Showing posts with label 33rd BCS. Show all posts
Showing posts with label 33rd BCS. Show all posts

Friday, July 26, 2013

বঙ্গবন্ধুর জনসম্মুখে দেয়া শেষ ভাষণ (এ ভাষণ নয়, বাংলার ইতিহাস)-১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ

বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও এভাষণটি কতটা প্রাসঙ্গিক তা পড়তে গেলেই টের পাওয়া যায়। অনেক প্রশ্ন ও তার উত্তর ইতিহাসের ধুলোয় ঢেকে যাওয়া এভাষণটিতে রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু এই ভাষণটি জাতির উদ্দেশ্যে দিয়েছিলেন। এটাই তাঁর জীবনে জনসম্মুখে দেয়া শেষভাষণ। সুদীর্ঘ এই ভাষণটির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তার বিরুদ্ধে করা অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র, তার প্ল্যানিং,আশা-হতাশা,তৎকালীন বাস্তবতা, তাঁর সীমাবদ্ধতা, বিশ্বপরিস্থিতি প্রায় সবকিছুরই জবাব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষনটি যেমন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে নির্দেশ করে ঠিক তেমনই ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চের এই অসাধারন ভাষনটি স্বাধীনতাপরবর্তি বাংলাদেশকে নির্দেশ করে। এই ভাষণটির অনুলিখন ১৯৭৯ সালের ১৫ই আগষ্ট তৎকালীন আওয়ামীলীগ থেকে প্রকাশিত স্মরনিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল। 

কি পরিস্থিতিতে তিনি দেশের হাল ধরেছিলেন। দেশের খাদ্য মজুদ কোন অবস্থায় তখন ছিলো, ভুট্টোকে কোন পরিস্তিতিতে ঢাকায় লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিলো, লুটেরা-সুযোগসন্ধানিরা কি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলো, রাজনীতিতে কি ভয়াবহ অবস্থা তখন বিরাজমান ছিলো, তার সীমাবদ্ধতাও কতটা প্রকট ছিলো, দেশ নিয়ে তার নতুন কি প্ল্যান ছিলো সবকিছুরই ব্যাখ্যা তিনি তার এই ভাষণে দিয়েছিলেন।

এই ভাষনটা পড়ে ৭৫ এর আগষ্ট এর দুঃখজনক ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভাষণটি পাঠেই বোঝা যায়, আগষ্টের ভয়াবহ ঘটনা না ঘটাটাই অসম্ভবছিলো এ দুর্ভাগা দেশে। কারন তিনি এই ভাষনেই পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন এদেশটাকে সোনার বাংলা করতে হলে কাদেরকে ডিএক্টিভেট করতে হবে। আর যারাই তার টার্গের্টে পরিনত হয়েছিলো এভাষণের পরপর তারাই তাঁকে সরিয়ে দেয়ার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

বর্তমান আওয়ামীলীগও বঙ্গবন্ধুর এভাষণটির প্রচারে আগ্রহী নয় কারন তাদের বর্তমান নীতির সাথে এভাষণের বঙ্গবন্ধু একটুও খাপ খায় না। আজ যদি বঙ্গবন্ধু ওপার থেকে এসে তার এই প্ল্যান কার্যকর করার চেষ্টা করেন তাহলে তার কন্ঠ স্তব্ধ করতে বর্তমান আওয়ামীলীগাররাই সবার আগে এগিয়ে আসবেন, বাকীদের কথা এখানে নাইবা বললাম।

ইতিহাসের ধুলোয় চাপা পড়ে যাওয়া সেই ভাষণটি হুবহু এখানে তুলে ধরা হলো: 

আমার ভাই ও বোনেরা আজ ২৬শে মার্চ। ২৫শে মার্চ রাত্রে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষকে আক্রমণ করেছিল। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল। সেদিন রাত্রে বি ডি আরের ক্যাম্পে, আমার বাড়ীতে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং চারদিকে আক্রমণ চালায় ও নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশবিক শক্তি নিয়ে। বাংলার মানুষকে আমি ডাক দিয়েছিলাম। ৭ই মার্চ আমি তাদের প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। যখন দেখলাম আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তে আবার আমি ডাক দিয়েছিলাম। আর নয়, মোকাবিলা কর। বাংলার মানুষও যে যেখানে আছ, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর। বাংলার মাটি থেকে শত্রুকে উৎখাত করতে হবে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।

দুনিয়ার মানুষের কাছে আমি সাহায্য চেয়েছিলাম। আমার সামরিক বাহিনীতে যারা বাঙালী ছিল, তাদের এবং আমার বি ডি আর, আমার পুলিশ, আমার ছাত্র, যুবক ও কৃষকদের আমি আহবান করেছিলাম। বাংলার মানুষও রক্ত দিয়ে মোকাবিলা করেছিল। ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছিল, শত শত বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। দুনিয়ার জঘন্যতম ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানী শোষক শ্রেণী। দুনিয়ার ইতিহাসে এত রক্ত স্বাধীনতার জন্য কোন দেশ দেয় নাই, যা বাংলার মানুষ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা পঙ্কিলতা শুরু করলো। যা কিছু ছিল ধ্বংস করতে আরম্ভ করলো। ভারতে আমার এক কোটি লোক আশ্রয় নিয়েছিল। তার জন্য আমরা নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করব। আমি তাদের স্মরণ করি, খোদার কাছে তাদের মাগফেরাত কামনা করি, যারা এদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে, আত্মহুতি দিয়েছে। আমি তাদের স্মরণ করব, যে সকল মুক্তিবাহিনীর ছেলে, যেসব মা-বোনেরা, আমার যে কর্মী বাহিনী আত্মাহুতি দিয়েছিল, শহীদ হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে। এদেশ তাদের সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর যারা জীবন দিয়েছিল বাংলার মাটিতে, আজ তাদের কথাও আমি স্মরণ করি।

এখানে একটা কথা। আপনাদের মনে আছে, পাকিস্তানীরা যাওয়ার পূর্বে ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে, ১৬ই ডিসেম্বরের আগে, কারফিউ দিয়ে ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গায় আমার বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করব, সম্পদ ধ্বংস করব, বাঙালী স্বাধীনতা পেলেও এই স্বাধীনতা রাখতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা হয়েছে। বাংলার লোক স্বাধীন হয়েছে। বাংলার পতাকা আজ দুনিয়ায় ওড়ে। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘের সদস্য। বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সদস্য, কমনওয়েলথের সদস্য, ইসলামী সামিটের সদস্য। বাংলাদেশ দুনিয়ায় এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে, কেউ একে ধ্বংস করতে পারবে না।

ভাইয়েরা-বোনেরা আমার, আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু একটা ওয়াদা আমি রাখতে পারি নাই। জীবনে যে ওয়াদা আমি করেছি, জীবন দিয়ে হলেও সে ওয়াদা আমি পালন করেছি। আমরা সমস্ত দুনিয়ার রাষ্ট্রের সংগে বন্ধুত্ব চাই। আমরা জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাস করি, আমরা কো-একজিস্টেন্সে বিশ্বাস করি। আমরা ভেবেছিলাম, পাকিস্তানীরা নিশ্চয়ই দুঃখিত হবে, আমার সম্পদ ফেরত দেবে। আমি ওয়াদা করেছিলাম, তাদের বিচার করব। এই ওয়াদা আপনাদের পক্ষ থেকে খেলাপ করেছি। তাদের আমি বিচার করিনি। আমি ছেড়ে দিয়েছি এই জন্য যে, এশিয়ায়-দুনিয়ায় আমি বন্ধুত্ব চেয়েছিলাম। দুঃখের বিষয়, পাকিস্তানীরা আমার সম্পদ এক পয়সাও দিল না। আমার বৈদেশিক মুদ্রার কোন অংশ আমাকে দিল না। আমার গোল্ড রিজার্ভের কোন অংশ আমাকে দিল না। একখানা জাহাজও আমাকে দিল না। একখানা প্লেনও আমাকে দিল না। কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পদ এক পয়সাও দিল না। এবং যাবার বেলায় পোর্ট ধ্বংস করলো, রাস্তা ধ্বংস করলো, রেলওয়ে ধ্বংস করলো, জাহাজ ডুবিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত কারেন্সী নোট জ্বালিয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানীরা মনে করেছিল, বাংলাদেশকে যদি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে পারি তাহলে বাংলাদেশের মানুষকে দেখাতে পারব যে, তোমরা কি করছো।

ভুট্টো সাহেব বক্তৃতা করেন। আমি তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম লাহোরে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল বলে। ভুট্টো সাহেব বলেন, বাংলাদেশের অবস্থা কি? ভুট্টো সাহেবকে আমি জিজ্ঞাসা করি, ফ্রণ্টিয়ারের পাঠানদের অবস্থা কী? ভুট্টো সাহেবকে জিজ্ঞাসা করি, বেলুচিস্তানের মানুষের অবস্থা কী? এরোপ্লেন দিয়ে গুলী করে মানুষ হত্যা করছেন। সিন্ধুর মানুষের অবস্থা কী? ঘর সামলান বন্ধু, ঘর সামলান। নিজের কথা চিন্তা করুন। পরের জন্য চিন্তা করবেন না। পরের সম্পদ লুট করে খেয়ে বড় বড় কথা বলা যায়। আমার সম্পদ ফেরত দেওয়া না পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে না। তোমরা আমার কি করেছো? আমি সবার বন্ধুত্ব কামনা করি। পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলার নাই। কিন্তু আমার সম্পদ তাকে দিতে হবে।

আমি দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব চাই, কারো সাথে দুশমনি করতে চাই না। সকলের সাথে বন্ধুত্ব করে আমরা শান্তি চাই। আমার মানুষ দুঃখী, আমার মানুষ না খেয়ে কষ্ট পায়। আমি যখন বাংলাদেশ সরকার পেলাম, যখন জেল থেকে বের হয়ে এলাম, তখন আমি শুধু বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষই পেলাম। ব্যাংকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। আমাদের গোল্ড রিজার্ভ ছিল না। শুধু কাগজ নিয়ে আমরা সাড়ে সাত কোটি লোকের সরকার শুরু করলাম। আমাদের গুদামে খাবার ছিল না। গত তিন চার বৎসরে না হলেও বিদেশ থেকে ২২ কোটি মণ খাবার বাংলাদেশে আনতে হয়েছে। বাইশ শ’ কোটি টাকার মত বিদেশ থেকে হেল্‌প আমরা পেয়েছি। সেজন্য যারা আমাদের সাহায্য করেছে, সে সমস্ত বন্ধুরাষ্ট্রকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।

কিন্তু আর একটি কথা। অনেকে প্রশ্ন করেন, আমরা কি করেছি? আমরা যখন ক্ষমতায় এলাম, দেশের ভার নিলাম, তখন দেশের রাস্তাঘাট যে অবস্থায় পেলাম, তাকে রিপেয়ার করবার চেষ্টা করলাম। সেনাবাহিনী নাই, প্রায় ধ্বংস করে গেছে। পুলিশ বাহিনীর রাজারবাগ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই খারাপ অবস্থা থেকে ভাল করতে কী করি নাই? আমরা জাতীয় সরকার গঠন করলাম। আমাদের এখানে জাতীয় সরকার ছিল না। আমাদের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট ছিল না, বৈদেশিক ডিপার্টম্নেট ছিল না, প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট ছিল না। এখানে কিছুই ছিল না। তার মধ্যে আমাদের জাতীয় সরকার গঠন করতে হল। যাঁরা শুধু কথা বলেন, তাঁরা বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করে বলুন, কী করেছি। এক কোটি লোককে ঘরবাড়ি দিয়েছি। রাষ্ট্রের লোককে খাওয়ানোর জন্য বিদেশ থেকে খাবার আনতে হয়েছে। পোর্টগুলোকে অচল থেকে সচল করতে হয়েছে। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ২২ কোটি মণ খাবার এনে বাংলার গ্রামে গ্রামে দিয়ে মানুষকে বাঁচাতে হয়েছে।

এরপরও কথা আছে। আমি মানুষকে বললাম, আমার ভাইদের বললাম, মুক্তি বাহিনীর ছেলেদের বললাম, তোমাদের অস্ত্র জমা দাও। তারা অস্ত্র জমা দিল। কিন্তু একদল লোক-আমার জানা আছে, যাদের পাকিস্তান অস্ত্র দিয়ে গিয়েছিল তারা অস্ত্র জমা দেয় নাই। তারা এসব অস্ত্র দিয়ে নিরপরাধ লোককে হত্যা করতে আরম্ভ করলো। এমনকি, পাঁচজন পার্লামেন্ট সদস্যকেও তারা হত্যা করলো। তবুও আমি শাসনতন্ত্র দিয়ে নির্বাচন দিলাম। কিন্তু যদি বাংলার জনগণ নির্বাচনে আমাকেই ভোট দেয়, তাহলে সেটা আমার দোষ নয়। ৩১৫ টি সিট এর মধ্যে ৩০৭ টি সিট বাংলার মানুষ আমাকে দিল। কিন্তু একদল লোক বলে, কেন জনগণ আমাকে ক্ষমতা দিল? কোনো দিন কোনো দেশ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে কাউকে এভাবে অধিকার দেয় না। কিন্তু অধিকার ভোগ করতে হলে তার জন্য যে রেসপনসিবিলিটি আছে, সেটা তারা ভুলে গেল। আমি বললাম, তোমরা অপজিশন সৃষ্টি কর। তারা তা সৃষ্টি করলো। বক্তৃতা করতে আরম্ভ করলো। কিন্তু সেই সঙ্গে অন্ধকারে মানুষ হত্যা করতে আরম্ভ করলো। দরকার হলে অস্ত্র দিয়ে আমাদের মোকাবেলা করতে চায়। অস্ত্রের হুমকি দেওয়া হল। মানুষ হত্যা থেকে আরম্ভ করে রেল লাইন ধ্বংস করে, ফার্টিলাইজার ফেক্টরি ধ্বংস করে, জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে তারা এমন অবস্থার সৃষ্টি করলো যাতে বিদেশী এজেন্ট যারা দেশের মধ্যে আছে, তারা সুযোগ পেয়ে গেল। আমাদের কর্তব্য মানুষকে বাঁচানো। চারিদিকে হাহাকার। স্বাধীনতা পাওয়ার সংগে সংগে সমস্ত দুনিয়ার সমস্ত জিনিষের দাম আস্তে আস্তে বেড়ে গেল। সমস্ত দুনিয়া থেকে আমাদের কিনতে হয়। খাবার কিনতে হয়, কাপড় কিনতে হয়, ঔষধ কিনতে হয়, তৈল কিনতে হয়। আমরা তো দুইশ’ বছর ইংরেজদের কলোনী ছিলাম, পঁচিশ বছর পাকিস্তানের কলোনী ছিলাম। আমাদের তো সব কিছুই বিদেশ থেকে কিনতে হয়। কিন্তু তার পরেও বাংলার মানুষ কষ্ট স্বীকার করে কাজ করতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু তারা তাদের এগোতে, কাজ করতে দেয় না।আর একদল বিদেশে সুযোগ পেল। তারা বিদেশ থেকে অর্থ এনে বাংলার মাটিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করলো। স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করবার চেষ্টা করলো। আজ এদিনে কেন বলছি একথা? অনেক বলেছি, এত বলার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার চোখের সামনে মানুষের মুখ ভাসে। আমার দেশের মানুষের রক্ত ভাসে। আমার চোখের সামনে ভাসে আমারই মানুষের আত্মা। আমার চোখের সামনে সে সমস্ত শহীদ ভাইয়েরা ভাসে, যারা ফুলের মত ঝরে গেল, শহীদ হল। রোজ কিয়ামতে তারা যখন বলবে, আমার রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করলাম, তোমরা স্বাধীনতা নস্যাৎ করছো, তোমরা রক্ষা করতে পার নাই, তখন তাদের আমি কী জবাব দেব?

