধান স্বার্থ ছিল।
১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের কাছে পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে মৃদু আপত্তি জানায়। তার পরই 'মস্কো-দিলি্ল প্রতিরক্ষা চুক্তি'র আলোচনা সামনে আসে। সোভিয়েত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্শাল গ্রোচকো চুক্তির যে খসড়া করেন, তাতে ১৯৭১ সালে এসে প্রতিরক্ষা ধারাটি সংযোজন করা হয়। ১৯৭০ সালের মার্চ মাস থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন ২৮ মার্চ এক বার্তায় ইয়াহিয়া খানকে ঢাকায় রক্তপাত বন্ধ করার আহ্বান জানান। ৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নিও সাধারণ মানুষের ওপর সামরিক অভিযান বন্ধের জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বার্তা পাঠান। এরপর ১৭ এপ্রিল আরো একটি বার্তা পাঠান কোসিগিন। বার্তায় উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। অবশ্য রাশিয়া চায়নি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করে প্রভাব ও শক্তি বৃদ্ধি করুক। বাংলাদেশে গণহত্যা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন, মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলা ইত্যাকার ঘটনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটা ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রেখে চলছিল। কিন্তু জুলাই মাসে চীন-যুক্তরাষ্ট্র আঁতাত সোভিয়েতকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এর পরই সোভিয়েত-ভারত চুক্তি সই হয়। পাকিস্তানিরা অবশ্য এই চুক্তিতে তেমন উদ্বিগ্ন হয়নি। তারা ধরে নিয়েছিল, এই চুক্তি পাকিস্তানবিরোধিতার চেয়ে অধিকতর চীনবিরোধী। আবার এই চুক্তির কোনো খবর চীনের গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়নি। চুক্তি সইয়ের পর ইন্দিরা গান্ধী ২৭ সেপ্টেম্বর তিন দিনের সফরে মস্কো যান এবং পরিস্থিতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে রাজি করান। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশও বাংলাদেশের পক্ষ সমর্থন করে। জাতিসংঘে পোল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়ে প্রস্তাবও এনেছিল।
স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে এখন আর কিছু নেই। প্রায় সব ইউনিয়নই স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আছে ভারত এবং বাংলাদেশ। আর আছে ইতিহাস। সোভিয়েত-ভারত চুক্তিও সেই ১৯৮৬ থেকে নেই। তবু এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ তা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রেখেছিল। আর বাঙালি পেয়েছিল রক্তস্নাত স্বাধীনতা।
লেখক : কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক

জাতীয় নবজাগৃতি এবং বঙ্গবন্ধু

জাতীয় নবজাগৃতি এবং বঙ্গবন্ধু
হারুন হাবীব
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তির পর অল্পদিনেই প্রমাণিত হয়, এই বিভক্তি শুধুই পতাকা পরিবর্তনের। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি এই বিভক্তি। বরং এক উপনিবেশবাদ বিদায় হওয়ার পর জেঁকে বসেছে আরেক উপনিবেশবাদ। কিন্তু লড়াকু বাঙালি মর্যাদার সংগ্রাম থেকে কখনো পিছপা হয়নি। তারা অধিকার পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের আইয়ুববিরোধী শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ছাত্রসমাজের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তাচেতনার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের বাংলাভাষী গণমানুষের এই মনোজাগতিক জাগরণ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করে।
কিন্তু ধর্ম ও সেনাকেন্দ্রিক পাকিস্তানি শাসকরা সত্তরের নির্বাচনের ঐতিহাসিক রায়কে নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করে। তারা নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে ২৬ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মার্চ মাসটি সে কারণে আমাদের ইতিহাসের অগ্নিঝরা অমলিন অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস পর্যন্ত গোটা জাতি ছিল অগ্নিগর্ভ, ঐক্যবদ্ধ ও অপ্রতিরোধ্য। একদিকে বঙ্গবন্ধুর আপসহীন ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, অন্যদিকে সাড়ে সাত কোটি জাগ্রত মানুষের বজ্রকঠিন শপথ। স্বাধীনতার দাবিতে বাঙালি এক ও একাত্ম।
২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে ছাত্র-জনতা উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ৭ই মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ইতিহাসখ্যাত ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রপাত করেন, জাতিকে সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। মূলত সেদিন থেকেই শুরু হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে বাঙালির ৯ মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধ, যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
অন্যান্য দেশের মতোই জাতীয় স্বাধীনতার এই যুদ্ধ বা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেবলই ইতিহাসচর্চার বিষয় হতে পারত; কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় তা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে, ইতিহাসের চাকাকে তারা ভিন্ন পথে চালনা করার ষড়যন্ত্র করেছে। বলা বাহুল্য, ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত পালাবদলের পর থেকে পরবর্তী চার দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার বিরোধীরা পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ হয়েছে। সেনা ও আধাসামরিক শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির ওপর খৰ নেমে এসেছে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে, তারা নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে।
কিন্তু সুখের খবর হচ্ছে এই যে এত কিছুর পরও প্রতিরোধশূন্য হয়নি বাংলাদেশ। হৃত জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের আন্দোলন বিফলে যায়নি। বাঙালি বহুলাংশেই সফল হয়েছে। আক্রান্ত মুক্তিযুদ্ধ আবারও বলদর্পী চেতনায় ফিরে এসেছে। ব্যাপক মনোজাগতিক বিবর্তন ঘটেছে তারুণ্যের মধ্যে। এ পরিবর্তন বা বিবর্তন নতুন আশা জাগিয়েছে।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি মূলত মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি সফল পাল্টা অভিযান সম্পন্ন করেছিল। দুই দশকব্যাপী বিজাতীয় এই আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে কুচক্রীরা নতুন প্রজন্মের তাৎপর্যময় একটি অংশকে কেবল বিভ্রান্তই করেনি, একই সঙ্গে তারা সীমিত আকারে হলেও বাংলাদেশের মাটিতে নতুন করে পাকিস্তানি মনোভাবের প্রবর্তন করতেও সক্ষম হয়েছিল। বলতেই হবে, এ প্রবর্তন যেমন দুর্ভাগ্যজনক, তেমনি আতঙ্কজনকও।
