Tuesday, September 17, 2013

সিরিয়ায় চলমান সমস্যা প্রসঙ্গে

মোহাম্মদ জমির
গত কয়েকদিনে সিরিয়ায় যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা পরিস্থিতি বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে আগস্টের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের রাসায়নিক অস্ত্র তদন্ত কমিটির সিরিয়া থেকে প্রস্থানের মাধ্যমে। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার মানসিকতা দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

সিরিয়ায় বেসামরিক গণহত্যার ব্যাপারে সারাবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং এব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৃথকীকরণের ব্যাপারে বড় ধরনের জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। সিরিয়া বিষয়ে আন্তর্জাতিক বৈঠক হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল তা হয়নি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন সশস্ত্র হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে তার পূর্ব সমর্থন পুনরায় বিবেচনা করেছেন। সিরিয়া শাসনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সকল শাস্তিমূলক কার্যক্রমের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাখ্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ব্যাপারে পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছে। জার্মানী ও কানাডা সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকায় সমাধানটি আরো সহজ করে দিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অধিকাংশই ওবামা কর্তৃক কোনো নির্বাহী আদেশের পূর্বে তারা তাদের মত প্রকাশের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন চায়। কমান্ডার-ইন চীফ হিসেবে বারাক ওবামা কংগ্রেসের অংশগ্রহণ ছাড়াই যেকোন সামরিক হামলা পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখেন; কিন্তু তিনি দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করেছেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন, আমেরিকার জনগণ এখন "যুদ্ধ-ক্লান্ত" এবং তারা তার কাছে "নিজ জাতি গঠনে" বেশি মনযোগ আশা করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্টার যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সিরিয়ায় একতরফা সশস্ত্র হামলার ব্যাপারে সতর্কবাণী দিয়েছেন।

৯ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসের পুনর্মিলনে প্রেসিডেন্ট ওবামা কংগ্রেসীয় ক্ষমতায়নের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। এরপর থেকে ঘটনা তার আপনগতিতেই চলছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরির সাংবাদিকদের দেয়া এক বিবৃতির মধ্যে বিশেষজ্ঞরা শান্তির সম্ভাবনা দেখতে পান। তিনি বলেন, যদি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ সব ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র হস্তান্তর করে তাহলে সামরিক হামলার কোন প্রয়োজন নেই। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্জে ল্যাভরভের কার্যকরী পরামর্শ মস্কোতে অবস্থানরত সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ মোয়াল্লেমকে দারুণ প্রভাবিত করেছে। তিনি সদ্য সমাপ্ত জি-২০ সম্মেলন সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য এসেছিলেন। ল্যাভরভ বিশ্বাস করেন, "শুধু রাসায়নিক অস্ত্রসমূহ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করা নয়, বরং তাদের পরবর্তী ধ্বংস কার্যকলাপের ব্যাপারে যেন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সে ব্যাপারে মোয়াল্লেমকে পরামর্শ দেন। তিনি মোয়াল্লেমকে বলেন, সিরিয়ার এখন সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক অস্ত্র সংক্রান্ত কনভেনশনে যোগদান করা প্রয়োজন । জবাবে মোয়াল্লেম দোভাষীর সাহায্যে সাংবাদিকদের জানান, সিরিয়া এপদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে এবং "তার দেশের জনগণকে আমেরিকার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার প্রবৃত্তি" দেখানোর জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান।

ওয়াশিংটন-এর প্রতিবেদনে জানা যায়, ওবামা সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রস্তাবটি বিবেচনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, যদি সিরিয়া তার সব রাসায়নিক অস্ত্রসমূহ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করে তবে সিরিয়াতে সামরিক হামলার প্রয়োজন পড়বে না। আসলে কী ধরনের ও মানের রাসায়নিক এবং কোথায় আছে সে ব্যাপারে যাতে সিরিয়া সরকার সঠিক তথ্য দেয় এবিষয়ে ওবামা সংশয় প্রকাশ করেছেন। এসব তথ্য জাতিসংঘ পরিদর্শক কর্তৃক যাচাই করার একটি ঘোষণাও তিনি দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, জাতিসংঘ কাজটি করার সময় সিজফায়ার করার সংকেত বা নির্দেশ ব্যবহার করতে দেয়া হবে কী না? ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একে সমর্থন জানিয়েছে এবং জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বান কি মুন সিরিয়ায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জায়গা নির্ধারণ করতে আহ্বান জানান, তিনি বলেন, "সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রসমূহ দ্রুত হস্তান্তরের জন্য আমি নিরাপত্তা পরিষদকে সুপারিশ করেছি এবং রাসায়নিকসমূহ সিরিয়ার অভ্যন্তরে নিরাপদে মজুদ করে ধ্বংস করে ফেলা হোক"। তিনি আশা করেন, এর মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদের "অস্বস্তিকর পক্ষাঘাতগ্রস্ততা" কাটবে।