আর একটি কথা। কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলাম ? সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য। কথা হল, এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে যেয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যায়, সাইন করিয়ে নেয়। ফ্রি স্টাইল ! ফেক্টরিতে যেয়ে কাজ না করে টাকা দাবী করে। সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নাই। আবার, শ্লোগান হল- বঙ্গবন্ধু কঠোর হও।

বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে। কঠোর ছিল, কঠোর আছে। কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করলাম, এত রক্ত, এত ব্যাথা, এত দুঃখ। তার মধ্যে ভাবলাম, দেখি, কি হয়, কিছু করতে পারি কিনা। আবদার করলাম, আবেদন করলাম, অনুরোধ করলাম, কামনা করলাম, কিন্তু কেউ কথা শোনে না। চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী।

ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, আজকে যে সিস্টেম করেছি, তার আগেও ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি না, ক্ষমতা বন্দুকের নলে। আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। জনগন যেদিন বলবে, ‘বঙ্গবন্ধু ছেড়ে দাও’। বঙ্গবন্ধু তারপর একদিনও রাষ্ট্রপতি, একদিনও প্রধানমন্ত্রী থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে নাই। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে দুঃখী মানুষকে ভালবেসে, বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে শোষণহীন সমাজ কায়েম করবার জন্য।

দুঃখের বিষয় তারা রাতের অন্ধকারে পাঁচজন পার্লামেন্ট সদস্যকে হত্যা করেছে, তিন-চার হাজারের মত কর্মীকে হত্যা করেছে। আরেক দল দুর্নীতিবাজ টাকা-টাকা, পয়সা-পয়সা করে পাগল হয়ে গেছে। তবে যেখানে খালি দুর্নীতি ছিল, গত দুই মাসের মধ্যে ইনশাআল্লাহ্‌, কিছুটা অবস্থা ইম্প্রুভ করেছে। দুর্নীতি বন্ধ করবার জন্য আজকে কিছু করা হয়েছে।

হ্যা, প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অব গভার্মেন্ট করেছি। জনগণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। পার্লামেন্ট থাকবে। পার্লামেন্ট এর নির্বাচনে একজন, দুইজন, তিনজনকে নমিনেশন দেওয়া হবে। জনগণ বাছবে, কে ভাল, কে মন্দ। আমরা চাই শোষিতের গনতন্ত্র। এটা পরিষ্কার।

আমি পোগ্রাম দিয়েছি। আজকে আমাদের সামনে কাজ কী? আজকে আমাদের সামনে অনেক কাজ। আমি সকলকে অনুরোধ করব, আপনারা মনে কিছু করবেন না, আমার কিছু উচিৎ কথা কইতে হবে। কারণ, আমি কোন দিন ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি নাই। সত্য কথা বলবার অভ্যাস আমার আছে। মিথ্যা বলবার অভ্যাস আমার নেই। কিন্তু কিছুটা অপ্রিয় কথা বলব।

বন্যা হল। মানুষ না খেয়ে কষ্ট পেল, হাজার হাজার লোক না খেয়ে মরে গেল। দুনিয়া থেকে ভিক্ষা করে আনলাম! পাঁচ হাজার সাতশ’ লঙ্গরখানা খুললাম মানুষকে বাঁচাবার জন্য। আমি চেয়েছিলাম স্বাধীনতা। কি স্বাধীনতা? আপনাদের মনে আছে, আমার কথার মধ্যে দুইটি কথা ছিল। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে। যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে ভাত খেতে না পারে, কাপড় পড়তে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তা হলে মানুষের জীবনে শান্তি ফিরে আসতে পারে না।

আজ কে দুর্নীতিবাজ? যে ফাঁকি দেয়, সে দুর্নীতিবাজ। যে স্মাগলিং করে সে দুর্নীতিবাজ। যে ব্ল্যাক-মার্কেটিং করে, সে দুর্নীতিবাজ। যে মজুদ করে সে দুর্নীতিবাজ। যারা কর্তব্য পালন করে না, তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে, তারাও দুর্নীতিবাজ, যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে, তারাও দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। আমি কেন ডাক দিয়েছি? এই ঘুণেধরা ইংরেজ আমলের পাকিস্তানী আমলের যে শাসন ব্যবস্থা, তা চলতে পারে না। তাহলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে, না হলে আসতে পারে না। আমি তিন বছর দেখেছি। দেখে শুনে আমি আমার স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছি। এবং তাই জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে শাসনতন্ত্রের মর্মকথা।

আজকে জানি, আপনাদের কষ্ট হচ্ছে। আমি জানি, না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। আমার চেয়ে অধিক কে জানতে পারে? বাংলার কোন থানায় আমি ঘুরি নাই, বাংলার কোন যায়গায় আমি যাই নাই? বাংলার মানুষকে আমার মত কে ভাল করে জানে?

আপনারা দুঃখ পান, না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। আপনাদের গায়ে কাপড় নাই। আপনাদের শিক্ষা দিতে পারছি না। কিন্তু সবচেয়ে বড় জিনিষ খাদ্য।

একটা কথা বলি আপনাদের কাছে। সরকারী আইন করে কোনো দিন দুর্নীতিবাজদের দুর করা সম্ভব নয়, জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একটি মাত্র অনুরোধ আছে আপনাদের কাছে।আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে- এক নম্বর কাজ হবে, দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে? আইন চালাব। ক্ষমা করব না। যাকে পাব, ছাড়ব না। একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণআন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে যে, ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিষ বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিক বয়কট করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখতে হবে, কোথায় আছে, ঐ চোর, ঐ ব্ল্যাক মার্কেটার, ঐ ঘুষখোর। ভয় নাই, আমি আছি। ইনশাল্লাহ, আপনাদের উপর অত্যাচার করতে দেব না। কিন্তু আপনাদের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন করতে পারে কে? ছাত্র ভাইয়েরা পারে। পারে কে? যুবক ভাইয়েরা পারে। পারে কে? বুদ্ধিজীবিরা পারে। পারে কে? জনগণ পারে। আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ গড়তে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করবার জন্য, বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন করবার জন্য। এই দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ চলে যাবে। এত চোর যে কোথা থেকে পয়দা হয়েছে জানি না। পাকিস্তান সব নিয়ে গেছে, কিন্তু এই চোর রেখে গেছে। এই চোর তারা নিয়ে গেলে বাঁচতাম। কিছু দালাল গেছে, চোর গেলে বেঁচে যেতাম।

দ্বিতীয় কথা, আপনারা জানেন, আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয়, জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুন বেশি ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে ডাবল ফসল করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণ করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না, ভিক্ষা করতে হবে না।

ভাইয়েরা আমার, বোনেরা আমার, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত নাই। একটা লোককে আপনারা ভিক্ষা দেন এক টাকা কি, আট আনা। তারপর তার দিকে কিভাবে চান? বলেন, ‘ও বেটা ভিক্কুক। যা বেটা, নিয়ে যা আট আনা পয়সা।’ কোন জাতি যখন ভিক্ষুক হয়, মানুষের কাছে হাত পারে, মানুষকে বলে, ‘আমাকে খাবার দাও, আমাকে টাকা দাও,’ তার তখন ইজ্জত থাকতে পারে না। আমি সেই ভিক্ষুক জাতির নেতা থাকতে চাই না।

আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে- যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট-পরা কাপড় পরা ভদ্রলোক, তাদের কাছেও চাই, – জমিতে যেতে হবে। ডাবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করূন আজ থেকে ঐ শহীদদের কথা স্মরণ করে ডাবল ফসল করতে হবে। যদি ডাবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাবও, ইনশাআল্লাহ্‌, হবে না। কারো কাছে ভিক্ষুকের মত হাত পাততে হবে না।

আমি পাগল হয়ে যাই চিন্তা করে। এ-বৎসর, ১৯৭৫ সালে, আমাকে ছয় কোটি মণ খাবার আনতে হবে। কি করে মানুষকে বাঁচাব? কি করে অন্যান্য জিনিষ কিনব? বন্ধু রাষ্ট্র সাহায্য দিচ্ছে বলে বেঁচে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ন হয়ে নিজেদের পায়ের ওপর দাঁড়াতে হবে জাতি হিসেবে।

ভাইয়েরা আমার, একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হল ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ্য লোক বাড়ে, তাহলে ২৫/৩০ বৎসরে বাংলায় কোন জমি থাকবে না হাল চাষ করবার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সেই জন্য আজকে আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে। এটা হল তিন নম্বর কাজ। এক নম্বর হল – দুর্নীতিবাজ খতম করা। দুই নম্বর হল – কলে কারখানায়, ক্ষেতে খামারে প্রোডাকশন বাড়ান। তিন নম্বর হল – পপুলেশন প্ল্যানিং। চার নম্বর হল – জাতীয় ঐক্য।

জাতীয় ঐক্য গড়বার জন্য একদল করা হয়েছে। যারা বাংলাকে ভালবাসে, এর আদর্শে বিশ্বাস করে, চারটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ মানে, তারা সকলেই এই দলের সদস্য হতে পারবে। যারা বিদেশি এজেন্ট, যারা বহিঃশত্রুর কাছ থেকে পয়সা নেয়, এতে তাদের স্থান নাই। সরকারী কর্মচারীরাও এই দলের সদস্য হতে পারবে। কারণ, তারাও এই জাতির একটা অংশ। তাদেরও অধিকার থাকবে এই দলের সদস্য হওয়ার। এই জন্য সকলে – যে যেখানে আছি, একতাবদ্ধ হয়ে দেশের কাজে লাগতে হবে।

ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, এই জাতীয় দলের আপাতত পাঁচটা ব্রাঞ্চ হবে। একটা শ্রমিক ভাইদের অঙ্গদল, কৃষক ভাইদের একটা, যুবক ভাইদের একটা, ছাত্রদের একটা এবং মহিলাদের একটা। এই পাঁচটা অঙ্গদল মিলে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। আমাকে অনেকে বলে, কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ তো হল। কিন্তু আমাদের কী হবে? আমি বলি আওয়ামী মানে তো জনগণ। ছাত্র, যুবক, শিক্ষিত সমাজ, সরকারী কর্মচারী, সকলে মিলে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ।

শিক্ষিত সমাজের কাছে আমার একটা কথা। আমরা শতকরা কতজন শিক্ষিত লোক? আমরা শতকরা ২০ জন শিক্ষিত লোক। তার মধ্যে সত্যিকার অর্থে আমরা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত। শিক্ষিতদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন। আমি এই যে দুর্নীতির কথা বললাম, তা কারা করে? আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? ব্ল্যাক মার্কেটিং করে কারা? বিদেশি এজেন্ট হয় কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোর্ড করে কারা? এই আমরা, যারা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যেই রয়েছে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে। দুর্নীতিবাজ এই শতকরা ৫ জনের মধ্যে, এর বাইরে নয়।

শিক্ষিত সমাজকে আর একটা কথা বলব। আপনাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয় নাই। একজন কৃষক যখন আসে খালি গায়ে, লুঙ্গী পরে, আমরা বলব, ‘এই বেটা, কোত্থেকে আইছিস, বাইরে বয়, বাইরে বয়।’ একজন শ্রমিক যদি আসে বলি ‘ঐখানে দাড়া।’ ‘এই রিক্সাওয়ালা, ঐভাবে চলিস না।’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের তুচ্ছ করেন। এর পরিবর্তন করতে হবে। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ঐ গরীব কৃষক। আপনার মাইনে দেয় ঐ গরীব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।

সরকারী কর্মচারী বলি, মনে রেখো, এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনী নয়। পাকিস্তানের কলোনী নয়। যে লোককে দেখবে, তার চেহারাটা তোমার বাবার মত, তোমার ভাইয়ের মত। ওরই পরিশ্রমের পয়সায় তুমি মাইনে পাও। ওরাই সম্মান বেশী পাবে। কারণ, ওরা নিজেরা কামাই করে খায়।

একটা কথা আমি জিজ্ঞাসা করি, কিছু মনে করবেন না। আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? আমার বাপ-মা। আমরা বলি, বাপ-মা। লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? ডাক্তারী পাশ করায় কে? ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করায় কে? সায়েন্স পাশ করায় কে? বৈজ্ঞানিক করে কে? অফিসার করে কে? কার টাকায়? বাংলার দুখী জনগণের টাকায়। একজন ডাক্তার হতে সোয়া লাখ টাকার মত খরচ পড়ে। একজন ইঞ্জিনিয়ার করতে এক লাখ থেকে সোয়া লাখ টাকার মত খরচ পড়ে। বাংলার জনগণ গরীব। কিন্তু এরাই ইঞ্জিনিয়ার বানাতে টাকা দেয়, মেডিকেলের টাকা দেয় একটা অংশ।

আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, শিক্ষিত ভাইয়েরা, আপনাদের লেখাপড়ার যে খরচ জনগণ দিয়েছে, তা শুধু আপনাদের সংসার দেখবার জন্য নয়। আপনাদের ছেলেমেয়েদের দেখবার জন্য নয়। দিয়েছে এই জন্য যে, তাদের জন্য আপনারা কাজ করবেন, তাদের সেবা করবেন। তাদের আপনারা কী দিয়েছেন? কী ফেরত দিয়েছেন, কতটুকু দিচ্ছেন? তাদের টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, তাদের টাকায় ডাক্তার সাহব, তাদের টাকায় রাজনীতিবিদ সাহেব, তাদের টাকায় মেম্বার সাহেব, তাদের টাকায় সব সাহেব। আপনারা দিচ্ছেন কী? কী ফেরত দিচ্ছেন? আত্মসমালোচনা করুন। বক্তৃতা করে লাভ নাই। রাতের অন্ধকারে খবরের কাগজের কাগজ ব্ল্যাক মার্কেটিং করে সকাল বেলা বড় বড় কথা লেখার দাম নেই। রাতের বেলা ঔষধ ব্ল্যাক মার্কেটিং করে বড় বড় কথা বলার দাম নাই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেণ্টালে মদ খেয়ে অনেস্টি এর কথা বলার দাম নেই। আত্মসমালোচনা করুন, আত্মশুদ্ধি করুন। তাহলেই হবেন মানুষ।

এই যে কি হয়েছে সমাজের! সমাজ ব্যবস্থায় যেন ঘুণ ধরে গেছে। এই সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই। যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানীদের, সে আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে। আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি জানি, আপনাদের সমর্থন আছে।