এসব কারণে বাংলাদেশের বেলায় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি কেবল ইতিহাসচর্চায়ই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর চর্চা নতুন জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধের অংশীদার হতে যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে ১৯৭১ সালের চেতনা ও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিরোধ যুদ্ধে নামতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধপন্থী সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে। আমাদের সৌভাগ্য যে পঁচাত্তর-পরবর্তী এই প্রতিরোধ যুদ্ধটি দীর্ঘ হলেও আজ তা এমন একটি পর্যায়ে উপনীত যে একে আর পেছনে টানার সুযোগ নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের আত্মাকে অবমাননা করে, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অস্বীকার করে বাংলাদেশে আর কখনোই কোনো রাষ্ট্রশক্তি স্থায়িত্ব লাভ করতে পারবে না। কখনো যদি সে চেষ্টা ঘটে, আমি বলতে বাধ্য, সেই বিজাতীয় রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রাবল্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্রতর হতে বাধ্য।
বর্তমান সময়টিকে আমি আমাদের জাতীয় নবজাগৃতির কাল হিসেবে বিবেচনা করি। এর প্রথম কারণটি হচ্ছে, ৩৪ বছর পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এ বিচার সংগত কারণেই জাতীয় ও বিশ্ব ইতিহাসে অনন্যসাধারণ। দ্বিতীয়টি, মুক্তিযুদ্ধের সময় যে স্থানীয়রা বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের দোসর হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্যতম অপরাধ করেছিল, লাখো মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল, লাখো নারীর সম্ভ্রমহানি করেছিল, নির্বিচারে ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছিল, অকথ্য নির্যাতন, অপহরণ এবং এক কোটি মানুষকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল- মানবতাবিরোধী সেই অপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কোনো ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাকিস্তানি সেনাতন্ত্র ও ধর্মতন্ত্রের লাগাতার নিপীড়ন, সেই সঙ্গে সেদিনকার পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের উদগ্র দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নিপীড়িত বাঙালি জনগোষ্ঠীকে যে রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্নের দ্রষ্টা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
যেকোনো নাগরিকই মনে করতে বাধ্য হবেন যে ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত পালাবদলের পর গণতন্ত্র ও সুশাসনের বদলে এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিবর্জিত দুঃসহ একটি সময়, যা সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় রত থেকেছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক ও আধাসামরিক শাসকরা পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে অস্বীকার করেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি নগ্ন অশ্রদ্ধা দেখিয়েছে, বাঙালির যা কিছু অর্জন, যা কিছু শুভ, যা কিছু মঙ্গল, তাকেই এরা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। কাজেই সত্যসন্ধানী নতুন প্রজন্মকে একই সঙ্গে ঘৃণা করতে হবে পঁচাত্তরের খুনিদের সঙ্গে তাদের দোসরদেরও, যারা খুনিদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছিল, তাদের রক্ষা করেছিল এবং পুনর্বাসন করেছিল।
আমরা যখন স্বাধীনতার ইতিহাসের কথা বলি, তখন স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় স্বাধীনতার শত্রু-মিত্রের চেহারাগুলো ভেসে ওঠে। বিশেষ করে ভেসে ওঠে সেই সব ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীর মুখ, যারা ধর্মের নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করে নির্বিচার গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অপহরণ ও অগ্নিসংযোগ করে নিজেদের ঘৃণ্য অপকর্মের স্বাক্ষর রেখেছিল।
এসব ঘৃণ্য অপরাধীকে আইনের হাতে সোপর্দ করা মানবসভ্যতা রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে জরুরি। মুক্তিযুুদ্ধের অগণিত শহীদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখাতে, মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গ করতে এসব অপরাধীর বিচারের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের একটি বড় কলঙ্ক মোচন হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করে। জাতির ললাট থেকে আরেকটি বড় কলঙ্কচিহ্ন মোচন হবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের এই অমোঘ দাবি থেকে সরে যাওয়ার কোনোই সুযোগ নেই।
২৫ মার্চ ২০১০ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। দৃশ্যতই দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা যেকোনো মূল্যে এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ বা বিঘি্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এও দেখা যাচ্ছে যে একাত্তরের ঘাতক ও পঁচাত্তরের ঘাতকদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও চেতনার কোনোই অমিল নেই।
আমি বিশ্বাস করি, সংকট বা সীমাবদ্ধতা যতই থাক না কেন, বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠিত হবে, চিহ্নিত মানবতাবিরোধীরা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি পাবে। কারণ এই বিচার সেনা ও ধর্মতান্ত্রিক পাকিস্তানের উদর থেকে জন্মলাভ করা জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত, বাঙালির জাতীয় মর্যাদা ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। এ বিচার সম্পন্ন হলে লাখো শহীদের আত্মা শান্তি লাভ করবে, বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হবে এবং মানবতাবিরোধী ঘৃণ্য অপরাধীরা একদিন না একদিন যে তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি পাবে, সেই চিরন্তন সত্যটাই আবারও প্রতিষ্ঠিত হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবলই ইতিহাস নন, তিনি আমাদের জাগরূক অবিনাশী জাতীয় সত্তা। বাঙালির স্বাধিকার জাগরণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা তিনি। পঁচাত্তরে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পরও তিনি যেমন আমাদের অনুপ্রেরণা ও শক্তি, তেমনি তাঁর মৃত্যুর বহুকাল পরও তিনি এই অধুনা নবজাগৃতির মূল কাণ্ডারি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Tuesday, August 14, 2012