ওবামা সি এন এন-এর এক প্রশ্নের জবাবে রাশিয়ার উদ্যোগকে "সম্ভাব্যরূপে ইতিবাচক উন্নয়ন" বলে অভিমত দেন। এন বি সি তে বলেন, এটি একটি "উল্লেখযোগ্য সাফল্য"। তিনি পি বি এস কে আরো বলেন, আমি কেরিকে রাশিয়ার সাথে সরাসরি বৈঠকে বসতে বলেছি এবং আমরা আমাদের সব ধরনের কূটনৈতিক বিষয়াবলী প্রয়োগ করব। আমরা জানি গত কয়েকদিন কেরি এবং লেভরভের মধ্যে জেনেভায় এ সংক্রান্ত বৈঠক হয়েছে এবং দুই দলই এ সমস্যার ব্যাপারে কিছুটা অগ্রসর হতে পেরেছে। এমন একটি ফর্মূলা দরকার যাতে আন্তর্জাতিক সমাজে "যাচাইকৃত ও প্রয়োগযোগ্য নির্মাণকৌশলের মাধ্যমে সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যাপারটি সমাধান করা যায় এবং আমি সবসময় এর পক্ষপাতি"। 

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হলেন্ডে, যিনি ইরাক যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি বলেন, ওবামা মূলত স্পষ্টভাবে সামরিক হস্তক্ষেপকেই সমর্থন করেছেন। এটি সিরিয়া বিরোধীদের আরো সমস্যায় ফেলেছে এবং আসাদ কর্তৃক ২১ আগস্ট-এর রাসায়নিক হামলার বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ এসেছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ পরিদর্শকরা নেদারল্যান্ডে রাসায়নিক সমরাস্ত্রের তদন্তে বিভিন্ন সাইটে নমুনগুলো নিয়ে তারা বিশ্লেষণ করেছেন। নমুনাগুলো ইউরোপের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। তদন্ত পরিচালনাকারী সংস্থা জানায়, সম্পূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। এর প্রতিটি বিষয় তদন্ত কাজকে ত্বরান্বিত করছে। ইতিমধ্যে গতকাল তদন্তকারী সদস্যরা বান কি মুনের নিকট একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট জমা দিয়েছে। 

সিরিয়া সরকার হামলার দায় অস্বীকার করে বর্বরতার জন্য বিদ্রোহীদের দোষী করছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদ বলেন, তার দেশের বিরুদ্ধে যে কোন পশ্চিমা "আগ্রাসন" প্রতিহত করা হবে; কিন্তু রাশিয়া, সিরিয়া আসলেই বিদ্রোহীদের উপর রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে মর্মে জাতিসংঘের প্রমাণের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। পুটিন স্পষ্ট বলেছেন, সিরিয়া সরকার এ ধরনের হামলার মাধ্যমে বিরোধীদের খেপানোটা সম্ভবপর নয় কারণ তাহলে এটা হবে "চরম বোকামির" দৃষ্টান্ত। এটা অবশ্যই বলতে হয়, সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মৈত্রী রাশিয়া আগেও সতর্ক করেছে যে "জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে যেকোন এক তরফা সামরিক হামলা" মূলত "সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন"। পশ্চিমাদেরকে পুনরায় বলা হয়েছে, পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে যে, তাদের বর্তমান অবস্থান জাতিসংঘের আগের অবস্থানের সঙ্গে এখনও এক। ইহা উল্লেখ্য যে পূর্বে জাতিসংঘে সিরিয়ার দুইটি খসড়া সিদ্ধান্তে চীনসহ রাশিয়া, মস্কো ভেটো প্রদান করে। বিশেষত চীন মন্তব্য করে, সিরিয়াতে কোন হামলা হলে তা হবে "বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন" এবং বিশ্বের এটা স্মরণ করা উচিত যে, ইরাকে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত অস্ত্রের অভিযোগে যেটা কীনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। 

তুর্কী ও জর্দানে বর্তমানে প্রায় দশ লক্ষ সিরিয় শরণার্থী অবস্থান করছে। এক লক্ষের অধিক সিরিয়ার নাগরিক এই গৃহযুদ্ধে মারা গেছে। এর ফলে তাদের নিজেদের দেশে চাপ বাড়ছে। এক ন্যক্কারজনক পরিস্থিতিতে একমাত্র লাভবান হচ্ছে ইসরায়েল। সবার দুশ্চিন্তার বিস্ময় হলো- ফ্রান্স কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কেউই জানে না রাসায়নিক অস্ত্রগুলো সিরিয়ার কোন অঞ্চলে মজুদ রয়েছে। এতে হামলা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ফলে বেসামরিক লোকজনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।

বর্তমান সহিংসতার ফলে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে এখন সৌদি আরব ও আল কায়েদা সমর্থিত সুন্নীগোষ্ঠীরা ও অন্যদিকে আছে সিয়া ও হিজবুল্লাহ সমর্থিত দলগুলো। আসাদ সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা সতর্ক করে দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, সিরিয়াতে কোন হামলার অর্থ আল কায়েদা ও এর সদস্যদের সমর্থন দেয়া। যেখানে সিরিয়া এবং ইরাক দুইটি ইসলামী রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে পশ্চিমা সন্ত্রাসবাদের কল্পরাজ্য ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান, সিরিয়া পদক্ষেপ নিবে। রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ যে কোন রাসায়নিক হামলার বিরুদ্ধে। এছাড়াও সচেতন সদস্যদের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বেসামরিক লোকজন অহেতুক ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবে।

ভাষান্তর : আকলিমা জান্নাত আরজু

লেখক :সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

No comments:

Post a Comment

Thanks for visiting.