কিন্তু একটা কথা এই, যে নতুন সিষ্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, তাতে গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না যে, জমি নিয়ে যাব। তা নয় পাঁচ বৎসরের প্ল্যান এ বাংলাদেশে ৬৫ হাজার গ্রামে একটি করে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেক গ্রামে এই কো-অপারেটিভ। এর জমি মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু ফসলের অংশ সবাই পাবে। প্রত্যেকটি বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ – যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে এই কো-অপারেটিভ এর সদস্য হতে হবে। এগুলি বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস পোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল এ যারা টাউট আছেন, তাদের বিদায় দেওয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্য ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে যে, পাঁচ বৎসরের প্ল্যান এ প্রত্যেকটি গ্রামে পাঁচ শত থেকে এক হাজার ফ্যামিলি নিয়ে কম্পল্সারি কো-অপারেটিভ হবে। আপনার জমির ফসল আপনি নেবেন, অংশ যাবে কো-অপারেটিভ এর হাতে, অংশ যাবে গভর্নমেন্ট এর হাতে।

দ্বিতীয়তঃ থানায় থানায় একটি করে কাউন্সিল হবে। এই কাউন্সিলে রাজনৈতিক কর্মী বা সরকারী কর্মচারী যেই হন, একজন তার চেয়ারম্যান হবেন। এই থানা কাউন্সিলে থাকবে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এর সরকারী কর্মচারী। তার মধ্যে আমাদের কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি থাকবে, যুব প্রতিনিধি থাকবে, কৃষক প্রতিনিধি থাকবে। তারাই থানাকে চালাবে।

আর, জেলা থাকবে না, সমস্ত মহকুমা জেলা হয়ে যাবে। সেই মহকুমায় একটি করে এডমিনিষ্ট্রেটিভ কাউন্সিল হবে। তার চেয়ারম্যান থাকবে। সব কর্মচারীরা এক সঙ্গে তার মধ্যে থাকবে। এর মধ্যে পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকবে। পার্টি রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকবে। সেখানে তারা সরকার চালাবে। এইভাবে আমি একটা সিস্টেম চিন্তা করেছি এবং করব বলে ইনশাআল্লাহ আমি ঠিক করেছি। আমি আপনাদের সাহায্য ও সহানুভূতি চাই।

ভাই ও বোনেরা আমার, আজকে আর একটা কথা বলি। আমি জানি, শ্রমিক, ভাইয়েরা, আপনাদের কষ্ট আছে। কী কষ্ট, আমি জানি। তা আমি ভুলতে পারছি না। বিশেষ করে ফিক্সড ইনকাম গ্রুপ এর কষ্টের সীমা নাই। কিন্তু কোথায় থেকে কী হবে? টাকা ছাপিয়ে বাড়িয়ে দিলেই তো দেশের মুক্তি হবে না। ইনফ্লেশন হবে। প্রোডাকশন বাড়াতে পারলে তার পরেই আপনাদের উন্নতি হবে। না হলে উন্নতি হবে না। আমি এই-ই জানি। যেমন আমরা আজকে দেখছি।

কপাল, আমাদের কপাল! আমরা গরীব দেশ। আমাদের কপাল, – আমার পাটের দাম নাই, আমার চায়ের দাম নাই। আমরা বেচতে গেলে অল্প পয়সায় আমাদের বিক্রি করতে হয়। আর, আমি যখন কিনে আনি, যারা বড় বড় দেশ, তারা তাদের জিনিষের দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়। আমরা বাঁচতে পারি না। আমরা এই জন্য বলি, তোমরা মেহেরবানি করে যুদ্ধের মনোভাব বন্ধ করো। আর্মামেন্ট রেইস বন্ধ করো। ওই সম্পদ দুনিয়ার দুঃখী মানুষকে বাঁচাবার জন্য ব্যয় করো। তাহলে দুনিয়ায় শান্তি ফিরে আসবে। আজকে তোমরা মনে করেছ, আমরা গরীব, – আমাদের তাই কোন মূল্য নাই। 

কিন্তু-হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছঅপমানঅপমান হতে হবে তাহাদেরসবার সমান।

তোমরা মনে করেছ আমরা গরীব, আমাদের তাই যে দামেই হোক, বিক্রি করতে হয়। কিন্তু এই দিন থাকবে না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ। আমাদের মাটি আছে, আমার সোনার বাংলা আছে, আমার পাট আছে, আমার গ্যাস আছে, আমার চা আছে, আমার ফরেষ্ট আছে, আমার মাছ আছে, আমার লাইভস্টক আছে। যদি ডেভেলপ করতে পারি তবে ইনশাআল্লাহ্‌ এ দিন থাকবে না। তোমরা আজকে সুযোগ পেয়ে জাহাজের ভাড়া বাড়িয়ে দাও। আর তাই আমাদের কিনতে হয়। আমরা এখানে না খেয়ে মরি, আমাদের ইনফ্লেশন হয়, আমরা বাঁচতে পারি না। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যাই, তোমরা কিছু খয়রাত দিয়ে একটু মিষ্টি হাসো। হাসো, হাসো, হাসো। দুঃখে পড়েছি, বিক্রীত হয়েছি। তোমাদের কাছে হাত পাততে হবে, হাসো। অনেকে হেসেছে, – যুগ যুগ ধরে হেসেছে। হাসো! আরব ভাইয়েরাও গরীব ছিল।

আরব ভাইদের সঙ্গে আমরা একাত্মতা ঘোষণা করেছি। প্যালেস্টাই এর আরব ভাইদের ন্যায্য দাবী সমর্থন করে বাংলার মানুষ। আরব ভাইদের পিছনে তারা থাকবে প্যালেস্টাইন উদ্ধার করবার জন্য। এও আমাদের পলিসি। সেখানে নির্যাতিত দুঃখী মানুষ, সেখানে আমরা থাকব।

শ্রমিক ভাইয়েরা, আমি শ্রমিক প্রতিষ্ঠান করছি। আপনাদের প্রতিনিধি ইন্ডাষ্ট্রিয়াস ডিপার্টমেন্ট, লেবার ডিপার্টমেন্ট এর প্রতিনিধি বসে একটা প্ল্যান করতে হবে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী কি করে আমরা বাঁচতে পারি তার বন্দোবস্ত করতে হবে।

ছাত্র ভাইয়েরা, লেখাপড়া করুন। আমি দেখে খুশী হয়েছি, আপনারা নকল-টকল বন্ধ করেছেন একটু। কিন্তু একটা কথা আমি বলব। আমি পেপারে দেখেছি যে এবারে প্রায় এক পার্সেন্ট পাশ, দুই পার্সেন্ট পাশ, তিন পার্সেন্ট পাশ। শিক্ষক সম্প্রদায়ের কাছে আমার আকুল আবেদন, ফেল করাবেন না। নকল বন্ধ করেছি। আপনাদের একটা কর্তব্য আছে, ছেলেদের মানুষ করতে হবে। ফেল করানোতে আপনাদের তেমন বাহাদুরি নাই, পাশ করালেই বাহাদুরি আছে। আপনাদের কর্তব্য পালন করুন। খালি ফেল করিয়ে বাহাদুরি নেবেন, তা হয় না। তাদের মানুষ করুন। আমি তো শিক্ষকদের বেতন দেব। আমরা সব আদায় করব। আপনারা লেখাপড়া শেখান, আপনারা তাদের মানুষও করুন। শৃংখলা ফিরিয়ে আনুন, রাজনীতি একটু কম করুন। তাদের একটু মানুষ করবার চেষ্টা করুন। একটু সংখ্যা বাড়ান শুধু এক পার্সেন্ট, দুই পার্সেন্ট, পাঁচ পার্সেন্ট দিয়ে বাহুদুরি দেখিয়ে বলবেন খুব স্ট্রিক্ট হয়েছি? আমিও স্ট্রিক্ট চাই। নকল করতে দেবেন না। তবে, আপনাদের কাছে আবেদন, আপনারা মেহেরবানী করে আপনাদের কর্তব্য পালন করুন। ছেলেদের মানুষ করবার চেষ্টা করুন পাশের সংখ্যা বাড়াবার চেষ্টা করুন। ওদের মানুষ হিসাবে তৈরি করুন। সেটাই ভাল হবে। রাগ করবেন না। আপনারা আবার আমার উপর রাগ করেন। আমি বুদ্ধিজীবিদের কিছু বলি না। তাঁদের সম্মান করি। শুধু এটুকুই বলি যে, বুদ্ধিটা জনগণের খেদমতে ব্যয় করুন। এর বেশী কিছু বলি না। বাবা, বলে কি মারা যাব! আবার কে বই লিখে ফেলবে। খালি সমালোচনা করলে লাভ হবে না।

আমার যুবক ভাইয়েরা, যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে, এর ওপর বাংলার মানুষের বাঁচা নির্ভর করবে। আপনাদের ফুলপ্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পাজামা ছেড়ে একটু লুঙ্গী পরতে হবে। আর, গ্রামে গ্রামে যেয়ে এই কো-অপারেটিভ কে সাক্সেসফুল করবার জন্য কাজ করতে হবে। এ কাজে যুবক চাই, ছাত্র চাই, সকলকে চাই।

আর একটি কথা বলতে চাই। বাংলাদেশের বিচার ইংরেজ আমলের বিচার। আল্লাহর মর্জি যদি সিভিল কোর্টে কেস পড়ে, সেই মামলা শেষ হতে লাগে ২০ বছর। আমি যদি উকিল হই আমার জামাইকে উকিল বানিয়ে কেস দিয়ে যাই। ঐ মামলার ফয়সালা হয় না। আর যদি ক্রিমিনাল কেস হয়, তিন বছর, চার বছরের আগে শেষ হয়ে না। এই বিচার বিভাগকে নতুন করে গড়তে হবে। থানায় ট্রাইবুনাল করবার চেষ্টা করছি। সেখানে যাতে মানুষ এক বছর, দেড় বছরের মধ্যে বিচার পায়, তার বন্দোবস্ত করছি। আশা করি সেটা হবে।

এখন আমি আপনাদের কাছ থেকে একটি কথা জানতে চাই। এই যে চারটি পোগ্রাম দিলাম, এই যে, আমি কো-অপারেটিভ করব, থানা কাউিন্সিল করব, সাব-ডিভিশনাল কাউন্সিল করব আর আমি যে আপনাদের কাছ থেকে ডাবল ফসল চেয়েছি, জমিতে যে ফসল হয়, তার ডাবল চাই, এই সম্পর্কে আপনাদের মত কী?

সরকারী কর্মচারী ভাইয়েরা, একটু ডিসিপ্লিন এসে গেছে। অফিসে যান, কাজ করুন। আপনাদের কষ্ট আছে আমি জানি। দুঃখী মানুষ আপনারা। আপনারা কাজ করুন। জনগণের পেটে খাবার নাই। তাদের ওপর ট্যাক্স বসিয়ে আমি আপনাদের পুষতে পারব না। প্রোডাকশন বাড়ালে আপনাদের এদের সঙ্গে উন্নতি হবে। এই যে কথাগুলি আমি বললাম, এতে আপনারা আমাকে সমর্থন করেন কিনা, আমার আমার উপর আপনাদের আস্থা আছে কিনা আমাকে দুই হাত তুলে দেখিয়ে দিন।

ভাইয়েরা, আবার দেখা হবে। ইনশাআল্লাহ্‌ আবার দেখা হবে। আপনারা বহু দূর থেকে কষ্ট করে এসেছেন। গ্রামে গ্রামে ফিরে যান। যেয়ে বলবেন, দুর্নীতিবাজদের খতম করতে হবে। ক্ষেতে-খামারে, কলে কারখানায় প্রোডাকশন বাড়াতে হবে। সরকারী কর্মচারী ভাইয়েরা, আপনারাও কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সদস্য হবেন। আপনারা প্রাণ দিয়ে কাজ করুন। ইনশাআল্লাহ্‌, বাংলাদেশ এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে।খোদা হাফেজ, জয় বাংলা।