বঙ্গবন্ধু কী বলেছেন, আমরা কী করছি!

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অভিন্ন। তাঁর জন্মই হয়েছিল তিনি এই দেশটাকে স্বাধীন করবেন বলে।
বঙ্গবন্ধু তাঁর সমস্তটা জীবন একটা চেষ্টাই করেছেন, একটাই ছিল তাঁর জীবনের সাধনা—বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলার মানুষের মুক্তি।
১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান হয়েই গেল, শেখ মুজিব কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা ছাত্রাবাসে জড়ো হওয়া ছাত্রকর্মীদের উদ্দেশে বললেন, এই স্বাধীনতা স্বাধীনতা নয়। আমাদের যেতে হবে পূর্ব বাংলায়, নতুন করে শুরু করতে হবে সংগ্রাম।
শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান কথাটাও বলতে চাইতেন না। তিনি একে ডাকতেন পূর্ব বাংলা বলে, তারপর বলতেন বাংলাদেশ। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে “পূর্ব পাকিস্তান” নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে আপনারা এটাকে বাংলা বলে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে ঐতিহ্য।’
অন্নদাশংকর রায় লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবকে প্রশ্ন করি, বাংলাদেশের আইডিয়াটা প্রথম কবে আপনার মাথায় এলো?’
‘শুনবেন?’ তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে।’
শেখ মুজিব এবং অন্যরা সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন, ১৯৪৮ সালে বড় ভাষা আন্দোলন হয়, মুজিব গ্রেপ্তার হন। এরপর তিনি বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। গোয়েন্দারা তাঁর কাছে কারাগারে গেছে, বলেছে, বন্ডসই দিয়ে মুক্তি নিন। তিনি বলেছেন, বন্ডসই দিয়ে মুক্তি তিনি নেবেন না। সেই সব গোয়েন্দা রিপোর্ট এখন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, এই বন্দীর মনোবল খুবই কঠোর। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফরিদপুর কারাগারে যখন তিনি অনশন করেন, তখন তাঁর হার্টে অসুখ। ওজন দ্রুত কমে আসছে। তিনি বুঝতে পারছেন তিনি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন। তখনো তিনি ভেবেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে মরার মধ্যেও শান্তি আছে, গৌরব আছে। এতবার তিনি জেলে গেছেন যে, তাঁর সন্তান কামাল তাঁকে ছোটবেলায় দেখেছে খুব কম। তাই তো সে তার বড় বোন শেখ হাসিনাকে বলেছিল, খুব ছোটবেলায়—‘আপা, তোমার আব্বাকে আব্বা বলে ডাকি?’ শেখ মুজিব তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি আর রেণু দুজনেই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, “আমি তো তোমারও আব্বা।” কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন ও আর সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়। আমি যখন জেলে যাই, তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দী করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।’
বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ রকম কতগুলো উপলব্ধির কথা লিখেছেন, যা আমাদের চিরকাল পথ দেখাতে পারে। ওই বই পড়ি, আর ভাবি, বঙ্গবন্ধু কী বলেছিলেন, আর তার অনুসারীরা কী করছেন?
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব নেতাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তখন মুজিব একবার করাচিতে গিয়ে খাজা নাজিমউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী পার্টি। তাকে কাজ করতে সুযোগ দেওয়া উচিত। বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না।’ এই উপলব্ধি ১৯৫২ সালের, যখন শেখ মুজিবের বয়স মাত্র ৩২। ৩২ বছরে মুজিব যা উপলব্ধি করেছেন, আমরা কবে তার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারব?
শেখ মুজিব একবার আবুল হাশিম সাহেবের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। কলকাতায় আবুল হাশিম সাহেবের কাছে ছাপাখানা ছিল, যেটা মুজিবেরা চাঁদা তুলে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৪৭-এ হাশিম সাহেব সেই ছাপাখানা বিক্রি করে দেবেন। সবাই মুজিবকে ধরল, ‘তুমি গিয়ে বলো, তাহলে তিনি আর প্রেস বিক্রি করবেন না।’ সবার অনুরোধে মুজিব আবুল হাশিম সাহেবকে কঠোর ভাষায় বলে এলেন, ‘প্রেস বিক্রি করতে গেলে আমি বাধা দেব, দেখি কে আসে এই মিল্লাত প্রেস কিনতে?’ আবুল হাশিম সাহেব দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি খাওয়াদাওয়া ত্যাগ করেছিলেন। মুজিব তাঁর কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। মুজিব তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘আমি যাওয়াতে তিনি খুশি হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ভিন্নমত হতে পারি, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি, সেটা তো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, সেটা স্বীকার করতে কোনো দিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব, মানুষেরই তো ভুল হয়ে থাকে।’ এই কথাটা শেখ মুজিব বলেই বলতে পারেন। আর আমরা দেখি, আজকের নেতা-নেত্রীরা কোনো কিছু ভুল করেন না। কোনো ভুল তাই তাঁদের স্বীকারও করতে হয় না। কোনো ভুলের সংশোধনীও তাঁদের করতে হয় না।
অসাধারণ একটা পর্যবেক্ষণ মুজিব করেছেন আমাদের সম্পর্কে। ‘পরশ্রীকাতরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে আছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই পাওয়া যাবে না “পরশ্রীকাতরতা”। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে “পরশ্রীকাতর” বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না।’
ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকের কথা। লীগ মন্ত্রিসভা তখন অবিভক্ত বাংলায়। এমএলএ কেনাবেচা হচ্ছে। তরুণ মুসলিম লীগ কর্মী মুজিবের ওপর দায়িত্ব পড়ল এমএলএদের পাহারা দিয়ে রাখা, যাতে তাঁরা টাকা নিয়ে মত পাল্টাতে না পারেন। মুজিব তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘এর পূর্বে আমার ধারণা ছিল না যে, এমএলএরা এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি! আমার মনে আছে, আমাদের ওপর ভার পড়ল কয়েকজন এমএলএকে পাহারা দেবার, যাতে তারা দলত্যাগ করে অন্য দলে যেতে না পারে। ...একজন এমএলএকে মুসলিম লীগ অফিসে আটকানো হল। তিনি বার বার চেষ্টা করেন বাইরে যেতে। কিছু সময় পরে বললেন, “আমাকে বাইরে যেতে দিন, কোনো ভয় নাই। বিরোধী দল টাকা দিতেছে, যদি কিছু টাকা নিয়ে আসতে পারি আপনাদের ক্ষতি কি? ভোট আমি মুসলিম লীগের পক্ষেই দিব।” আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। বৃদ্ধ লোক, সুন্দর চেহারা, লেখাপড়া কিছু জানেন, কেমন করে এই কথা বলতে পারলেন আমাদের কাছে? টাকা নেবেন একদল থেকে অন্য দলের সভ্য হয়ে, আবার টাকা এনেও ভোট দেবেন না। কতটা অধঃপতন হতে পারে আমাদের সমাজের!’
হায় বঙ্গবন্ধু মুজিব, আপনি যদি জানতেন, এমএলএরা চিরটাকালই টাকা নিয়েছে! এখন এমন এমপিও আছেন, খবরের কাগজে পড়েছি, যিনি এলাকার বেকার যুবকদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন একই পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য, টাকা নিয়েছেন, কিন্তু চাকরিও দেননি।
আকবর আলি খান তাঁর পরার্থপরতা বইয়ে ‘শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি’ নামের একটা প্রবন্ধ লিখেছেন। একজন ইংরেজ বিচারককে একজন ভারতীয় বলেছিল, দুর্নীতিবাজ অফিসার দুই রকমের। একদল আছে, ঘুষ খেয়ে কাজ করে। আরেক দল আছে শুয়োরের বাচ্চা। তারা ঘুষ নেয়, কিন্তু কাজ করে না।
থাক, আর বেশি কিছু বলতে চাই না।
১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু কারাগারে যখন অনশন করেন, তখন তাঁর সঙ্গে অনশনে যোগ দেন মহিউদ্দিন আহমদ। মহিউদ্দিন ছিলেন মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের ঘোরতর বিরোধী, অর্থাৎ মুজিবদের বিরোধী পক্ষের। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় ইন্ধন জোগানোর। কাজেই মুজিবভক্ত নেতা-কর্মীরা কেউ চায়নি, মহিউদ্দিন ও মুজিব একসঙ্গে অনশন করুন। শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘মানুষকে ব্যবহার, ভালবাসা ও প্রীতি দিয়েই জয় করা যায়, অত্যাচার, জুলুম ও ঘৃণা দিয়ে জয় করা যায় না।’
এইভাবে মুজিব অনেক শত্রুকে তাঁর মিত্রে পরিণত করেছিলেন। এটাই তো রাজনৈতিক কৌশল। আমার শত্রুকে আমি বন্ধুতে পরিণত করব, অন্তত তাকে নিরপেক্ষ বানিয়ে ছাড়ব, বন্ধুকে করে তুলব আরও বন্ধু। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে কী দেখছি আমরা? নিরপেক্ষকে শত্রুতে পরিণত করা হচ্ছে, বন্ধুকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অকারণ শত্রুতা অকারণ পরশ্রীকাতরতা আমাদের বহু সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
একবার এক সভায় মওলানা ভাসানীকে সভাপতিত্ব করতে না বলে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হককে সভাপতিত্ব করতে বলা হয়। ভাসানী রাগ করেন। খাওয়া বন্ধ করে দেন। শেখ মুজিব তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘মাওলানা ভাসানীর উদারতার অভাব, তবুও তাঁকে আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম। কারণ, তিনি জনগণের জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত। যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়, তারা জীবনে কোনো ভাল কাজ করতে পারে নাই--আমার বিশ্বাস।’
বঙ্গবন্ধু মুজিব তাঁর সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। বারবার মৃত্যু তাঁর সামনে এসেছে, তিনি ভয় পান নাই, এটা তাঁর মুখের কথা নয়, অন্তরের কথা। একাত্তরে পাকিস্তানের জেলে তাঁর সেলের পাশে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হলে তিনি যা বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। তাদের আরও বলেছি, তোমরা (আমাকে) মারলে ক্ষতি নাই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।’
নিজের জীবনটা দান করে দিয়ে শেখ মুজিব তাঁর কথা রেখেছেন। তাঁর অনুসারীরা কে কী ত্যাগ করছেন, আর কী কী অর্জন করছেন, কয়টা প্লট নিলেন, কত বড় গাড়িতে চড়েন, সেই খবর নিতে গেলে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাবে নাকি?
সবাই নিশ্চয়ই এক রকম নয়। এই দেশে ত্যাগী মানুষ, ত্যাগী নেতা নিশ্চয়ই আছেন। তা না হলে মুজিবের এই বাংলায় সূর্য কেন আজও ওঠে, কেন আজও বৃষ্টি হয়, ফুল ফোটে?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস




মানুষের জন্মগত অধিকার স্বাধীনতা । কিন্তু এদেশের স্বাধীকার ইতিহাস পর্যালোচনা বিশ্লেষণে এটাই সুনির্দিষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বাঙালীর ভাগ্যপরিক্রমা রাজনৈতিকভাবে চিরদিন ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘুরেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে লর্ড ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধে সেনাপতি মীর জাফর আলি খাঁ ও তার অনুচরদের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। আর এর সাথেই বাংলার ভাগ্যাকাশে বাঙালীর স্বাধীনতার সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালের ইতিহাস বিদেশী ইংরেজ শাসকদের অবিচার, অনাচার, নির্যাতন, কুশাসন, শোষণ ও বঞ্চনার নির্মম ইতিহাস। কিন্তু বাঙালীরা কখনোই এই ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ সহজে মাথা পেতে নেয়নি।

বাঙালীরা এই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে। লর্ড ডালহৌসি চলে যাবার পর লর্ড ক্যানিং ১৮৫৬ সালে এদেশের গভর্নর জেনারেল হয়ে এলেন। আর তখনই ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে এ উপমহাদেশের সর্বত্র পুঞ্জিভূত ক্ষোভ প্রতিবাদী রূপ পায়। ১৮৫৭ সালে জনতার এই অসন্তোষ সিপাহী বিদ্রোহের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। বিদেশী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জনতার এটাই এদেশের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র সংগ্রাম। সংক্ষেপে বললে এরপর বাংলার সুযোগ্য সন্তান তিতুমীর, টিপু সুলতান ও শরীয়তুল্লাহ প্রমূখের প্রতিরোধ সংগ্রাম, চট্টগ্রামের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন প্রমুখের সশস্ত্র প্রতিবাদ। পাশাপাশি চলে মুসলিম লিগ ও ভারতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা এবং অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বি-জাতি ভিত্তিক পরিকল্পনায় ভারতবর্ষকে দুভাগ হয়ে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান নামে দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন ভারতবর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম এর দুটো অংশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব হয় প্রায় দেড় হাজার মাইলের মতো। স্বাধীন হয়েও পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে পশ্চিমাংশের কলোনী হয়ে উঠল, এখানকার বাঙালীরা আগের মতোই রয়ে গেল। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না।
স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই আঘাত এল বাঙালীর ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় পাকিস্তানের জনক ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করলেন “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”। বাঙালীরা বুঝে নিল পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি। শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। এল অমর ২১ ফেব্রুয়ারি। ছাত্রজনতার মিছিল আর শ্লোগানে মুখর হয়ে উঠল রাজপথ। দেশব্যাপী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হলো।

১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচন হলো। এল ৯২-ক ধারা, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হলো। সেইসঙ্গে শুরু হলো স্বায়ত্বশাসনের দাবি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলেন। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমানের কুখ্যাত শিক্ষাকমিশন রিপোর্টকে ঘিরে শিক্ষানীতি বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবর রহমান শুরু করলেন তার ঐতিহাসিক ছ’দফা আন্দোলন। প্রবল এই বিক্ষোভের মুখে সংগ্রামী জনতার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো আইয়ুব সরকার। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতা থেকে নেমে যান ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। আর সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গা নেন আরেক জান্তা ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় এসেই সামরিক শাসন জারি করেন তিনি। জাতির প্রতি দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন ও জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দান করেন।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাত্রে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর এক প্রলয়কারী ঘূর্ণিঝড় ও সর্বনাশা সামুদ্রিক জলোচ্ছাসে দশ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। সেই সঙ্গে গৃহহীন হয় আরো ত্রিশ লাখ। এ ভয়াবহ দুর্যোগে কেন্দ্রীয় সরকার রইল সম্পূর্ণ নিরব দর্শকের ভূমিকায়।

১৯৭০ সালে চরম চাপের মুখে ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পায়, যা সমগ্র পাকিস্তানের সর্বমোট ৩০০ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তৎকালীন সামরিক সরকার এই ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সোজা হিসেবে এই প্রথম পাকিস্তান শাসন করবে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। পাকিস্তানের সামরিক সরকার তখনই সিদ্ধান্তô নিয়ে নিল, কোনভাবেই বাঙালীদের নিকট পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেয়া যাবে না। ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকলেও ইয়াহিয়া খান সেটি বাইরে বোঝাতে চাইল না। তাই তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারী ঘোষনা করলেন ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে। কিন্তু ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেয়। এরফলে সারাদেশে বিক্ষোভের যে বিস্ফোরন ঘটল তার কোন তুলনা নেই। শেখ মুজিবর রহমান ঢাকা ও সারাদেশে ৫ দিনের জন্য হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলনের ঢাক দিলেন। ৫ দিনের হরতালের পর ৭ মার্চ ’৭১ সকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বাসভবনে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাক্ষাত করেন। এ বৈঠকে রাষ্ট্রদূত তার সরকারের সিদ্ধান্তের কথা শেখ মুজিবকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তা হলো- ’পূর্ব বাংলার স্বঘোষিত স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সমর্থন করবে না। এদিকে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিকেল প্রায় সাড়ে চারটায় বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক বক্তৃতায় চার দফা দাবির কথা উত্থাপন করেন- ১· সামরিক আইন প্রত্যাহার। ২· সেনাবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন। ৩· নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ। ৪· প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। ৭ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানালেন। এই মর্মে ১০ দফা কর্মসূচী প্রকাশিত হয়।

এইরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ৯ মার্চ ’৭১ ঢাকার পল্টনের জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লক্ষ্যে প্রদেশব্যাপী সংগ্রামের আহ্বান জানালেন।

১৫ মার্চ ’৭১ জুলফিকার আলী ভুট্টো এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ’পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা গুরু। তাই কেন্দ্রের ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লিগের কাছে আর পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির কাছেই হস্তান্তর করতে হবে।’

১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কঠোর সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকায় আসেন। কোনো সহযোগী ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমান ১৬ মার্চ ’৭১ প্রথম দফা বৈঠকে মিলিত হন। পরে এ আলোচনা মুলতবী হয়ে যায়। পরে এ আলোচনা মুলতবী হয়ে যায়। ১৭ মার্চ দ্বিতীয় দফা বৈঠকে দুপরে পরামর্শদাতারাও যোগ দিলেন। প্রেসিডেন্ট ভবনে রাতে ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়। রাত ১০টায় গভর্নর টিক্কা খান জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে ফোনে বাঙালী নিধনযজ্ঞের নীল নকশা ’অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।

এদিকে ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় বৈঠকে মিলিত হন। ইয়াহিয়া এই বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনার ভান করলেও আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ায় জনগন চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়। শুরু হলো প্রতিরোধ আন্দোলন। ১৯ মার্চের ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক প্রায় ৯০ মিনিট স্থায়ী হয়, পরে সন্ধ্যায় তাদের পরামর্শদাতারা আলাদা বৈঠকে বসেন। ২০ মার্চ বসে মুজিব-ইয়াহিয়া চতুর্থ বৈঠক, যার শেষ দিকে দুপুরে পরামর্শদাতারাও নানা ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় বসেন।