Wednesday, July 24, 2013

৪৭ ও ৭১ এর স্বাধীনতা: ইতিহাস বিশ্বাস ও মীথ


১৬০০ সালের দিকে ইংল্যান্ড বা বৃটেনের আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিলনা। তাই তারা সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ইংরেজদের আদি ব্যবসা ছিল জলদস্যুতা। তাদের পূর্বপুরুষরা পাইরেটস হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। কালক্রমে তারা ধন ও শক্তি সংগ্রহ করে অভিজাতদের সাথে আত্মীয়তা করে। এভাবেই ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারের উত্‍পত্তি হয়। ১৬০০ সালের দিকেই লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিস্ঠা হয়। সেই কোম্পানীই ভারতে ব্যবসা করতে আসে। তখন মোগল বাদশাহদের রমরমা অবস্থা। ওই  একই সময়ে ব্যবসা করার জন্যে ভারতে ফরাসী পর্তুগীজ ও  ওলন্দাজরা  আসে। এর বহু আগেই আরবরা ভারতে আসে ব্যবসা করার জন্যে। মূলত  তারা ভারতের উপকূলীয় এলাকায় ব্যবসার কেন্দ্র স্থাপন করে। বিশেষ করে সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে বহু আরব মুসলমান ব্যবসায়ী ও প্রচারকরা এদেশে আসেন। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর ভাষায় প্রচুর আরবী শব্দের মিশেল পাওয়া যায়। স্থল পথেও বাংলাদেশেমুসলমান শাসক বণিক ও ধর্ম প্রচারকরা এসেছেন। ১২০০ সালের দিকে বাংলাদেশ মুসলমান শাসনের অধীনে আসে। দিল্লীতেও মুসলমান  শাসন কায়েম হয় ১২০০ সালের দিকে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা  যড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলার শাসন দখল করে। ১৮৫৮ সালে প্রকাশ্যে ভারতীয়  সৈনিকরা  বাহাদুর শাহকে তাদের নেতা মেনে নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এটাই ছিল ভারতীয়দের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু। এর আগে ১৭৫৭ থেকে ইংরেজদের অধীনতা অস্বীকার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আলেম সমাজের নেতৃত্বে বাংলার কৃষকরা বিদ্রোহ করে। ইংরেজদের দখলদারিত্ব অস্বীকার করে সারা ভারতে মুসলমান আলেম সমাজই প্রথম ১০০ বছর সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ইংরেজ দখলদারিত্বের ফলে এদেশে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এদেশের মুসলমান সমাজ। ৭১১ সাল থেকে হিসাব করলে এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে  প্রায় এক হাজার বছর মুসলমান শাসন চলেছে। ১২০০ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল নাগাদ লাগাতার প্রায় ৭শ’ বছর মুসলমান চলেছে। এ দীর্ঘ সময়ই ছিল ভারতের স্বর্ণযুগ। ১৮৫৮ সালে শেষ মোগল বাদশাহ বাহাদুর জাফরের কাছ থেকে সারা ভারতের শাসন ভার দখল করে নেয়। বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙুনে নির্বাসনে পাঠায়। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ইংরেজরা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে ভারত শাসন করে। এই ১৯০ বছরের মধ্যে প্রায় দেড়শ’ বছর হিন্দু নেতারা ইংরেজ সরকারকে সহযোগিতা করে। ইংরেজ শাসন আমলের শেষের দিকে মুসলমান নেতারা, বিশেষ করে আলিগড় আন্দোলনের নেতা স্যার সৈয়দ ইংরেজী শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সাথে সাথে সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু বিত্তবান উচ্চ শ্রেণীর  মুসলমান নেতা স্যার সৈয়দকে সমর্থন করেন। স্যার সৈয়দ ও অন্যান্য মুসলমান নেতাদের আহ্বানে মুসলমান তরুনরা ইংরেজী শিক্ষায় আগ্রহী হয়। হিন্দুদের ভিতর রাজা রাম মোহনকে নব জাগরনের দূত হিসাবে অভিহিত করা হয়। ইংরেজদের সাথে সহযোগিতা করে সকল সুযোগ সুবিধা আদায় করে নেয়ার জন্যে অক্ষয় দত্ত, বিদ্যাসাগর , মধুসুদন রাম মোহনের ভাবধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। হিন্দু জাতিকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্যে এরা সকলেই পাশ্চাত্য শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেন। তাদের মাথায় তখন মুসলমানদের সাথে নিয়ে চলার কোন চিন্তা ভাবনা ছিলনা। কারণ তখন মুসলমানরা একেবারেই পতিত ছিল। ১৮২৩ সালের  ১১ই  ডিসেম্বর  রাজা রাম মোহন হিন্দুদের আধুনিক শিক্ষার ব্যাপারে ভাইসরয় লর্ড আমহার্স্টকে এক চিঠি দেন। পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী  ওই চিঠিকে ‘নবযুগের শংখধ্বনি’ বলে অভিহিত করেছেন। ডিরোজিও রাম মোহনের চিন্তাধারার একজন বড় শিষ্য ছিলেন। তাঁরাই সকলে মিলে হিন্দু কলেজ প্রতিস্ঠা করেন। এই সময়ে ডিরোজিওর শিষ্য ছিলেন  রসিককৃষ্ণ মল্লিক, কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়, দিক্ষিণারণঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ,ও রাধানাথ। একই ভাব ধারায় মহারাস্ট্রে কাজ শুরু করেছিলেন  মহাদেব গোবিন্দ রানাড়ে, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে এবং বালগঙাধর তিলক। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে এর আগেই ১৮৩৮ সালে জমিদার রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে জমিদার সভা প্রতিস্ঠিত হয়। তারপর ১৮৪৩ সালে প্রতিস্ঠিত হয় বৃটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি। ১৮৫১ সালে প্রতিস্ঠিত হয় বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন। এ ধরনের আরও বহু সমিতি গঠন করে হিন্দুরা সারা ভারতে। এর ইংরেজদের সরাসরি সমর্থন ছিল। ১৮৮৩ সালে হিন্দুরা সর্ব ভারতীয় সম্মেলনের আয়েজন করে। এর পরেই জাতীয় কংগ্রেস প্রতিস্ঠিত হয় লর্ড হিউমের নেতৃত্বে ১৮৮৫ সালে। ফলে ভারতীয় হিন্দুরা কংগ্রেসের নেতৃত্বে বৃটিশ সরকারকে সমর্থন দিতে থাকে।
ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে হিন্দু নেতারা সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রতিস্ঠার আন্দোলন বলিয়া মনে করিতেন।তাহারা ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতেই পরিচালিত করিতে চাহিয়া ছিলেন। ১৯২১ সালে ইক্যবদ্ধ খেলাফত আন্দোলনের সময় গান্ধীজী  হঠাত্‍ বলে বসলেন, ‘ আমি নিজেকে একজন সনাতনী হিন্দু বলিয়া ঘোষণা করিতেছি। কারণ, ১। বেদ উপনিষদ পুরাণ যাহা কিছু হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বলিয়া পরিচিত তাহার সকল কিছুতেই আমি বিশ্বাস করি,সুতরাং অবতার আর পূণর্জন্মেও আমার দৃঢ বিশা্বাস আছে। ২। বর্ণাশ্রম ধর্মে আমার বিশ্বাস অতি দৃঢ। সেই বর্ণাশ্রম ধর্ম বর্তমান কালের লৌকিক ধারণা বা স্থুল অর্থ ে নহে, তাহা এক অর্থে আমার মতে সম্পুর্ণ  বেদ ভিত্তিক ৩। গোরক্ষা সম্বন্ধেও আমার বিশ্বাস অতি দৃঢ। আমি মুর্তি পুজায়ও বিশ্বাস করি। ‘সনাতনী হিন্দু, বলিতে কি বুঝায় ? গান্ধীজীর একনিস্ঠ অনুচর পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু স্বয়ং এর ব্যাখ্যা দিয়াছেন। তিনি লিখেছেন, সনাতনীরা পশ্চাত্‍গতির দৌড়ের প্রিযোগিতায় হিন্দু মহাসভাকেও বহুদূর পিছনে ফেলিয়া যায়। এই সনাতনীরা এক চরম আকারের ধর্মীয় রহস্যবাদের সহিত বৃটিশ শাসনের প্রতি একাগ্র অনুরক্তি যোজনা করিয়া থাকে। গান্ধীজী হিন্দু বলিতে আমরা বলিতেন আর মুসলমান বলিতে তাহারা বলিতেন। পন্ডিত জওহরলাল অন্তরে ছিলেন বামপন্থী  আর বাইরে ছিলেন দক্ষিণপন্থিদের নেতা। ভারতের বামপন্থী নেতারা গান্ধীজীকে বৃটিশ শাসক , জমিদার ও সামন্তবাদীদের প্রকাশ্য এজেন্ট বলে অভিহিত করেছেন। লেনিনের মতে অহিংস আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল জনগনের সংগ্রামী চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। গান্ধীজীর স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল মালিক-শ্রমিক, জমিদার-প্রজা ও বৃটিশদের মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে দাবী আদায় করা। কংগ্রেস বহুকাল গান্ধীজীর পথ অনুসরন করে অবশেষে কঠের ভাষায় দাবী আদায়ের কথা বলতে থাকে।
ভারতের মুসলমান নেতৃবৃন্দ যখন  দেখলেন কংগ্রেসে থেকে এক্যবদ্ধ জাতীয় আন্দোলন করা যাবেনা তখনই তারা পৃথক সংগঠন বা প্ল্যাটফরম থেকে কথা বলে দাবী আদায়ের চিন্তা করতে থাকলেন। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলীম লীগ প্রতিস্ঠিত হয়। কংগ্রেস মুসলীম লীগকে সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আখ্যায়িত করে। আর নিজেদের সর্বভারতীয় সার্বজনীন রাজনৈতিক দল হিসাবে প্রচার করে। কংগ্রেস নেতারা  বৃটিশ সরকারের কাছে কংগ্রেসকে ভারতবাসীর একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসাবে প্রমান করার চেস্টা করতে লাগলেন। মুসলমান নেতারাও বসে থাকলেননা। তারাও জানান দিলেন, কংগ্রেস একটি হিন্দু সংগঠন এবং হিন্দুদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। কংগ্রেস নেতারা  শিখ বৌদ্ধ জৈন ও খৃস্টান জনগনের কথা একেবারেই ভুলে গেলেন। ক্ষুদ্র ধর্ম গোস্ঠি ও জাতিগুলো নিজেদের আলাদা করে প্রতিস্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কট্টর হিন্দু নেতা গান্ধীজীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বপ্ন ছিল ইংরেজদের কাছ থেকে তারা একাই ক্ষমতা বুঝে নিবে। প্রথম দিকে মুসলমান নেতারা কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাস করেছিলেন। এমন কি ১৯৩৪ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলীম লীগের সভাপতি হওয়ার পরও জিন্নাহ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চেস্টা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন অখন্ড ভারতে মুসলমানেরা তাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে পাবে। কিন্তু দু:খের বিষয় কংগ্রেস নেতারা মুসলীম লীগের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায়নি। মুসলমানরা ভারতীয় হলেও তাদের আলাদা স্বত্তা আছে একথা হিন্দু নেতারা কখনই মেনে নিতে চাননি। কংগ্রেসের এই মনোভাবকে শাসক গোস্ঠিও পছন্দ করেনি। এমনি করেই এক সময় পাকিস্তান প্রস্তাব সামনে এসে যায় এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠে খুবই অল্প সময়ে। আজ ভারতীয় নেতারাও অনুভব করছেন, কংগ্রেসের  উদারতা সহনশীলতার অভাবেই ভারত বিভক্ত হয়েছে। ভারতের নতুন প্রজন্ম বুঝতে পেরেছে কংগ্রেসের হীনমন্যতা ও হিন্দুত্ববাদীতাই ভারত বিভক্তির জন্য দায়ী। মুসলমানরা একটি আলাদা জাতি একথা প্রমান করার জন্যেই তারা পাকিস্তান প্রস্তাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস বিভক্ত ভারতে একটি হিন্দু রাস্ট্র প্রতিস্ঠা করেই ছাড়লো। কংগ্রেস যদি হিন্দু ভারত না চাইতো তাহলে ভারত ভাগ হতোনা এবং নতুন মুসলীম রাস্ট্র পাকিস্তানও প্রতিস্ঠা হতেনা।
এতক্ষন যা বলেছি তার সবই পুরাণো কথা এবং ইতিহাসের পাতা থেকে নেয়া। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্ম ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান সৃস্টির বিষয়টা আজও ভাল করে জানেনা। তাই পুরাণো কথা গুলো নতুন করে মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে বলতে হয়েছে। শিক্ষিত সমাজের ৯০ ভাগই জানেন বা বলেন জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্বের কারণে ভারত ভাগ হয়েছে। হাঁ, জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্বের কথা বলেছেন। কিন্তু কখন এবং কেন? কংগ্রেস যদি হিন্দু রা্স্ট্র ভারত না চাইতো তাহলে পাকিস্তান হতেনা। আগেই  বলেছি  কংগ্রেস যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্ব না করতো তাহলে মুসলীম লীগের জন্মই হতোনা। ভারতের মুসলমানরা এখনও  দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোস্ঠি। সে হিসাবে তারা এখনও অধিকার বঞ্চিত। এমন কি পশ্চিম বংগে অসম্প্রদায়িক বলে কথিত কমিউনিস্ট পার্টি ৩৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও মুসলমান জনগোস্ঠির সুবিচার করা হয়নি। ভারতের সকল রাজনৈতিক দলই মোটামুটি হিন্দু ভারতে বিশ্বাসী। ৪৭ সালেও কংগ্রেস মুসলীম মেজরিটি এলাকা পাঞ্জাব এবং বাংলাকে বিভক্ত করে। বাংগালীরা হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ ভাবে স্বাধীন অখন্ড বাংলাদেশ চেয়েছিল। সেটাও কংগ্রেস মানেনি।
৪৭ সালে পাকিস্তান রাস্ট্র  যখন প্রতিস্ঠিত হয় তখন এর রাজধানী নির্ধারন করা হয়  সিন্ধু প্রদেশের করাচীতে। ঢাকা প্রাদেশিক সরকারের রাজধানীতে পরিণত হয়। প্রাক  ৪৭  সময়ে সারা ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে বাংগালী মুসলমানের তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ছিলনা। ফলে পাকিস্তান প্রতিস্ঠার পর সামরিক বাহিনী ও সিভিল সার্ভিসের উচ্চ পদ গুলিতে চাকুরী লাভ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের অফিসারগণ। এমন কি পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চ পদ গুলিতেও অবাংগালী অফিসারগণ নিয়োগ লাভ করেন। ভারত বিভক্তির ফলে ভারত থেকে  লাখ লাখ অবাংগালী সরকারী কর্মচারী পূর্ব পাকিস্তানে আসতে শুরু করে। এদের পূণর্বাসনের দায়িত্ব পড়ে প্রদেশিক সরকারের উপর। আজকের মোহাম্মদপুর সে সময়েরই সৃস্টি। রেলের বড় বড় চাকুরী গুলো লাভ করেন অবাংগালী অফিসারেরা। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে ছিল এক বিরাট চাকুরীদাতা। প্রদেশের জেলাগুলোতে অনেক অবাংগালী ডিসি , ডিএম ও এসপি চাকুরী পান। পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের নাম থখন ছিল ইস্ট বেংগল। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে একজন গভর্ণর ও একজন চীফ সেক্রেটারী প্রদেশে থাকতো। পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান ছিল খুবই অনগ্রসর। মূলত: একটি কৃষি প্রধান প্রদেশ। কল কারখানা যা ছিল তার মালিকরা থাকতেন কোলকাতায়। অধিবাসীদের ৯০ ভাগই ছিলেন  কৃষক। সত্যি কথা বলতে কি প্রদেশটি দীর্ঘকাল ইংরেজ শোষন ও হিন্দু জমিদারদের শোষণের ফলে নি:স্ব হয়ে পড়েছিল। সচিবালয়ে মাটিতে চাটাই বিছিয়ে কর্মচারীরা কাজ করেছেন। মন্ত্রীরা তিন-চার জন মিলে একটি গাড়ি ব্যবহার করতেন। ১৯০৫ সালে গঠিত প্রদেশ ব্যবস্থা যদি টিকে থাকতো তাহলে সদ্য স্বাধীন প্রদেশের এমন দূরবস্থা হতোনা। রেডী প্রশাসনিক কাঠামো পাওয়া যেতো। যা অন্য প্রদেশের ক্ষেত্রে বিদ্ধমান ছিল।
খুব বেশী পিছিয়ে পড়া এই প্রদেশের উন্নতির জন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের যে সব জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার দরকার ছিল তা তারা নিতে পারেননি। হয়ত তাঁরা এর প্রয়োজন বোধ করেননি। হয়ত প্রদেশ সম্পর্কে তাদের সুস্পস্ট কোন ধারনা ছিলনা। বারোশ’ মাইল দূরে অবস্থিত এই প্রদেশের সাথে কেন্দ্রের শক্তিশালী টেলি যোগাযোগ বা বিমান যোগাযোগ ছিলনা। ফলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বিলম্ব হয়ে যেতো। নুরুল আমিন সাহেবের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথায় বিষয়টি খুবই স্পস্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। পুর্ব পাকিস্তানের জন্যে যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন ছিল তা কেন্দ্র কখনই অনুভব করেনি। অথবা তারা পুরো বিষয়টাকে অবহেলা করেছে। প্রাদেশিক মুসলীম লীগের রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানীকে অবজ্ঞা করা মোটেই বুদ্ধির পরিচায়ক হয়নি। প্রাদেশিক মুসলীম লীগ নেতাদের খামখেয়ালীপনা ও অদূরদর্শিতার ফলেই মাওলানা ভাসানী মধ্যবিত্ত তরুণ নেতাদের নিয়ে আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠন করেন।দূর্বল মুসলীম লীগ সংগঠনের বিপরীতে আওয়ামী মুসলীম লীগ খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রদেশের সাধারন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ভাষাকে কেন্দ্র করে প্রদেশের সাধারন মানুষের ভিতর এক নতুন জাগরনের সৃস্টি হয়।মুসলীম লীগকে রাজনীতি থেকে বিদায় দেয়ার জন্যে মাওলানা ভাসানী ৫৪ সালের নির্বাচনের জন্যে শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে যুক্তফ্রন্ট গঠণ করেন। নির্বাচনে মুসলীম লীগের ভরাডুবি হয়। এরপর পূর্ব পাকিস্তানে মুসলীম লীগ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। অথচ এই দলটি নির্যাতিত মুসলমানদের বাঁচানোর তাগিদেই  ৪৭ সালে পাকিস্তান নামক  রাস্ট্রটি প্রতিস্ঠা করেছি। হিন্দু প্রাধান্যের সামনে তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্যেই পাকিস্তানের জন্যে জান দিয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মাথায় প্রদেশের মুসলমানেরা নিজেদের বাংগালী ভাবতে শুরু করে। ৭০ এর সাধারন নির্বাচন অনুস্ঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক ধরনের গণভোটের মতো। এই নির্বাচন ছিল বাংগালী অবাংগালীর নির্বাচন। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক গোস্ঠি তা একেবারেই অনুধাবন করতে পারেনি। তারা আলোচনার দুয়ার বন্ধ করে দিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে পাকিস্তান রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানকে রক্ষা করা যায়নি। ১৬ই ডিসেম্বর’৭১ এ পাকিস্তানের পরাজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে গেল। আমরা এবার ষোলয়ানা বাংগালী হিসাবে স্বাধীন হলাম। ৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছিলাম মুসলমান হিসাবে। মাত্র ২৩ বছরে পাকিস্তান খন্ডিত হয়ে গেল। এটাই পাকিস্তানের ডেস্টিনি ছিল। ১৬ ই ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন,‘ হাজার সালকা বদলা লিয়া’। কেন বলেছিলেন তা এক লম্বা ইতিহাস। ইতিহাস সচেতন সব মুসলমানেরই জানার কথা। শুরু হলো বাংগালী মুসলমানের নব যাত্রা। ৭১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৪০ বছর। আমাদের আত্মপরিচয় এখনও নির্ধারিত হয়নি। আমরা বাংগালী না বাংলাদেশী তাও ঠিক করে বলতে পারিনা। আমরা মুসলমান না বাংগালী? একদল বলেন পাকিস্তানের বিদায়ের সাথে সাথে দ্বিজাতি তত্বের কবর হয়েছে। বাংলাদেশ সৃস্টি হয়েছে বাংগালী তত্ত্বের ভিত্তিতে। এসব হচ্ছে রাজনীতির বাহাস বা বিতর্ক। রাজনীতিকরা বিতর্ক করেন তাদের ভোট এবং রাজনীতির জন্যে। কিন্তু গবেষকরা বলবেন প্রতিস্ঠিত গবেষণার ভিত্তিতে। আওয়ামী লীগ এবং তার দলীয় ও ভক্তরা মনে করেন আমাদের জাতীয়তা এবং ঐতিহ্য হচ্ছে ভাষা ভিত্তিক। যা  কোলকাতা আর দিল্লীর রাজনীতিক আর বুদ্ধিজীবীরা তাদের মাথায় ঢুকিয়েছে। শুধু ভাষাই হতো তাহলেতো ৪৭ সালেই বাংগদেশ অখন্ড এক থাকার কথা ছিল। এক থাকেনি , কারণ কংগ্রেস তা চায়নি। কারণ অখন্ড বংগদেশে মুসলমানেরা ছিল মেজরিটি। এখনও দুই বাংলা মিলে মুসলমানেরা মিলে মুসলমানেরা মেজরিটি। খোদা কখনও বেকুবদের হেফাজত করেন না। যে ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরোধীতা করেছেন আর ১৯০৫ সালের  বংগভংগ রদের জন্যে আন্দোলন করেছেন তিনিই এখন আমাদের জাতীয় দর্শন হতে চলেছেন। যিনি বৈদিক ধর্ম ও আদর্শে বিশ্বাস করেন তারই বন্দনায় আমরা পাগল হতে চলেছেন। যিনি জমিদার হিসাবে এক সময়ে এদেশের গরীব কৃষকদের শোষণ করেছেন। তাঁর অত্যাচারের নমুনা কি ছিল তা কাংগাল হরিনাথ আর গগন হরকরার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেন। এই মহা ভাগ্যবান মহাপুরুষের জন্ম জয়ন্তী উত্‍সব পালনের জন্যে বহুজাতিক কোম্পানীর অর্থের ভান্ডার সব সময় খোলা থাকে। মানবতার কবি নজরুলের এসব আয়োজন কখনই জোটেনা। এর রহস্য কি আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কখনও ভাবার সুযোগ পান না।
বাংলাদেশের অধিবাসীর  ৯০ ভাগ মুসলমান। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে আমাদের ধর্ম ও ধর্মীয় দর্শন  নিবিড়ভাবে জড়িত। ধর্মকে আমেদের জীবন থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। যেমন গান্ধীজী বলেছিলেন,তিনি প্রথমে হিন্দু তারপরে জাতীয়তাবাদী। ধর্মের বিনিময়ে তিনি স্বাধীনতাও চান না। তিনিই হচ্ছেন ভারতের বাপুজী। তিনি তাঁর হিন্দুত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই ভারত বিভক্তিকে সমর্থন করেছেন। আর আমরা জিন্নাহকে সাম্প্রদায়িক বলে গালআগাল দিই। ভারতের কট্টর হিন্দুবাদীরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নতুন তত্ত্ব  দিয়েছেন। তাহলো ভারতবাসী সকলেই ভৌগলিক কারণে হিন্দু। মুসলমানদের বলতে হবে, হিন্দু মুসলমান। ভারতের হিন্দু নেতারা এখনও স্বপ্ন দেখেন অখন্ড ভারতের এবং হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিস্ঠার। আমাদের দেশে যারা ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলেন তারা জ্ঞানপাপী আর হিন্দু সাম্রাজ্যবাদের দালাল। তারা জেনে শুনে আমাদের জাতিসত্ত্বাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কারন আমাদের জাতিসত্ত্বার প্রধান উপাদান হচ্ছে আমাদের ধর্ম। এই ধর্মই আমাদের ৪৭ সালে ভারত থেকে আলাদা করেছে। এই ধর্মের কারনেই ১৭৫৭ সালে হিন্দুরা  ক্লাইভকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এই ধর্মের কারনেই হিন্দুরা  ১৫০ বছর ইংরেজ শাসনকে সমর্থন করেছে। ৭১ সালে আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছি অর্থনৈতিক কারনে। বাংগালী বলে নয়। ৬ দফা ছিল অর্থনেতিক শ্লোগান ও দাবী। ৬ দফায় ধর্মনিরপেক্ষতা বা বাংগালী বলে কোন শ্লোগান ছিলনা। পাকিস্তানী শাসক গোস্ঠি যদি ৬ দফা মেনে নিত তাহলে পাকিস্তান আজ খুব বেশী হলে একটি  কনফেডারেশন হতো। বংগবন্ধুও হয়ত  তাই চেয়েছিলেন। তাই তিনি স্বাধীনতার কোন প্রকাশ্য ঘোষণা দেননি। কিছুলোক এখন তাঁর নামে নানা ধরনের ঘোষণা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। জিন্নাহ ভারত ভাগ করেছেন আর বংগবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন হচ্ছে রামায়ন মহাভারতের মতো একটা মীথ। ভারতের হিন্দুরা এই মহাকাব্য দুটিকে ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা একটা হচ্ছে ইতিহাস আরেকটা হচ্ছে মীথ। অনেক সময় মীথ ইতিহাসের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী হয়। ( নয়া দিগন্ত, জুন ৪, ২০১১ )

Monday, July 22, 2013

৩-৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এর ঘটনাবলি


ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বরঃ ইতিহাসের কুয়াশাচ্ছন্ন অধ্যায়
নভেম্বর ২-৭। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কুয়াশাচ্ছন এবং ঘোলাটে অধ্যায়। এ সময়ে ইতিহাসকে সব সময় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যয়ন করা হয়েছে; বিকৃত করা হয়েছে। আসল সত্যটা মানুষের কাছ থেকে আড়াল করার প্রয়াস হয়েছে। অনেকে এটাকে বলেন “কলঙ্কিত অধ্যায়’ কিংবা “মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস’ আবার অনেকেই বলেন ‘জাতীয় সংহতি এবং বিপ্লব দিবস’। যারা এটাকে “কলঙ্কিত অধ্যায়’ বলেন তারা যে এটাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলেন না তার প্রমাণ কী? আর যারা বলেন ‘জাতীয় বিপ্লব এবংসংহতি দিবস’ তারাই বা কতটুকু সত্যাশ্রয়ী? তারা যদি সত্যাশ্রয়ীই হন তাহলে কেন তাদের আলোচনায় দিবসটির প্রধান কুশীলব কর্ণেল তাহের উহ্য থাকেন? এসব প্রশ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে সত্যটুকু জানার প্রচেষ্টা এ লেখা।

জাতির জনক শেখ মুজিব রহামানের দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল;কিন্তু দেশ পরিচালনায় তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার ঘাটতি ছিল প্রকট। তাছাড়া কিছু ঘটানা এবং তাঁর অপপরিপক্ক কিছু সিদ্বান্ত জনগন ও সেনাবাহীনিতে বিরুপ প্রতিক্রিয়া ফেলে। আর সে সময়ে এর সদ্ব্যবহার করে সেনাবাহীনির কিছু ক্ষমতালোভী, উচ্ছৃঙ্খল সদস্যেরা। অনেকেই তখন রাজনৈতিক পট পরিবর্তন চাচ্ছিলেন; কিন্তু সেটা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরাকারকে সরে যেতে বাধ্য করা মধ্য দিয়ে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল জাসদ। ১৫ অগাস্টের ভোরেই কর্ণেল তাহের ক্রাচে ভর দিয়ে ভাই আনোয়ার ও জাসদ নেতা ইনুকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন শাহবাগ রেডিও স্টেশনে। ঘটনার কুশীলব মোশতাক ও মেজর রশীদকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অবস্থন। বলেছিলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তিনি চাইছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমন কাপুরুষ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নয়”।বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে ১৫ আগস্টে কেউ রক্ষা করার উদ্যোগ নেয়নি। যে বড় মাপের মানুষ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে গেলেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে, সে মহামানবকে প্রাণ দিতে হলো অসহায়ভাবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও কিন্তু প্রচুর সময় ছিল হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার। সরকারকে রক্ষা করা যেত এবং উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন, যদি তিন বাহিনীর প্রধান সম্মিলিতভাবে খুনিদের বিরুদ্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নারকীয় ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে তিন বাহিনীর প্রধান খন্দকার মোশতাকের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করলেন। এবং তারপর তিন মাস চলে গেল কেউ কিছু করতে পারলেন না।

অবশেষে মেজর ফারুক. মেজর রশিদ এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ-এর গড়া সরকার আরও একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৩রা নভেম্বর, ১৯৭৫-এ ক্ষমতাচ্যুত হয়। এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে পাল্টা অভ্যুত্থান হয়েছিল তা নিয়ে অন্তত তিনটি অভিমত প্রচলিত আছে। এক. ১৫ আগস্টের কুশীলব মেজর বাহিনীর কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা বা চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়ে তারা একাধারে দেশ ও সেনাবাহিনী পরিচালনার মতো নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, যা ১৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছিল বিপন্ন বিষয়ের ব্যাপারে। যা হোক, বলা হয়ে থাকে খালেদ মোশাররফের লক্ষ্য ছিল অবনতিশীল পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরা এবং সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। উপরন্তু অভ্যুত্থানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষেও পরিচালিত হয়েছিল এমন ধারণা ছিল। দুই. বাকশাল ও ভারতপন্থিদের সপক্ষে ছিল এই অভ্যুত্থান। এমন অভিমত তৈরি হওয়ার কারণ ছিল অভ্যুত্থান হওয়ার পরপরই খালেদ মোশাররফের মা'র নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি অভিমুখে মিছিল যাওয়া। মিছিলটি যে কারণেই হোক না কেন, তা খালেদ মোশাররফের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তিন. সেনাপ্রধানের পদ করায়ত্ত করার লক্ষ্যে খালেদ মোশাররফের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে এ অভ্যুত্থান।

৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখেন। কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের সে সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাংখী। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলনা। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারন সৈনিকদের মাঝেও দারুন জনপ্রিয় ছিলেন। কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক। ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাহের জানতে পারেন জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়েছে। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের বিদ্রোহের নির্দেশ দিয়ে তৎক্ষনাত চট্টগ্রামে থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তার সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হয় ৭ই নভেম্বর। কর্নেল তাহের, জিয়উর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। পাল্টা এই অভ্যুত্থানে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে।

এরপর জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় উঠে আসেন। তিনি রহস্যজনক কারনে কর্নেল (অবঃ) আবু তাহেরের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার অভিযোগ আনেন। এতে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। ধারনা করা হয় ৭ই নভেম্বরে কর্নেল তাহেরের জনপ্রিয়তা দেখে জিয়াউর রহমান শংকিত ছিলেন। তাই ক্ষমতা নিষ্কন্টক রাখার জন্যই তাহেরের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার অভিযোগ আনেন।

৭ই নভেম্বরকে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস” বলাটা কতটা যুক্তিসংযত। ক্ষমতা দখলের জন্য সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষী কিছু অফিসারদের পারস্পরিক হানাহানি এবং নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডকে বিপ্লব বলা চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা ওই সময়ের কিছু গোপন দলিল ও নথিপত্রের দেখা যায় যে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ‘৭ই নভেম্বররের সিপাহী বিদ্রোহ’কে মূলত সিপাদীদের রুটি-রুজির প্রশ্নে অসন্তোষের ফল হিসাবে মূল্যায়ন করেছেন।মার্কিন দূতাবাসের উপপ্রধান ছিলেন আরভিং জি. চেসল। তিনিও বিষয়টি সেভাবেই দেখেছেন। আর ৭ নভেম্বরকে সংহতি দিবস বলারও কোনো কারণ নেই,এদিন কার সাথে কার সংহতি হয়েছিল? জনগণের সাথে সিপাহীদের? ১৫ আগষ্টের পর হতে সেনাবাহিনীতে যা হচ্ছিল জনসাধারণের পক্ষে জানা সম্ভবই ছিল না; জনগণ ছিল নীরব দর্শক। আর সিপাহীদের মধ্যেও কোনোপ্রকার সংহতি হ্য় নি, বরং এটা ছিল সিপাহীদের মধ্যে একটা অংশের বিদ্রোহ। ৭ নভেম্বরের পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকায় নিযুক্ত তত্কালীন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার লিখেছেন, ‘ঢাকা সেনানিবাসে শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। ক্ষুদ্র অস্ত্র (স্মল আর্মস) ও মর্টারের গোলাবর্ষণ চলে। সেনারা রেডিও স্টেশনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একটি সংবাদপত্রের দপ্তরেও একটি ছোট সেনাদল দেখা গেছে। দূতাবাসের কাছেও গোলাবর্ষণের আওয়াজ মিলছে। আমরা মনে করি যে, সেনাবাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলগুলো প্রকাশ্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। এয়ারপোর্ট রোডে বসবাসরত একজন বাঙালি সহকারী একটি ট্রাকবোঝাই সেনাদের স্লোগান শুনেছেন। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন: জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ।’ সিপাহীদের মধ্যে যে সংহতি হয় নি তার প্রমাণ জেনারেল জিয়াউর রহমান তার পাচ বছরের শাসনামলে প্রায় ২১টি অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২১টি অভ্যুত্থান থেকে বেঁচে গেলেও ২২তম অভ্যুত্থানে তিনি মৃত্যুবরন করেন। এর অধিকাংশই ছিল ১৯৭১ সালের সেই সকল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সমন্বয়ে গঠিত, যারা জিয়ার ইসলামিক ভাবাপন্ন দলের সাথে সম্পর্ক সহ্য করতে পারেননি।