অন্যদিকে এ অঞ্চলের গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলে ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে। জেনারেল আব্দুল হামিদ খান এই বৈঠকে জেনারেল টিক্কা খানকে গণহত্যার নীল নকশা ’অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত দেন।

২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকে সমঝোতার সমালোচনা করলেন। তিনি বললেন, সমস্যা সমাধানে ত্রি-পক্ষীয় সমঝোতা হতে হবে। এই মর্মে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া, শেখ মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে আলোচনা চলে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই ছিল আলোচনার নামে প্রহসন। এই দীর্ঘ আলোচনা পশ্চিমী সামরিক বাহিনীকে জাহাজ ও বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলায় প্রচুর অস্ত্র ও সৈন্য আনার সুযোগ করে দেয়।

শেখ মুজিবর রহমান ২৭ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল ঘোষণা করেন। এই পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করলেন। দেশবাসী এমনকি বিশ্ববাসীও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও পূর্ব পাকিস্তানের বিজয়ী সংখ্যাগুরু দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সমঝোতার ব্যাপারে কিছুটা আশাবাদী ছিল।

কিন্তু বর্বর হানাদার পাক বাহিনী নৃশংস পাশবিকতায় বাঙালীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ২৫ মার্চের কালো রাতে। সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ৯৬টি ট্রাকবোঝাই সৈন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরে ঢুকল। তাদের সঙ্গে ছিল অটোমেটিক রাইফেল, মর্টার ফিল্ডগান, মেশিনগান, লাইট মেশিনগান, বাজুকা ইত্যাদি সব মারণাস্ত্র। সঙ্গে ট্যাঙ্কবহর।

তখনও বারোটা বাজেনি, হানাদার নরপশুরা ট্যাঙ্ক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করল রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো। এমনকি মেয়েদের রোকেয়া হলও নিস্তার পেল না। রাস্তায় রাস্তায় জমে উঠল লাশের স্তুপ। কিন্তু এর মধ্যেও জনগণ থামল না। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল পাল্টা প্রতিরোধে। কিন্তু বর্বর হানাদাররা এক ২৫ মার্চের রাতেই লক্ষাধিক
বাঙালীকে হত্যা করে।

এসময় ২৬মার্চ মধ্যরাতে মেজর জিয়াউর রহমান নিজেকে বাংলাদেশের প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট এবং লিবারেশন আমির্র কমান্ডার-ইন-চীফ হিসেবে ঘোষনা করে বেতারে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘোষনা দেয়ার আগে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং সেনাবাহিনীর অফিসার জেসিও ও জওয়ানদের একত্রিত করে তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। সাথে সাথে তা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদেরকে জানানো হয়।

এ ঘোষনাটি সেই সময় বাংলাদেশের সবার ভেতরে নতুন একটি অনুপ্রেরনা সৃষ্টি করেছিল। বাঙ্গালী যোদ্ধাদের হাত থেকে চট্টগ্রাম শহরকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রনে আনতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এপ্রিল মাসের ১০ এপ্রিল হয়ে যায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুষ্টিয়া এবং পাবনা শহর প্রথমে দখল করে নিলেও বাঙ্গালী সৈন্যরা তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে শহরগুলো পূর্ণদখল করে এপ্রিলের মাঝামাঝি নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখে। বগুড়া দিনাজপুরেও একই ঘটনা ঘটে-বাঙ্গালী সৈন্যরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকে শহরগুলোকে পুনর্দখল করে নেয়। যশোরে বাঙ্গালী সৈন্যদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করার সময় তারা বিদ্রোহ করে। প্রায় অর্ধেক সৈন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারালেও বাকিরা ক্যান্টমেন্ট থেকে মুক্ত হয়ে আসতে পারে। কুমিল্লা, খুলনা ও সিলেট পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের দখলে রাখলেও বাঙ্গালী সৈন্যরা তাদের আক্রমন করে ব্যতিক্রম করে রাখে।

পাক বাহিনী এই সময়ে পাকিস্তান থেকে দুইটি ডিভিশনে বাংলাদেশে নিয়ে অসংখ্য মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ে আসে। তার সাথে সাথে যুদ্ধজাহাজে করে অস্ত্র আর গোলা-বারুদ। বিশদ অস্ত্র ভান্ডার এবং বিমানবাহিনীর সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে ছাড়িয়ে পড়তে থাকে। তারা মে মাসের মাঝামাঝি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বড় শহর নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে পারে।
পাকিস্তান সরকার ১১ এপ্রিল টিক্কা খানের পরিবর্তে জেনারেল এ· ·কে নিয়াজীকে সশস্ত্রবাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে পাঠায়। মুক্তিযোদ্ধারা তখন যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় প্রস্ততি নিতে শুরু করেছে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্যাতনে নিউজ উইকের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশী শরনার্থীকে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যে মানুষটি এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন তাজউদ্দিন আহমেদ। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১০ এপ্রিল মুজিবনগর থেকে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার সনদ ঘোষণা করা হয়। এই সনদটি দিয়েই বাংলাদেশ নৈতিক এবং আইনগতভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্বপ্রকাশ করেছিল। এই নতুন রাষ্টে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে (মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলা) বাংলাদেশের প্রথম সরকার দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে শপথ গ্রহণ করে তাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

যুদ্ধের প্রথমদিকে মুক্তিবাহিনী ছিল পরিকল্পনাহীন এবং অপ্রস্তুত। আস্তে আস্তে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন-চীফের দায়িত্ব দয়ো হয় কর্ণেল (অবঃ) এম আতাউস গনি ওসমানীকে। পুরো বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এই এগারোটি সেক্টর ছাড়াও জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ এবং শফিউল্লাহর নেতৃত্বে জেড ফোর্স,কে ফোর্স এবং এস ফোর্স নামে বিগ্রেড তৈরী করা হয়। এছাড়াও টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি আঞ্চলিক ভিত্তিক বাহিনী ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকৃত যোদ্ধাদের মতই রেখেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। তবে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদানের কথা না বললে ইতিহাসটি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। তাদের সাহায্য সহযোগীতার জন্যই মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে নিরপদ আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ করতে পেরেছেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার কথা পৃথিবীতে প্রচার হওয়ার পর পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেরই সমবেদনা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পাকিস্তানের পক্ষে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের একেবারে শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহরের যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোবপসাগরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে শেষ মূহূর্তে যখন বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথবাহিনীর জয় একেবারে সুনিশ্চিত তখন সেই বিজয়ের মূহুর্তটিকে থামিয়ে দেবার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে এ প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়ে আমাদের বিজয়ের পথ সুনিশ্চিত করেছিল।

জুলাই মাসের দিকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করে অক্টোবর মাসের ভেতর বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা দেখতে দেখতে শাক্তিশালী আর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেছিল। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সীমান্ত আউটপোটগুলো নিয়মিত ভাবে আক্রমন করে দখল করে নিতে শুরু করে। গেরিলাবাহিনীর আক্রমন ও তীব্র হতে থাকে। এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মানোবল ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অবস্থা দেখতে দেখতে এত খারাপ হয়ে গেল যে, পাকিস্তান তার সমাধান খুঁজে না পেয়ে ডিসেম্বরের তিন তারিখ ভারত আক্রমন করে বসে। তখন পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ছিল হঠাৎ আক্রমন করে ভারতের বিমান বাহিনীকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়া। কিন্তু তারা সেটি করতে সক্ষম হয়নি। ভারত সাথে সাথে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে এবং বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে তার সেনাবাহিনী নিয়ে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের ভিতর তখন পাকিস্তানের পাঁচটি পদাতিক ডিভিশন। ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হবার পর সেটি চলেছে মাত্র তেরদিন। যুদ্ধ শুরু হবার পর পাকিস্তানের একটি একটি করে ঘাঁটির পতন হতে থাকলো।

মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয় বাহিনী তাদেরকে পাশ কাটিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততর গতিতে ঢাকার কাছাকাছি এসে হাজির হয়ে যায়। তারা ঢাকা ঘেরাও করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পন করার জন্য আহ্বান জানান। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬ ডিসেম্বর বিকেল চায়টায় রেডকোর্স ময়দানে পাকবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্বসমর্পন দলিলে সক্ষর করেন।

পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পন করার পর ৭ কোটি বাঙালী বিজয়ের অবিশ্বাস্য আনন্দে মেতে ওঠলো। যে বিজয়ের জন্য বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষেরা সুদীর্ঘ নয় মাস অপেক্ষা করেছিল। এই বিজয়ের জন্যই মুক্তিযোদ্ধোদের নিকট আমরা সত্যিই ঋণী। তবে তাদের প্রতি কিছুটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সুযোগ হয়েছে তাদেরকে বিভিন্ন বীরত্বসূচক পদক দিয়ে সম্মানিত করে।

বিজয়ের আনন্দ এবং ১০ জানুয়ারী পাকিস্তানের জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দেশের মানুষের ভেতর ভবিষ্যত নিয়ে যে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল, বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য সেটি পূরন করা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে ওঠতে থাকে। যারা সরকার চালানের দায়িত্ব নিয়েছে তাদের কারো সরকার চালানোর তেমন অভিজ্ঞতা নেই। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যুদ্ধের শেষ মূহুর্তে রাস্তাঘাট, কল কারখানা সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি বিধ্বস্ত। রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি দূরত্ব তৈরী হয়ে গেল। শুধু দেশের ভেতরেই নয় দেশের বাইরেও ষড়যন্ত্র শুরু হলো, দেশে যখান খাদ্যের ঘাটতি তখন চাল বোঝাই জাহাজ হঠাৎ করে বাংলাদেশে না এসে অন্যদিকে চলে গেল। ১৯৭৪ সালে দেশে দেখা দিল দূর্ভিক্ষ। রাজনৈতিক বিশৃংঙ্খলা দূর করার নামে বিরোধী দলীয় কর্মীদের রক্ষীবাহিনী নির্যাতন করতে শুরু করলো। সব মিলিয়ে দেশে যখন একটি অরাজক পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগ সরকার তখন ‘বাকশাল’ তৈরী করে একদলীয় শাসন চালূ করার চেষ্টা করল। চারদিকে দেখা দিল অসন্তোষ, ক্ষোভ। দেশের এরকম দুঃসময়ের একটি সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। পতন ঘটে একদলীয় বাকশাল সরকারের। তবে সেই সময় ‘বাকশাল’ পদ্ধতি প্রবর্তনের পক্ষে যুক্তিও রয়েছে।


ক্ষমতার মঞ্চের পরিবর্তন পেক্ষাপটে খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু শাসন ক্ষমতা নিয়ে গোপনে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। অবশেষে ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। মূলতঃ এই বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাশূন্যতা পূরন করেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতার আসার পর থেকে দেশে ধীরে ধীরে স্থিতাবস্থা বিরাজ করতে শুরু করে। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সেনা অভূত্থানে নিহত হন। এরপর স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগন শাসিত হতে থাকে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ গনতন্ত্রের পথে ফিরে আসে। সেই থেকে বাংলাদেশ আবার একটি গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাড়ানোর চেষ্টা করছে।

স্বাধীনতার পর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল হতাশাপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। বাংলাদেশ আজ মাথায় অনেক সাফল্যের মুকুট পরে ওঠে দাঁড়িয়েছে। উর্বর পলিবাহিত মৃত্তিকার উপরিভাগে সবুজের সমারোহ, নীচে তার অফুরন্তô খনিজ সম্পদ, আর আকাশ সীমায় বিপুল রূপালী মেঘের পাল - যা সারা বছর অন্তরীক্ষে ভূ-গহ্বরে প্রকৃতির সকল উৎস এ দেশকে দান করার জন্য উন্মুখ।

রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে গিয়ে এবং দুর্নীতির মূল উৎপাটন করে জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিতে পারলে আমাদের জাতীয় জীবনে আসবে একের পর এক সাফল্য আর সাফল্য, আমরা পাবো স্বপ্নের স্বাধীন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, পাবো ইতিবাচক এক বাংলাদেশ।

Sunday, August 12, 2012

বাংলাদেশ বিষয়াবলী- ২য় পত্র- সংবিধান _ মনে রাখার কিছু উপায়





অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আপনার করনীয়ঃ

১। প্রথমেই সংবিধান প্রনয়ন সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য মনে রাখুন যেমন-কবে সংবিধান প্রনয়ন কমিটি গঠন করা হয়, কতজন সদস্য ছিলেন, একমাত্র মহিলা সদস্যের নাম, তখনকার আইনমন্ত্রী এবং সংবিধান প্রনয়ন কমিটির সভাপতি, কতটি মীটিং করেছিলেন তারা, কতদিন লেগেছিল সংবিধান প্রনয়ন করতে, কবে এটি কার্যকর হয়, কে এতে সাক্ষর করেন নি ইত্যাদি। এই তথ্য গুলো আপনি রচনামূলক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে ব্যবহার করতে পারবেন।

২। এরপর জেনে নিন সংবিধানের ভাগ গুলো এবং এই ভাগের মধ্যকার অনুচ্ছেদ গুলো। যেমন-
প্রথম ভাগ- প্রজাতন্ত্র (অনুচ্ছেদ- ১ থেকে ৭)
দ্বিতীয় ভাগ- রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি (অনুচ্ছেদ- ৮ থেকে ২৫)

এইভাবে আপনি ১১টি ভাগের অনুচ্ছেদগুলো মনে রাখুন। এই তথ্য গুলো আপনাকে অনেক সাহায্য করবে। কোন কারনে যদি ভুলে যান, সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদ এ কি আছে তখন কমপক্ষে ধারনা করতে পারবেন কোন ভাগে এটি পড়েছে।

৩। এরপর প্রত্যেক অনুচ্ছেদ এর শিরোনাম গুলো মুখস্ত করুন।

৪। এরপর অনুচ্ছেদ গুলো ভালভাবে পড়ুন। বার বার পড়ুন। কোন বন্ধুর সাথে আলাপ করুন “বলতো আইনের দৃষ্টিতে সমতা এটি কোন অনুচ্ছেদ এ আছে?” প্রথম বার না পারলেও সমস্যা নেই। আস্তে আস্তে দেখবেন আপনি ঠিকই বলতে পারছেন।

৫। নিজে নিজে একাকী মনে করার চেষ্টা করুন কোন অনুচ্ছেদ এ কি আছে। ভুলে গেলে ভাববেন না সব শেষ। বরং চিন্তা করবেন আরো ভালো ভাবে পড়তে হবে!! সব সময় হাতের কাছে পকেট এডিশনের সংবিধান সাথে রাখুন। গল্পের বই (!!!!!!) মনে করে পড়ুন।। 