৭ই নভেম্বরের ঘটনা ‘বিদ্রোহ’ ছিল; কোনোমতেই ‘বিপ্লব’ নয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১১ এবং ১২ই নভেম্বর দুটি বেতার ভাষণ দেন। এতে তিনি ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব বলে দাবি করেননি। বরং তিনি ওই দিন সেনাবাহিনীতে ‘বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টির জন্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) দায়ী করেছিলেন।

জিয়া এ ভাষনে আরও বলেন, “তিনি একজন সৈনিক, রাজনীতিক নন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, সামরিক আইন তুলে নিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ’। তাঁর ভাষায়, এ সরকার ‘সম্পূর্ণরূপে নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক। সেদিন তিনি ওয়াদা করেছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি নির্বাচন দিয়ে দ্রুত ব্যারাকে ফিরে যাবেন। ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রদত্ত আরেকটি ভাষনেও তিনি একই কথা বলেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি তাঁর কথা রাখেননি।

বরং তিনি তার রক্ষাকর্তা কর্নেল তাহেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে ফাঁসির দড়িতে ঝুলান। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক এর কারণ হিসাবে তাহেরের জনপ্রিয়তাকেই কারণ বলে মনে করেন। সৈনিকদের মধ্যে তাহের জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতে জিয়ার কর্তৃত্বে আঘাত হানতে পারে বলেই তাকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিমত।

“৭ নভেম্বর ১৯৭৫ -আলো থেকে অন্ধকারে পতিত হওয়ার কাহিনী” শীর্ষক কলামে কলামিস্ট সৈয়দ বদরুল আহ্সান লিখছেন,

“…স্মরণ করুন ৭ নভেম্বরের ভয়াবহ দৃশ্যগুলো। বিভিন্ন সেনানিবাসে দেশপ্রেমিক সৈনিক ও অফিসারদের হত্যা করার পর্ব চলছে। কোনো দলিল নেই এবং কোনো প্রমাণ নেই যে কর্নেল তাহের এবং জেনারেল জিয়া চেষ্টা করেছেন খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীদের প্রাণে বাঁচাতে। রাজধানী ঢাকার সড়কে সেই পাকিস্তানি কায়দায় স্লোগান শোনা গেল পুরো উদ্যমে। যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শোনা গিয়েছিল ১৫ আগস্টের ভোরবেলায়, সেই ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ই আরও জোরালোভাবে আমাদের শোনানো হলো ৭ নভেম্বরে। গোটা বাংলাদেশটাকে মনে হলো একটি ছোট পাকিস্তান। আবার এও বলা যায় যে সেদিন আমাদের কাছে মনে হয়েছিল, দেশটি একটি বানানা রিপাবলিকে পরিণত হয়েছে। যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আমরা পাকিস্তানে সংগ্রাম করেছি এবং সংগ্রামে জয়ী হয়েছি, সেই সামরিক শাসন আবার স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের জীবনের ধারাটাকে একেবারে ইতিহাসবিরোধী একটি স্রোতে পরিণত করে দিল। ……৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর কারণেই এ দেশে ইতিহাস বিকৃতির সূচনা হয় এবং এই দিনটি সুযোগ করে দেয় সেই পুরোনো পাকিস্তানি দোসরদের, যাতে করে তারা বাংলাদেশে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে।
এসব কথা শেষ হওয়ার নয়। আমাদের আঁধার এখনো কাটেনি। যে আলোর ভুবন আমরা তৈরি করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দ্বারা, সেই ভুবনটি আঁধারে ছেয়ে গেছে ওই দিন, যেদিন খালেদ মোশাররফকে প্রাণ দিতে হলো এই স্বাধীন দেশে।”।

একাত্তরের পরাজিত চক্রের সগর্ব প্রত্যাবর্তন এবং পুনর্বাসন ছাড়া এই বিপ্লবের আর কোন ফল অন্তত দৃষ্টত চোখে ধরা পড়ে না। পঁচাত্তরের নভেম্বারের অফিসার হত্যাকে যদি বিপ্লব বলে গ্লরিফাই করা হয়, তাহলে মাঝে মাঝে এমন বিপ্লব করার মানসিকতা স্থায়ীভাবে দূর হবে কী করে? কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া পিলখানা ঘটনার দিনও ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই’- শ্লোগান উঠেছিল। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে এটারও কারণ ছিল রুটি-রূজির প্রশ্নে অসন্তোষ। যদি এ বিদ্রোহীরা সফল হতো এবং হাসিনা সরকারের পতন হয়ে পচাত্তরের মতো আরেকটি নুতন সরকার আসতো, তাহলে কি আমাদের জাতীয় জীবনে আরেকটি বিপ্লব-দিবস যোগ হতো!
কে এর জবাব দেবে?

৭ই নভেম্বর এর ঘটনা তাই ‘বিদ্রোহ”ই; বিপ্লব না। যে উদ্দেশ্য নিয়ে কর্ণেল তাহের ও জাসদ নেতারা এবং সিপাহীদের কিছু অংশ বিদ্রোহ করেছিল সেটাও কি বাস্তবায়িত হয়েছে? এর ফলশ্র“তিতে প্রাণ দিতে হয়েছে কর্নেল তাহেরকে, প্রাণ দিতে হয়েছে আরও বহু মানুষকে। শত শত জাসদ কর্মীকে জেলের ভেতরে হত্যা করা হয়। আসলে ’৭১-এর পর আরও এক গণহত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে নিধন করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে প্রতিশক্তিকে। পুর্নবাসিত করা হয়েছিল জামাত ইসলামি এবং অনান্য মৌলাবাদী স্বাধীনতা বিরোধোদের। ফলে আজও পর্যন্ত আমাদের সেনাবাহিনী পূর্বসূরীদের আদল বা বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা কিছু হয়েছে এমন বলার সময় আসেনি

ইতিহাসের নিরেট বাস্তবতায় নভেম্বর ১৯৭৫: একজন জিয়ার লিডাশীপ কোয়ালিটি এবং কুটকৌশল ও বিশ্বাসঘাতকতায় পরিপূর্ণ সেই সব দিনগু

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম কয়েকটি দিন বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্পূর্ন। এর মধ্যে ৭ নভেম্বর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেননা এই দিনেই সিপাহী জনতার দুর্বার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করা হয় যা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে এ দেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সিপাহী এবং সর্বস্তরের জনসাধরনের সচেতনতা আর দেশপ্রেম এই দিনে দেশকে একটা ভয়াবহ অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করে। ৩ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী চার দিনের অনাকাঙ্খিত নানা ঘটনার অবসান ঘটিয়ে ৭ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মত মানুষ মুক্তির আনন্দে মেতে ওঠে। ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লবের ৩৪ বছর পরও জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ এবং তাহেরের তখনকার ভুমিকা নিয়ে এখনও আলোচনায় সরগরম প্রতিটি অঙ্গন। প্রকৃতপক্ষে খালেদ মোশাররফ কর্তৃক অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার ষড়যন্ত্র থেকেই দেশে তখন একটা অচলাবস্থা এবং সাময়িক আনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে জিয়ার জনপ্রিয়তার উপর ভর করে জিয়াকে ফাদে ফেলে তাহেরেরও ক্ষমতায় আরোহন করার অভিন্ন উদ্দেস্য ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সীমাহীন দেশপ্রেম এবং সাধারন সৈনিক ও জনগনের নিকট আকাশ ছোয়া জনপ্রিয়তার কাছে পরাজিত হতে হয় খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল তাহেরকে। তথাপি কেউ কেউ প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করে খালেদ মোশাররফকে, আবার গুটিকয়েক লোক তাহেরকে নায়ক সাজাতে বদ্ধ পরিকর।

নভেম্বরের ৩ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত সংগঠিত খালেদ মোশাররফের ব্যর্থ ক্যু, জেনারেল জিয়াকে বন্দী করা ও সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়ার মুক্তি এবং পরবর্তী দুই তিনদিন সাধারন মানুষের দৃষ্টির বাইরে ক্যন্টনমেন্টের অভ্যন্তরের নানা ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনও বেশ কৌতুহল লক্ষ্য করা যায়। মূলত কয়েকজন লেখকের মিথ্যা এবং বানোয়াট ইতিহাস রচনা এবং কতিপয় লোকের লাগামহীন মিথ্যা প্রচারনার ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এখনো প্রকৃত ঘটনাগুলো অনেকটা অস্পষ্ট। সেদিকে লক্ষ্য রেখে এই লেখায় ঐ সময়কার ঘটনাগুলোর সাথে জড়িত কিংবা প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন মানুষের লিখিত বই থেকে উল্লেখ্যযোগ্য অংশ সরাসরি কোট করা হয়েছে। তার সাথে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হালের সত্যনিষ্ঠ একাধিক কলাম লেখকের লেখার অংশ বিশেষও এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও ১৯৭৫ সালের ৭, ৮ ও ৯ নভেম্বর প্রকাশিত তখনকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনেরও গুরুত্বপূর্ন অংশ এই লেখায় সংযোজন করা হয়েছে যা প্রকৃত সত্য ঘটনা আচ করতে অনেকটাই সহায়ক ভুমিকা পালন করবে বলে আশা রাখি।

নভেম্বরের সেই দিনগুলোতে সংঘঠিত ঘটনাবলীর একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ঢাকার তখনকার স্টেশন কমান্ডার লে: ক: আব্দুল হামিদ। সংগত কারনেই একজন নিরপেক্ষ লোক হিসেবে তার লেখা বই 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা' অনেক সত্য ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে। অন্যদিকে ৩ নভেম্বর দিবাগত রাতে বাংলাদেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িত ছিলেন লে: ক: শরিফুল হক ডালিম। সে হিসেবে তার লেখা 'যা দেখেছি, যা বুঝেছি ও যা করেছি' বইটিই যথেষ্ট গ্রহনযোগ্য। এছাড়াও সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার লিখিত বইও মোটামুটি সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য হওয়ায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ধারে এ বই দুটি থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য আংযোজন করা হয়েছে। এই লেখায় প্রধানত ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট, নভেম্বরের ৩ থেকে ৬ তারিখ পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অপচেষ্টা এবং মৃত্য, ৭ নভেম্বর পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কয়েক দিনে কর্নেল তাহেরের ভুমিকা এবং জিয়াউর রহমানের অবস্থান ও ভুমিকা প্রসঙ্গে বিভিন্ন লেখকের বই এবং পত্রিকায় লিখিত কলাম থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়েছে। আশা করি পাঠকমহল সত্য ইতিহাস অনুধাবনে সক্ষম হবেন।

৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট
লে: ক: ডালিম ৭ নভেম্বর তথা নভেম্বর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট বর্ননা করতে গিয়ে বলেন, "ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন চেষ্টা চালাচ্ছে আর্মির মধ্যে কিছু লোকের মাধ্যমে একটি প্রতি বিপ্লব ঘটিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিভক্তি সৃষ্টি করে দেশকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে ২৫ বছরের আওতায় বাংলাদেশে সরাসরিভাবে হস্তক্ষেপ করে জনাব তাজুদ্দীনের নেতৃত্বে একটি অনুগত সরকার গঠন করে বাংলাদেশকে একটি করদ রাজ্যে পরিনত করা।" (লে: ক: শরীফুল হক ডালিম: যা দেখেছি, যা বুঝেছি ও যা করেছি, পৃষ্ঠা ৫০৩)

বিশিষ্ট কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদও প্রথম আলোয় লিখিত একটি কলামে একই ধরনের তথ্য দেন। তিনি বলেন, "পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩-৭ নভেম্বরের দিনগুলো আকাশ থেকে হঠাৎ পড়েনি। সব ঘটনারই একটি পটভূমি থাকে। ওই ঘটনাপ্রবাহেরও একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৭৪-এর ১৩ অক্টোবর জাসদ গণ-আন্দোলনের ডাক দেয় এবং ২৬ নভেম্বর দেশব্যাপী হরতালের আহ্বান জানায়। হরতাল ও গণ-আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের প্রচারপত্রে বলা হয়: ‘ভারতের আধিপত্যবাদী, রাশিয়ার সংশোধনবাদী ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সকল চক্রান্ত ও অশুভ প্রভাবের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পূর্ণ বিধানের জন্য; সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় সরকার গঠন।" (সৈয়দ আবুল মকসুদ: প্রথম আলো, ৯/১১/১০)

সাবেক সেনাপ্রধান লে: জে: মাহবুবুর রহমান বলেন, "বাংলাদেশের সেনাবাহিনী পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ায় তৎকালীন সরকার কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেয়; যার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আমাদের অনেক দিন টানতে হয়েছে। সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে সিনিয়র ছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁকে সেনাপ্রধান না করে করা হলো কে এম সফিউল্লাহকে। এটা মন্দ দৃষ্টান্ত। এর ফলে সেনাবাহিনীতে কিছুটা অসন্তোষ দেখা যায়। আরেকটি বিষয় ছিল রক্ষীবাহিনী। আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে রক্ষীবাহিনী থাকতে পারে। কিন্তু তাদের সুযোগ-সুবিধা তো সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি হতে পারে না।" (লে: জে: মাহবুবুর রহমান: প্রথম আলো, ০৭/১১/২০১০)

অন্যদিকে ড: রেজোয়ান সিদ্দিকী লেখেন, "রাষ্ট্র আজ যে সঙ্কটে পড়েছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে তেমনি এক ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র। ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতিতে ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তন। শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম; ভারতীয় মদদে, ভারতীয় প্রশিক্ষণে, ভারতীয় রিজার্ভ পুলিশের পোশাকে গঠিত রক্ষী বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে তখন পিষ্ট হচ্ছিল এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। সেই নিপীড়ন থেকে উদ্ধারের সব পথও রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সংবাদপত্রের তথা মত প্রকাশের সব স্বাধীনতা হরণ করে নেয়া হয়েছিল। একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কেড়ে নেয়া হয়েছিল ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণের অধিকার। কেড়ে নেয়া হয়েছিল চিন্তার স্বাধীনতা। বিচার বিভাগকে নেয়া হয়েছিল শেখ মুজিবের ইচ্ছার অধীন করে। গোটা দেশের মানুষ নিজ ভূমে যেন গৃহবন্দী হয়ে পড়েছিল।" (ড: রেজোয়ান সিদ্দিকী: নয়া দিগন্ত, ০৬/১১/২০০৯)

খালেদ মোশাররফের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও করুন পরিনতি
আগেই উল্লেখ করেছি খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা দখলের নিমিত্তেই মূলত নভেম্বরের নানা ঘটনার উৎপত্তি। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী, লে: ক: আবদুল হামিদ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা আমিন আহমেদ চৌধুরী, লে: জে: মাহবুবুর রহমান, বিশিষ্ট সাংবাদিক সিরাজুর রহমানসহ অনেকের কন্ঠেই অভিন্ন সুর পরিলক্ষিত হয়।