কী পড়তে হবে- এই বিষয়ে অনেক কিছু বললাম। এই বার আসি মূল আলোচনায়।

আমি হুবহু মুখস্ত করার জন্য প্রথমেই বলব প্রস্তাবনাটাকে। কারন এই প্রস্তাবনা অনেক বার সংশোধিত হয়েছে। আবার, সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন আসলে চেষ্টা করবেন ভূমিকা হিসেবে কোটেশন আকারে এটি  ব্যবহার করতে। যেহেতু মুখস্ত করেছেন সেহেতু কোটেশন হিসেবে দেয়ার সময় অবশ্যই নীল রঙের কালি ব্যবহার করবেন। পরীক্ষক কে বুঝান যে সংবিধান টা আপনি পড়েছেন বেশ ভালো (!!!) করে।

তো চলুন মুখস্ত করে ফেলি-আমরা, বাংলাদেশের জনগন, ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষনা করিয়া জাতীয় মুক্তির (স্বাধীনতা) জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের (যুদ্ধের) মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি”
[আগ্রহী পাঠকগন হয়ত খেয়াল করবেন আমি বন্ধনীর মধ্যে ২টি শব্দ ব্যবহার করেছি। কারন সংবিধান সংশোধন করে এই শব্দ গুলো একবার যোগ হয়েছে ও একবার প্রতিস্থাপিত হয়েছে]

আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগনকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের (স্বাধীনতার) জন্য যুদ্ধে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রানোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহের উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।  [আমার কাছে এই মুহূর্তে ১৫তম সংশোধনীর পরের সংবিধান টা নাই বলে আগ্রহী পাঠকরা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসারে এটা ঠিক করে নিবেন। এই রকম হবার কথা- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।]

সংবিধানের ১১টি ভাগ মনে রাখার উপায়ঃ

প্র রা মৌ নি আ বি নি ম বাং জ সং বি

আসুন, মিলিয়ে নেই-

১। প্র- প্রজাতন্ত্র
২। রা-রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
৩। মৌ- মৌলিক অধিকার
৪। নি- নির্বাহী বিভাগ
৫। আ- আইন সভা
৬। বি- বিচার বিভাগ
৭। নি- নির্বাচন
৮। ম- মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক
৯। বাং- বাংলাদেশের কর্মবিভাগ
৯ক। জ- জরুরী বিধানাবলী
১০। সং-সংবিধান সংশোধন
১১। বি- বিবিধ

চলুন, এইবার আলাদা ভাবে অনুচ্ছেদ গুলোর দিকে দৃষ্টি দেই।


§  অনুচ্ছেদ ১-১২

অনুচ্ছেদ ১-১২ মোটামুটি এমনি মনে থাকে। এই অনুচ্ছেদ গুলোর মধ্যে গুরুত্তপূর্ন অনুচ্ছেদ গুলো হল-
২- প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানা
২ক- রাষ্ট্রধর্ম ( মনে রাখবেন কোন সংশোধনীর মাধ্যমে এটি হয়েছে)
৪ক- প্রতিকৃতি (১৫ তম সংশোধনীতে পরিবর্তন হয়েছে এখানে)
৬- নাগরিকত্ব
৭- সংবিধানের প্রাধান্য
৮- মূলনীতিসমূহ ( সংবিধান সংশোধন হয়েছে এইখানে)
৯- স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সমূহের উন্নয়ন ( সংবিধান সংশোধন হয়েছে এইখানে)
১০- জাতীয় জীবনে মহিলাদের অংশগ্রহন
১১- গনতন্ত্র
১২- ধর্মনিরপেক্ষতা ( সংবিধান সংশোধন হয়েছে এইখানে)


§  অনুচ্ছেদ ১৩-২৫


অনুচ্ছেদ ১৩ থেকে অনুচ্ছেদ ২৫ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

মালি কৃষককে মৌ গ্রামে নিয়ে গিয়ে অবৈতনিক জনস্বাস্থ্যের জন্য সুযোগের সমতা সৃষ্টি করে। এতে অধিকার ও কর্তব্য রূপে নাগরিকরা নির্বাহী বিভাগ থেকে জাতীয় সংস্কৃতি ও জাতীয় স্মৃতি নিদর্শনের জন্য আন্তর্জাতিক শান্তির অংশীদার হলেন।   

চলুন, ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
১৩-মালি- মালিকানার নীতি
১৪-কৃষক- কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি
১৫- মৌ- মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা
১৬- গ্রাম- গ্রামীন উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব
১৭-  অবৈতনিক- অবৈতনিক ও বাধ্যতা মূলক শিক্ষা
১৮। জনস্বাস্থ্য- জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা
১৯। সুযোগের সমতা- সুযোগের সমতা
২০- অধিকার ও কর্তব্য রূপে- অধিকার ও কর্তব্য রূপে কর্ম
২১- নাগরিক- নাগরিক ও সরকারী কর্মচারীদের কর্তব্য
২২- নির্বাহী বিভাগ থেকে- নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরন
২৩-  জাতীয় সংস্কৃতি- জাতীয় সংস্কৃতি
২৪- জাতীয় স্মৃতি নিদর্শন -জাতীয় স্মৃতি নিদর্শন প্রভৃতি
২৫-আন্তর্জাতিক শান্তি- আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন 

এইখানে একটি কথা বলতেই হবে। যদি পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি গুলো সংবিধানের আলোকে আলোচনা করুন অনেকেই শুধু অনুচ্ছেদ-৮ এরমূলনীতি সমূহ” দিয়ে আসে। মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় ভাগে বর্নিত অনুচ্ছেদ- ৮ থেকে অনুচ্ছেদ-২৫ সব –ই  রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। অনুচ্ছেদ ৮ এ বর্নিতমূলনীতি সমূহ” আসলে সংবিধানের মূলনীতি যা প্রস্তাবনায় বলা আছে। আরেকটি কথা এখানে বলব ঝেহেতু এই প্রশ্নটির উত্তর অনেক বড় হবে সেহেতু, আপনি অনুচ্ছেদ ৮ এ বর্নিত মূলনীতি সমূহ একটু বেশী আলোচনা করে অন্য অনুচ্ছেদ গুলো শুধু নাম লিখে ১ /২ লাইনের মধ্যে লেখা শেষ করবেন। সময়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। একটি ভালো পারেন দেখে শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর অনেক বড় করে দিবেন, সেটা করলে দেখবেন আপনি সব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না। আর যাদের হাতের লেখা একটু স্লো, তাদের তো এটা আরো ভাল করে মনে রাখতে হবে।

অনুচ্ছেদ- ২৬ থেকে ৩১

অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে অনুচ্ছেদ ৩১ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

মৌলিক অধিকার আইনের দৃষ্টিতে ধর্ম , সরকারী নিয়োগ ও বিদেশী খেতাব গ্রহনে সকলের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে

চলুন, ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
২৬-মৌলিক অধিকার- মৌলিক অধিকারের সহিত অসামঞ্জস্য আইন বাতিল
২৭-আইনের দৃষ্টিতে - আইনের দৃষ্টিতে সমতা
২৮- ধর্ম- ধর্ম প্রভৃতি কারনে বৈষম্য
২৯- সরকারী নিয়োগ- সরকারী নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা
৩০-  বিদেশী খেতাব গ্রহনে- বিদেশী খেতাব প্রভৃতি গ্রহন নিষিদ্ধকরন
৩১। আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার - আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার

অনুচ্ছেদ- ৩২ থেকে ৩৫

অনুচ্ছেদ ৩২ থেকে অনুচ্ছেদ ৩৫ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

জীবনে ১বার গ্রেপ্তার হলে জবরদস্তি বিচার হয়

চলুন, ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
৩২-জীবনে- জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ
৩৩-গ্রেপ্তার – গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ
৩৪- জবরদস্তি- জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরন
৩৫- বিচার- বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ
৩০-  বিদেশী খেতাব গ্রহনে- বিদেশী খেতাব প্রভৃতি গ্রহন নিষিদ্ধকরন
৩১। আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার - আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার

অনুচ্ছেদ- ৩৬ থেকে ৩৯
অনুচ্ছেদ ৩৬ থেকে অনুচ্ছেদ ৩৯ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

চসমা সংবা(দ)ক

চলুন, ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
৩৬-চ-চলাফেরার স্বাধীনতা
৩৭-সমা – সমাবেশের স্বাধীনতা
৩৮- সং- সংগঠনের স্বাদহীনটা
৩৯- বাদ(ক)- চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা

অনুচ্ছেদ- ৪০ থেকে ৪৩

অনুচ্ছেদ ৪০ থেকে অনুচ্ছেদ ৪৩ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

পেধসগৃ

চলুন দেখি ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
৪০-পে-পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা
৪১-ধ – ধর্মীয় স্বাধীনতা
৪২- স- সম্পত্তির অধিকার
৪৩- গৃ- গৃহ ও যোগাযোগের রক্ষণ

 অনুচ্ছেদ- ৪৮ থেকে ৫৪

অনুচ্ছেদ ৪৮ থেকে অনুচ্ছেদ ৫৪ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমার মেয়াদে দায়মুক্তি পেতে অভিসংশন ও অপসারনের ক্ষমতা স্পীকার কে দিলেন।

চলুন, ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
৪৮-রাষ্ট্রপতি -রাষ্ট্রপতি
৪৯-ক্ষমার –ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার
৫০- মেয়াদে- রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ
৫১- দায়মুক্তি- রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি
৫২-অভিসংশন –রাষ্ট্রপতির অভিসংশন
৫৩-অপসারনের – অসামর্থ্যের কারনে রাষ্ট্রপতির অপসারন
৫৪- স্পীকার- অনুপস্থিতি প্রভৃতির কালে রাষ্ট্রপতি পদে স্পীকার

অনুচ্ছেদ- ৫৫ থেকে ৫৮

অনুচ্ছেদ ৫৫ থেকে অনুচ্ছেদ ৫৮ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিগণ প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীর পদের মেয়াদ ঠিক করেন।

চলুন দেখি ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-

৫৫-মন্ত্রিসভায়- মন্ত্রিসভা 
৫৬-মন্ত্রিগণ- মন্ত্রিগণ
৫৭- প্রধানমন্ত্রী- প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ 
৫৮-অন্যান্য মন্ত্রীর পদের মেয়াদ- অন্যান্য মন্ত্রীর পদের মেয়াদ 

অনুচ্ছেদ- ৬৫ থেকে ৭৯

অনুচ্ছেদ ৬৫ থেকে অনুচ্ছেদ ৭৯ পর্যন্ত মনে রাখতে আমি এই ছন্দটা মনে রাখতাম।

সংসদ সদস্যগন শুন্য পারিশ্রমিকে অর্থদন্ড ও পদত্যাগের কারনে দ্বৈত অধিবেশেনে ভাষনের অধিকার স্পীকার কে দিলেন। কিন্তু কোরাম না থাকায় স্থায়ী কমিটি ন্যায়পাল নিয়োগে বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি পেতে সচিবালয় গঠন করেন।

চলুন, ছন্দের সাথে অনুচ্ছেদ গুলো মিলেয়ে নেই-
৬৫-সংসদ –সংসদ প্রতিষ্ঠা
৬৬-সদস্যগন –সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা
৬৭- শুন্য- সদস্যদের আসন শুন্য হওয়া 
৬৮- পারিশ্রমিকে- সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক প্রভৃতি 
৬৯-অর্থদন্ড– শপথ গ্রহনের পূর্বে আসন গ্রহন বা ভোট দান করিলে সদস্যের অর্থদন্ড
৭০-পদত্যাগের কারনে  – পদত্যাগ ইত্যাদি কারনে আসন শূন্য হওয়া
৭১- দ্বৈত- দ্বৈত সদস্যতায় বাঁধা 
৭২-অধিবেশেনে –সংসদের অধিবেশেন 
৭৩-ভাষনের –সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাণী 
৭৩ক-অধিকার- সংসদ সম্পর্কে মন্ত্রীগণের অধিকার  
৭৪- স্পীকার- স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার 
৭৫-কোরাম– কার্যপ্রনালী বিধি, কোরাম প্রভৃতি
৭৬-স্থায়ী কমিটি  – সংসদের স্থায়ী কমিটি সমূহ
৭৭- ন্যায়পাল- ন্যায়পাল 
৭৮-সচিবালয়- সচিবালয় 

এতক্ষন ধরে পড়ার পর যারা চিন্তা করছেন এই কবিতাই তো মনে থাকবে না, তাদের জন্য বলছি আর কোন কবিতা বা ছন্দ আমি তৈরি করি নি!!! কিন্তু তারপরেও আমি বলব, আরো বেশ কিছু অনুচ্ছেদ আপনাদের নিজেদের প্রয়োজনে পড়তেই হবে। সেগুলো হলঃ
§  অনুচ্ছেদ-৪৬- দায়মুক্তি বিধানের ক্ষমতা
§  অনুচ্ছেদ-৬৩- যুদ্ধ
§  অনুচ্ছেদ- ৬৪- অ্যাটনী জেনারেল
§  অনুচ্ছেদ- ৮১- টীকা হিসেবে অনেকবার এসেছে, টীকা হিসেবে তাই খুব ই গুরুত্বপূর্ণ
§  অনুচ্ছেদ-৮৩-অধ্যাদেশ প্রনয়নের ক্ষমতা
§  অনুচ্ছেদ- ১১৭-প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল
§  অনুচ্ছেদ- ১২২-ভোটার তালিকায় নামভুক্তির যোগ্যতা
§  অনুচ্ছেদ-১৪১ ক, , গ- জরুরী অবস্থা
§  অনুচ্ছেদ- ১৪২-সংবিধান সংশোধন
§  ১৪৫ক- আন্তর্জাতিক চুক্তি
§  ১৪৮- পদের শপথ

সবশেষে বলব, সংবিধান টা ভালো করে পড়লে আপনি বাংলাদেশ বিষয়াবলী-২য় পত্রে অনেক ভালো মার্কস পাবেন। শুধু তাই নয়, যে কোন বড় প্রশ্নের উত্তরে আপনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ গুলো উল্লেখ করতে পারবেন, এতেও আপনার জন্য অনেক লাভখাতার পৃষ্ঠা ভরার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করেন তারা দেখবেন আপনি অনেক লিখেছেন এবং প্রশ্নের উত্তরে আপনি সংবিধান থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন সুতরাং তারা আপনাকে ভালো নম্বর -ই দিবেন।

লেখাটি কারো উপকারে লাগলে খুশী হব। যে কোন সমালোচনাও সাদরে গৃহীত হবে।।

অনেক ভালো থাকবেন সবাই।।