"২ নভেম্বর দুপুর থেকেই সেনানিবাস থেকে ট্রুপস মুভমেন্ট শুরু হল।... ৩ নভেম্বর দিনের মধ্যেই ফারুক-রশীদরা ক্যান্টনমেন্টের সঙ্গে একটা আপোস রফায় আসেন। ...৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে মুশতাকের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালে কর্নেল সাফায়াত জামিলের নেত্বটত্বে একদল সশসস্ত্র সৈনিক সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে সবাইকে হ্যান্ডসআপ করায় এবং মুশতাককে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী বলে গালিগালাজ করতে থাকে। মুশতাক ও তার মণ্ত্রিপরিষদের সব সদস্যকে হত্যা করে ৩২ নম্বর থেকে শুরু করে জেলখানা পর্যন্ত সব হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার হয়মকি দেয়। মুশতাকসহ মন্ত্রিপরিষদের সবারই তখন অত্যন্ত করুণ অবস্থা। তারা তাক করা অস্ত্রের সামনে ভীত ভেড়ার মত কাপতে থাকে। এ সময় জেনারেল খলিলুর রহমান উত্তেজিত সৈনিকদের বোঝানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধমক খান। তবে শেষ পর্যন্ত জেনারেল ওসমানী তাদের নিবৃত্ত করেন। এ সময় খন্দকার মুশতাক উদাসভাবে জিজ্ঞএস করেন, তোমরা আমার কাছে কি চাও" জবাবে তারা জেনারেল জিয়াকে বরখাস্ত করে তার স্থলে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করতে বলে। মুশতাক তাদের এই দাবি মেনে নেন।" (রাজনীতির তিনকাল: মিজানুর রহমান চৌধুরী, পৃষ্ঠা: ১৭২-১৭৩)

"৩ নভেম্বর ভোর রাতে আরো একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে বাংলাদেশে। মোশতাক ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। ২ নভেম্বর রাতে সে নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মোশতাক বঙ্গভবনে যে বৈঠক ডাকেন তাতে হাজির ছিলেন স্পিকার আব্দুল মালেক উকিল, মন্ত্রিসভার সদস্য ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, জেনারেল এম এ জি ওসমানী, আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর। রাত ১টায় বৈঠক শেষ হয়। আড়াইটার দিকে কর্নেল রশিদ এসে প্রেসিডেন্ট মোশতাককে খবর দেন যে বঙ্গভবনে কর্মরত সামরিক প্রহরীদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। খুব সকালে ক্যাপ্টেন নূর এসে মোশতাককে জেনারেল খালেদ মোশাররফের পক্ষ থেকে সাত দফা শর্তের একটা তালিকা দেন। সে তালিকার মূল কথা ছিল, খালেদ মোশাররফের দাবিগুলো মেনে নেয়া হলে সেনাবাহিনী মোশতাককে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখবে। মোশতাক খালেদ মোশাররফের শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি আর রাষ্ট্রপতি থাকতে চান না। তার জবাব নিয়ে ক্যাপ্টেন নূর চলে গেলেন। আরো পরে মোশতাক যখন তার মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশুরুল হকের কামরায় ছিলেন, তখন জেনারেল খালেদ মোশাররফ তাকে ফোন করেন। তিনি এবং বিমান বাহিনীর নবনিযুক্ত প্রধান এয়ারভাইস মার্শাল তওয়াব দাবি করেন, বঙ্গভবনে অবস্খিত শেখ মুজিবের ঘাতকদের আত্মসমর্পণ করতে হবে। কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদ প্রমুখ সংশ্লিষ্ট অফিসাররা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন এবং বলেন তারা তাদের অনুসারীদের নিয়ে খালেদ মোশাররফের সমর্থক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। এই অচলাবস্খার অবসানের জন্য মুক্তিবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওসমানী একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তার মধ্যস্খতায় জেনারেল খালেদ মোশাররফ বিদ্রোহী অফিসারদের বিদেশে নির্বাসনে পাঠাতে রাজি হন। সে রাতে (২ নভেম্বর ১৯৭৫) জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী ডিনারের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। ১টার দিকে বাড়ি ফিরে তারা শুয়ে পড়েন। ঘন্টাখানেক পরই দরোজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দ শুনে জেনারেল জিয়া উঠে গিয়ে দরোজা খোলেন। উপস্খিত খালেদ মোশাররফের প্রতি অনুগত অফিসাররা তাকে বলেন, তাকে গৃহবন্দী করা হচ্ছে। তারা বাইরের ফটক এবং দরোজায় তালা লাগিয়ে দেন। একাধিক অফিসার জিয়াকে পাহারা দেয়ার জন্য বাড়ির ভেতরেই অবস্খান করছিলেন।" (সিরাজুর রহমান: নয়া দিগন্ত, ০৭-১১-২০১০)

"৩ নভেম্বর রাতেই খালেদ মোশাররফকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করা হয়। এই খালেদ মোশাররফ মুক্তিযুদ্ধকালে অসীম সাহসী বীরের ভুমিকা রেখেছিলেন। পরেরদিন ৪ নভেম্বর বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল বুদ্ধিজীবীর নেতৃত্বে একটি নাগরিক শোক মিছিল ধানমন্দি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসে। এ মিছিলে জেনারেল খালেদ মোশাররফের বৃদ্ধা মাতাও ছিলেন। পরদিন এই মিছিলের ছবি খবরের কাগজে ছাপা হলে মুহূর্তে খালেদ মোশাররফ আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। খালেদ মোশাররফের দাবি অনুযায়ী ৫ নভেম্বর খন্দকার মুশতাক বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মাদ সায়েমের কাছে রাষ্ট্রপতির দ্বায়িত্বভার অর্পন করেন। ৬ নভেম্বর সংসদ বাতিল করা হয়। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সাধারন সৈনিক এবং এনসিও ও জেসিও র্যা ঙ্কের অফিসাররা এবারের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়। 'সিপাহী-জনতা ভাই ভাই' এই শ্লোগান দিয়ে ৬ নভেম্বর রাতেই এরা রেডিও স্টেশন দখল করে নেয়। জিয়া তখন সেনানিবাসে গৃবন্দি। এরা জিয়াকে মুক্ত করে। এক পর্যায়ে বঙ্গভবন দখল করে নেয। খালেদ মোশাররফ, মেজর হূদা ও মেজর হায়দার পালাতে গিয়ে সৈনকদের গুলিতে নহত হন। এভাবেই ঘটে গেলো ক্ষমতার আরেক দফা পালাবদল। মুশতাক অপসৃত হলেন। ১৫ আগষ্টের খুনিচক্র দেশছাড়া হলো। যারা এদের দেশছাড়া করল, সেই খালেদ মোশাররফও নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হলেন। ক্ষমতায় আহীন হলেন জিয়াউর রহমান।" (রাজনীতির তিনকাল: মিজানুর রহমান চৌধুরী, পৃষ্ঠা: ১৭১-১৭৪)

"৩ নভেম্বর কর্নেল শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে ও জেনারেল খালেদ মোশাররফের তত্ত্বাবধানে অবৈধ মোশতাক সরকারকে উৎখাত করার জন্য সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হলো। প্রয়াত মেজর ইকবাল (সিলেটবাসী, পরবর্তীকালে মন্ত্রী) বঙ্গভবন থেকে তাঁর প্রথম ই-বেঙ্গল নিয়ে সরে এসে কর্নেল গাফফার বীর উত্তমের নেতৃত্বে বঙ্গভবন ঘেরাও করে মোশতাককে (তখন কেবিনেট মিটিং চলছিল) হেস্তনেস্ত করে (কথিত আছে যে কর্নেল গাফফার খন্দকার মোশতাককে থাপড় মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দেন এবং শাফায়েত জামিল স্টেনগান নিয়ে তেড়ে আসেন। মাঝখানে ওসমানী দাঁড়িয়ে অবস্থান নিয়ন্ত্রণে এনে বঙ্গভবনকে রক্তাক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেন) পদত্যাগ করতে বাধ্য করান এবং প্রধান বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) বানানো হলো। ৫ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করা হলো। ইতিমধ্যে গৃহবন্দী সেনাপ্রধান (৩ নভেম্বর থেকেই গৃহবন্দী) জিয়াউর রহমান ব্রিগেডিয়ার রউফ ও কর্নেল মালেকের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র দেন। ধুরন্ধর মোশতাক পদত্যাগ করলেও ছয় মেজরসহ তাঁদের অন্য সাথিদের নিরাপত্তা বিধানের নিমিত্তে সংলাপ চালিয়ে যান ৩ থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত। এই সময় দেশে কোনো সরকার ছিল না। কেউই কিছু জানতে পারছিল না। সেনাসদরসহ সবাই যখন অন্ধকারে নানা ধরনের গুজবের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখনই ৫ নভেম্বর জেলহত্যার কথা সেনাসদর জানতে পারে।" (আমিন আহমেদ চৌধুরী: প্রথম আলো, ০৭/১১/২০১০)

"৬ তারিখ রাত ১২ টায় সিপাহী বিপ্লবের খবর পেয়ে জেনারেল খালেদ মুশাররফ সঙ্গে সঙ্গে তার প্রাইভেট কার নিয়ে বঙ্গভবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। তার সাথে ছিল কর্নেল হুদা ও হায়দার। খালেদ প্রথমে রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায় যান। নুরুজ্জামান তাকে খাকি ড্রেস পাল্টিয়ে নিতে অনুরোধ করেন। সে তার নিজের একটি প্যান্ট ও বুশ শার্ট খালেদকে পরতে দেয়। ৪র্থ বেঙ্গলে সর্বশেষ ফোন করলে ডিউটি অফিসার লে: কামরুল ফোন ধরে। সে তাকে প্রকৃত অবস্থা অবহিত করেন। এবার খালেদ বুঝতে পারেন অবস্থা খুবই নাজুক। তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমন্টে আশ্রয় গ্রহন করতে যান। প্রথমে নিরাপদেই তার বিশ্বস্ত ইউনিটে আশ্রয় নেন। কমান্ডিং অফিসার ছিলেন কর্নেল নওয়াজিশ। তাকে দেওয়া হয় খালেদের আগমনের সংবাদ। তিনি তাৎক্ষনিক টেলিফোনে টু-ফিল্ডে সদ্যমুক্ত জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার ইউনিটে খালেদ মুশররফের উপস্থিতির কথা জানিয়ে দেন। জিয়ার সাথে জলিলের ফোনে কিছু কথা হয়। কর্নেল আমিনুল হক বলেছেন, তিনি ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং জিয়াকে বলতে শুনেছেন, যেন খালেদকে প্রানে মারা না হয়। যাহোক, ভোরবেলা দেখতে দেখতে সিপাহী বিদ্রোহের প্রবল ঢেউ ১০ম বেঙ্গলে গিয়ে লাগতে শুরু করল। পরিস্থিতি কর্নেল নওয়াজিশের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তারা খালেদ ও তার সহযোগীদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সিপাহীরা তাদের টেনে হিচড়ে বের করে। জানা গেছে মেজর জলিল কয়েকজন উত্তেজিত সৈনিক নিয়ে মেসের ভিতর প্রবেশ করে। তার সাথে একজন বিপ্লবী হাবিলদারও ছিল। সে চিৎকার দিয়ে জেনারেল খালেদকে বলল, 'আমরা তোমার বিচার চাই।' খালেদ শান্ত কন্ঠে জবাব, ঠিক আছে তোমরা আমার বিচার কর। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।' স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার বলল, 'আমরা এখানেই তোমার বিচার করব'। খালেদ ধীরস্থির, বললেন, 'ঠিক আছে তোমরা আমার বিচার কর'। খালেদ দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। ট্যা-র-র-র-র! একটি ব্রাশ ফায়ার! আগুনের ঝলক বেরিয়ে এল বন্দুকের নল থেকে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী খালেদ মোশররফ। সাঙ্গ হল বিচার। শেষ হল তার বর্নাঢ্য জীবনেতিহাস।" (তিনটি সেনা অভ্যত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে: ক: আব্দিল হামিদ)

"বাংলাদেশকে ফের রুশ-ভারত অক্ষশক্তির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার জন্য ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক সামরিক ক্যুদেতা সংঘটিত হয়। ক্যুদেতার নায়করা সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে। তার বন্দিত্ব এবং খালেদ মোশাররফের ক্যুদেতার সংবাদ মুহূর্তে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই সংবাদ রাজধানী নগরী ঢাকার প্রতিটি মানুষকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। সেদিন ঢাকা নগরীর মানুষদের বাকরুদ্ধ অবস্থার একজন প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত যাদের সঙ্গেই আমার সাক্ষাত্ হয়েছে তারা সবাই গভীর উত্কণ্ঠার সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন—এখন দেশের কী হবে? আবারও কি চালের দাম বাড়বে? আবারও কি দেশে দুর্ভিক্ষ হবে, আবারও কি দেশ ভারতীয় আধিপত্যবাদের হিংস্র নখরে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হবে? খালেদ মোশাররফও একজন বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ৩ নভেম্বর তার উচ্চাভিলাষী এই পদক্ষেপের আগ পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষ তাকেও শ্রদ্ধা করত। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতাও ছিল। কিন্তু তিনি তার উচ্চাভিলাষকে গোপন রাখতে পারলেন না। এই উচ্চাভিলাষই তার জন্য কাল হলো। সাহসী মুক্তিযোদ্ধার ভাবমূর্তি মুহূর্তে পরিণত হলো ভিনদেশের সেবাদাসরূপে। তার এই পরিবর্তিত ভাবমূর্তি তাকে ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেল ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে। সেই সময়কার ঘটনাবলীর সঙ্গে যাদের যোগসূত্র ছিল তাদের মুখেই শুনেছি জেনারেল জিয়া তার জীবন রক্ষার জন্য বিদ্রোহী সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষিপ্ত সৈনিকরা তার কথায় কর্ণপাত করেননি। তিনি বেঁচে থাকলে তার জবানবন্দিতেই জানা যেত তার অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য কী ছিল। তার নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের কালের ইতিহাসের একজন সাক্ষী হারিয়ে গেলেন।" (অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ: আমার দেশ, ০৫/১১/২০১১)

ক্ষমতা দখলে কর্নেল তাহেরের কুটকৌশল
নজরকাড়া কিছু দাবী দাওয়ার অন্তরালে জিয়ার কাধে পা দিয়ে ক্ষমতা দখল করাই ছিল কর্নেল তাহেরের মুল উদ্দেশ্য। ৩ নভেম্বর থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ কর্নেল তাহেরের কার্যকলাপ স্পষ্টতই বলে দেয় তাহেরে মুল লক্ষ্য।

"জিয়াকে মুক্ত করার কিছুক্ষন পরেই তাহের টু-ফিল্ড রেজিমন্টে ছুটে আসে। তখন রাত প্রায় ২-৩০ মিনিট। ওই সময় জিয়ার কক্ষে গুটিকয় অফিসার: কর্নেল আমিনুল হক, মেজর মহীউদ্দীন, মেজর জুবায়ের সিদ্দীক, মেজর মুনীর, সুবেদার মেজর আনিস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জিয়া ও তাহের উভয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করলেন। জিয়া বললেন, তাহের তোমাকে ধন্যবাদ, আমাকে বাচিয়েছো। তাহের বলল, আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। এদিকে আসুন প্লিজ, তাহের তাকে নিয়ে কক্ষের একটি নিভৃত কোণে গেল। বহুক্ষন ধরে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলতে থাকল। একসময় তাদের মধ্যে বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুরু হল। এক ফাকে জিয়া বারান্দায় এসে সুবেদার মেজর আনিসকে কানে কানে বললেন, আনিস সাহেব ওকে কোনভাবে সরিয়ে দিন এখান থেকে। সাবধান বহু পলিটিক্স আছে। তাহের জিয়াকে টু-ফিল্ড থেকে বের হয়ে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যেতে চাইছিল। জিয়া যেতে রাজি হন নি সংগত কারনেই। সাধারন সৈনিকদের ধারনা ছিল জিয়াকে মুক্ত করার পরপরই সিপাহী-বিদ্রোহ শেষ হয়ে যাবে। তারা ব্যারাকে ফিরে যাবে,কিন্তু বাইরের বিপ্লবী সৈনিক ও বিপ্লবী নেতাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ছিল ভিন্ন, অনেক গভীর। সমস্ত প্লান-প্রোগ্রামই ছিল সাধারন সৈনিকদের এবং বিপ্লবী তাহের গ্রুপের। শত শত সৈনিকদের পদভারে টু-ফিল্ড রেজিমেন্ট তখন প্রকম্পিত। এদের মধ্যে বহু সৈনিক দেখা গেল এলোমেলো খাকি ড্রেসে। পায়ে ছিল বুটের বদলে সাধারন জুতা। অনেকের মাথায় টুপিও নাই। এরাই ছিল জাসদের বিপ্লবী সংস্থার সদস্যবৃন্দ। সিপাহী বিদ্রোহের রাতে খাকি উর্দি পরে তারা মিশে গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের সাধারন জোয়ানদের সাথে। উপস্থিত শত শত সৈনিকদের মধ্যে কে বিপ্লবী সৈনিক, কে আসল সৈনিক বুঝা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তারাই অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছিল। টু-ফিল্ডে বসেই জিয়া বেতার ভাষন দিলেন। টু-ফিল্ডের অফিসেই রেডিও রেকর্ডিং ইউনিট এনে জিয়ার একটি ভাষন রেকর্ড করা হল ভোর বেলা প্রচার করার জন্য। সংক্ষিপ্ত ভাষনে জিয়া ঘোষনা করেন, তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দ্বায়িত্বভার হাতে নিয়েছেন। দেশের এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অনুরোধে তিনি এই কাজ করেছেন। তিনি সবাইকে এই মুহূর্তে শান্ত থেকে নিজ নিজ দ্বায়িত্ব পালন করার আহবান জানান। তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া অফিস-আদালত, বিমানবন্দর, মিল-কারখানা পুনরায় চালু করার অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ আমাদের সহায়। (তিনটি সেনা অভ্যত্থান ও কিছু না বলা কথা: লে: ক: আব্দিল হামিদ)

"জাসদের উদ্দেশ্য ছিলো রাজনৈতিক শ্রেনীহীন সমাজ প্রতিষঠা, যদিও কর্নেল তাহেরের লক্ষ্য ছিলো অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল। তাহের সৈনিকদের ১২ দফা দাবী প্রনয়ন করে। এগুলোর মধ্যে ছুলো: ব্যাটম্যান প্রথার বিলুপ্তি, অফিসার ও সৈনিকদের মধ্য এ ব্যবধান দূর, সৈনকদের মষহ্য থেকে অিসার নিয়োগ, সৈনিকদের বেতন বৃদ্ধি, বাসস্থান ব্যবস্থাকরন, দুর্নীতিবাজ অফিসারদের অপসারন, রাজবন্দীদের নুক্তি। বিপ্লবি সৈনিকদের অন্যতম লক্ষ্য ছিলো বিপ্লবের মাধ্যমে ১২ দফা বাস্তবায়ন। তাহেরের মতে, জিয়ার সাথে আগেই এসব বনিয়ে সমঝোতা হয়েছিলো। তাহের ভেবেছিলো সে-ই অধিক বুদ্ধিমান, জিয়াকে ব্যবহার করে সে ক্ষমতায় আরোহন করতে চেয়েছিলো। কিন্তু তার সেই ক্যালকুলেশন ভুল হয়েছিলো।" (তিনটি সেনা অভ্যত্থান ও কিছু না বলা কথা: লে: ক: আব্দিল হামিদ, পৃষ্ঠা: ১২৬)

"৭ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে আবার টু-ফিল্ডে গেলাম জিয়ার কাছে। বারান্দায় উঠতেই দেখি একটি কক্ষে বসে আছে কর্নেল তাহের। মুখ তার কালো, গম্ভীর, ভারী। জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার তাহের? তুমি এতো গম্ভীর কেন? বললো, স্যার আপনারা কথা দিয়ে কথা রাখবেন না। মন খারাপ হবে না? আমি তার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। কর্নেল আমিন মুচকি হেসে আমাকে বারান্দায় টেনে নিয়ে গেল। বললো, বুঝলেন না স্যার! ব্যাপারটা তো সব তাহেরের লোকজন ঘটিয়েছে, এখন জিয়াকে মুঠোয় নিয়ে বারগেন করছে। এখন তো সে জিয়া মেরে ফেলতে চায়। এতক্ষনে বুঝলাম 'ডালমে কুছ কালা হ্যায়।" (তিনটি সেনা অভ্যত্থান ও কিছু না বলা কথা: লে: ক: আব্দিল হামিদ)

"৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের অনুসারীরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে, এটা ঠিক। তাঁরা চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমানকে দিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্য সফল করবেন। তাহেরের অনুসারীরা প্রচলিত সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে বিপ্লবী ধারায় একটি বাহিনী গঠন করতে চেয়েছিলেন।"(কে এম শফিউল্লাহ: প্রথম আলো, ০৭/১১/২০১০)

"অনেকেই মনে করেন, খালেদ-শাফায়েত গোড়ায় গলদ করে বসেছিলেন।সেনাদের ভেতর জিয়ার ইমেজ ঈর্ষণীয় পর্যায়ে ছিল। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়ার ভারী গলায় ঘোষণা সেনাসহ সর্বস্তরের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ফলে তাঁর একটা আলাদা ইমেজ ছিল। কর্নেল আবু তাহের এই সুযোগ আগ বাড়িয়ে গ্রহণ করেন। তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যোগাযোগ সব সময়ই ছিল। কর্নেল তাহের রুশ বিপ্লবের তারিখকে স্মরণ করে তাঁর বিপ্লবের তারিখ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন ৬-৭ নভেম্বর রাত ১২টায়। এর মধ্যে নভেম্বরের অভ্যুত্থান তাঁকে সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়। তাহের তার আগ থেকে ওসমানী, জিয়া ও খালেদের মধ্যে জিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর বিপ্লবের নায়ক হিসেবে। জিয়াকে গৃহবন্দী থেকে উদ্ধার করতে হবে—এই দাবি সামনে নিয়ে এসে ক্যান্টনমেন্টে সেনা ও সিভিল কর্মচারী-কর্মকর্তাদের একত্র করেন তিনি। সঙ্গে রাখেন সৈনিকদের ১২ দফা দাবি। রাত ১২টায় প্রথম গোলাগুলি শুরু হয়।" (আমিন আহমেদ চৌধুরী: প্রথম আলো, ০৭/১১/২০১০)

অফিসার নিধনের মুল ভুমিকা ছিল কর্নেল তাহের বাহিনীর
মুলত তাহেরের বিপ্লবী বাহিনীর বিভিন্ন ধরনের প্রচারনার ফলে সিপাহীদের মাঝে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কয়েকজন লেখকের কথায় পরিষ্কার বুঝা যায় তাহের বাহিনী পুরো সেনানিবাসে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করে অফিসার নিধনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়।

"সন্ধা নামার সাথে সাথে এক অজানা আতঙ্ক সারা ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে পড়ল। টু-ফিল্ডের আশেপাশে বিভিন্ন রকমের সৈনিকরা এখানে ওখানে জটলা করছিল। আশে পাশে সৈনিকরা অস্ত্র কাধে ঘোরাফেরা করছে। রাস্তায় দেখি বেশ কিছু অফিসার গাড়ি করে, রিক্সা করে ফ্যামিলি নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাস্তা ঘাট সন্ধ্যার আগেই একেবারে ফাকা হয়ে গেল। প্রকৃতপক্ষে ঐ মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্টে কমান্ড কন্ট্রোল আর ডিসিপ্লিন বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। বিপ্লবীদের প্রপাগান্ডা, হাজার হাজার বিপ্লবী লিফলেটস্ ইত্যাদির প্রভাবে ইতোমধ্যে সাধারন সৈনিকদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে লক্ষ্য করলাম। তারা অফিসারদের প্রতি অবজ্ঞাভরে তাকাচ্ছিল। ৪র্থ বেঙ্গল এবং টু-ফিল্ড রেজিমন্টের কিছু বিশ্বস্ত অফিসার জেসিও এবং সৈনিক জেনারেল জিয়াকে আগলে রেখেছিল। কিছুক্ষন পরেই সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বেঙ্গল ল্যান্সারের ট্যাঙ্কের ঘড়ঘড় শব্দ শোনা গেল রাস্তায়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের লাইনে পৌছে মেজর নাসের ও মেজর গাফফারকে তাদের হাতে তুলে দিতে চাপ প্রয়োগ করল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্নেল আমিন, মেজর মুনীর ও সৈনিকেরা অফিসারদের তাদের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করল। আফিসারদ্বয় বেচে গেলেন। রাত আনুমানিক ১২টা। হঠাৎ গেটে তুমুল চিৎকার হট্টগোল। তারা নিচতলায় কর্নেল শামসের বাসায় আক্রমন করে বসল। শামসরা সবাই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেছেন। তারা উপর তলায় উঠে আসল। তারা একেবারে আমার বেডরুমের দরজায় পৌছে হাকা-হাকি করে দরজা খুলতে বলল। আমার স্ত্রী আমাকে থামিয়ে বলল দাড়াও আমিই যাব, বলেই সে একেবারে আক্রমনকারীদের সম্মুখে এসে দাড়ালো। লেডিজ দেখে বিপ্লবীরা প্রথমে থতমত খেয়ে গেল। রক্তপাগল সৈনিকরা আমার স্ত্রীকে গুলি করতে পারে ভেবে আমি নিজেই তাড়াতাড়ি দরজার পিছন থেকে বেরিয়া এলাম। একজন সিপাহী গুলি করার জন্য রাইফেল তুলতেই সমুজ আলী ও অনুগত সিপাহীরা তাকে জাপটে ধরল। ঐ বেটাই ছিল লিডার। মনে হল তারা ভিন গ্রহের বিপ্লবী সিপাহী। বাকি দু-তিন জনকে সামসের সিগন্যাল ইউনিটের মনে হল। যাহোক আমরা কোনরকম এযাত্রায় বেচে গেলাম।(তিনটি সেনা অভ্যত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে: ক: আব্দুল হামিদ)

৭/৮ নভেম্বর ঐ বিভীষিকাময় রাত্রে গভীর অন্ধকারে উম্মাদ সৈনিকরা অফিসারদের রক্তের নেশায় পাগল হয়ে উঠল। ঘটে গেল বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড। সৈনিকরা মেজর করিম, মেজর আজিম, মিসেস মুজিব ও মিসেস ওসমানকে গুলি করে হত্যা করে। মেজর মুজিব প্রান নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়। টিভি ভবনে তিনজন অফিসার মারা পড়ে। উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকরা দলবেধে প্রায় প্রতিটি অফিসার্স কোয়ার্টারে হামলা চালায়। ভীতসন্ত্রস্ত অফিসাররা প্রাণ রক্ষার্থে বাসা ছেড়ে অন্ধকারে পেছনের পানির ডোবায়, ঝোপ-জঙ্গলে আত্মগোপন করে সারারাত কাটায়। ১২ জন অফিসার মারা পড়ে ঐ রাতে। ঐ রাতে বিপ্লবী সৈনিকরা সত্যি সত্যি অফিসারদের রক্ত নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিল। ভাগ্যিস অধিকাংশ অফিসার ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে সন্ধ্যার আগেই শহরে তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়। সিপাহীগণ কতৃক আপণ অফিসারদের উপর হামলা এর আগে কস্মিনকালেও ঘটেনি! এসব অবিশ্বাস্য ঘটনা।(তিনটি সেনা অভ্যত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে: ক: আব্দিল)

খালেদ মোশাররফের বিশ্বাসঘাতকতা
১৫ আগস্টের পর থেকেই খালেদ মোশাররফ ক্ষমআ দখলের উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে ওঠে। যে কোন উপায়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে উৎখাত করে ক্ষমতার মসনদে আরোহন করাই ছিল খালেদের অদ্বতীয় উদ্দেশ্য। তিনি নানাভবে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই বাংলাদেশের অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের সূচনাকারী।

"কিছুদিন পর একদিন জেনারেল জিয়া জানালেন, তার কাজে অন্তরায় সৃষ্টি করছে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিল। তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে কিছু বাকশালপন্থি অফিসার। ব্রিগেডিয়ার খালেদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু ভীষন উচ্চাভিলাষী। তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য অতি কৌশলে যুদ্ধের সময় থেকেই তিনি তার শক্তি এবং প্রভাব বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা করে আসছিলেন। মুজিব সরকার এবং বাকশালীদের সহানুভূতিও ছিল তার প্রতি। আচমকা বাকশাল সরকারের পতনের ফলে তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তাই তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যে কোন উপায়েই তার পরিকল্পনা কার্যকরি করে তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে। তার এই হীন চক্রান্তমূলক কার্যকলাপ থেকে তাকে কিছুতেই নিরস্ত্র করতে পারছিলেন না জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৫ আগস্ট পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে আগস্ট বিপ্লবের পূর্ব অবস্থায় দেশকে নিয়ে আযাবার এক গভীর ষড়যন্ত্রের সূচনা ঘটানো হল ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপর্টেও এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যেতে লাগল। ব্রিগেডিয়ার খালেদের প্রধান উস্কানিদাতা ছিল কর্নেল শাফায়াত। ব্রিগেডিয়ার খালেদের মোশাররফ এবং কর্নেল সাফায়াত জামিলের ঐদ্ধত্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। জেনারেল জিয়ার প্রায় সব নির্দেশই উপেক্ষা করে চলেছেন তারা। প্রতি রাতেই মধ্যস্থতার জন্য ছুটে যেতে হচ্ছে তাদের বিরোধের মীমাংসা করার জন্য। সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীন অবস্থাকে ভীষণভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন তারা। ক্রমান্বয়ে আর্মির chain of command-কে অকেজো করে তুলেছে CGS ব্রিগেডিয়ার খালেদ এবং ঢাকা Brigade Commander কর্নেল শাফায়াত জামিল। জেনারেল জিয়া তাদের হাতে প্রায় জিম্মি হয়ে পড়লেন। চিফ অফ আর্মি স্টাফ হিসেবে তার দৈনন্দিন কার্যক্রমেও বাধা সৃষ্টি করতে লাগলেন। " (যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি: লে কর্নেল (অব) ডালিম, পৃষ্ঠা: ৫০১, ৫০৮, ৫১০)