Thursday, September 27, 2012

The Daily Ittefaq | প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এগোচ্ছে এশিয়া | News




লেখক: প্রীতিকাব্য  |  বৃহস্পতিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১২, ১২ আশ্বিন ১৪১৯
পশ্চিমাদের কাছ থেকেকল্যাণরাষ্ট্র ধারণা ধার করেছে এশিয়া তবে পশ্চিমারা কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রজ হলেও অনুজ হিসেবে এশিয়া ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে পশ্চিমা দেশগুলোতে কাগজে-কলমে কল্যাণরাষ্ট্রের সব সুবিধার কথা উল্লেখ রয়েছে বাস্তবে তা নামমাত্র চলছে তবে এশিয়ার যেসব দেশ ব্যবস্থা নিয়েছে তারা নামে নয়, কাজেই সে সব সুবিধা দিতে শুরু করেছে তাদের নাগরিকদের অঞ্চলেই প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবেএমনটাই আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা
এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে এখানকার অর্থনীতির অবস্থা অনেক বেশি ভালো তাই বিভিন্ন দেশ তার নাগরিকদের কল্যাণরাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কাজ করতে গিয়ে তারা যাতে পা পিছলে না পড়ে, সে জন্য পশ্চিমাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজে নেমেছে অঞ্চলের মানুষ আর্থিক দৈন্য-দশা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে নাগরিকদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন মানে একটি দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো অবস্থানে পৌঁছানো যখন কোনো দেশ অথনৈতিক দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তখন সরকারের কাছে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা চাইতেই পারে দেশটির জনগণ কারণে এশিয়ায় দিন দিন অবসরভাতা, জাতীয় স্বাস্থ্য-বীমা, বেকারভাতা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা নাগরিক-সুবিধার চাহিদা বাড়ছে মূলত কল্যাণরাষ্ট্রের নাগরিকরা ধরনের সুবিধাদি পেয়ে থাকে সরকারের কাছ থেকে ফলে অঞ্চলের গতিশীল অর্থনীতির দেশগুলো সম্পদ গড়ার সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে
গতবছর ইন্দোনেশিয়া সরকার অঙ্গীকার করেছে২০১৪ সাল থেকে নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য-বীমা চালু করবে, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে গত দুই বছরে চীন তাদের অবসরভাতার আওতায় গ্রামীণ এলাকার ২৪ কোটি লোককে অন্তর্ভুক্ত করেছে, সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা অবসরভাতা কার্যক্রমের আওতায় থাকা মানুষের চেয়ে বেশি অথচ কয়েক বছর আগেও চীনের গ্রামীণ এলাকায় ৮০ শতাংশ মানুষের কোনো স্বাস্থ্য-বীমা ছিল না ভারত সরকার দেশটির প্রায় চার কোটি পরিবারকে বছরে অন্তত ১০০ দিন কাজের ব্যবস্থা করে দেবে ন্যূনতম///// বেতনে এবং ১১ কোটি দরিদ্র মানুষকে নতুন করে স্বাস্থ্য-বীমার অর্ন্তভুক্ত করেছে তারা এই সংখ্যা আমেরিকায় বীমার বাইরে থাকা মানুষের দ্বিগুণ
ধনী দেশগুলো যেখানে বাজেটের ঘাটতি দূর করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে বীরদর্পে ক্ষেত্রে কী কী কাজ এড়িয়ে চলা উচিত, সে শিক্ষা এশিয়া নিয়েছে ইতিহাস থেকে মূলতমৌলিক নিরাপত্তার চাহিদা পূরণধারণা থেকে ইউরোপে কল্যাণরাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল কিন্তু সময়ের আবর্তে এটা তাদের জন্যবোঝাবাফ্যাশনঅনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধ আর হতাশার কারণে ইউরোপীয় সমাজের মধ্যে সম্পদের পুনর্বণ্টন করা হয়েছে এমন অবস্থায়ও এক শ্রেণীর লোক রাষ্ট্রের বাড়তি সুবিধা ভোগ করছে ফলে রাষ্ট্রের পক্ষে ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে তারা সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে নাগরিকদের অবসরভাতা, স্বাস্থ্যসেবা স্বাস্থ্য-বীমা দেয়ার অঙ্গীকারসহ বেশ কয়েকটি ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে কারণে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে প্রয়োজনীয় ব্যয়নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে গরিবের জন্য অবসর স্বাস্থ্য ভাতার ব্যবস্থা না করে শহুরে শ্রমিকদের জন্য তা করা হয়েছে ব্রাজিলের সরকারি ব্যয় উন্নত দেশের ধাঁচে হলেও জনসেবা তৃতীয় বিশ্বের ধাঁচে
১৮৮০ সালে জার্মানি অবসর ভাতা চালু করে তবে ব্রিটেন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করে ১৯৪৮ সালে অর্থাত্ ইউরোপে কল্যাণরাষ্ট্র প্রবর্তন হয়েছে অর্ধ শতাব্দীরও আগে এশিয়ার কিছু দেশে এই চর্চা শুরু হয়েছে মাত্র এক দশক আগে কাজ করতে গিয়ে যদি তারা কোনো ভুল করে, বিশেষ করে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে, তাহলে গতিশীল অর্থনীতির দেশগুলো ধসে পড়বে কিন্তু এশিয়ার দেশগুলো  জনগণের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে শুধু  জীবনযাত্রার মানই উন্নত হবে না, নিজেদের অনুকরণীয় মডেল হিসেবে দাঁড় করাতেও পারবে তারা

The Daily Ittefaq | বস্তিতে আগুন ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস | News



বস্তিতে আগুন ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২, আশ্বিন ১৪১৯

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বেগুনবাড়ি খাল হাতির ঝিল রাস্তা সংলগ্ন একটি বস্তিতে আগুন লাগে গত বৃহস্পতিবার ইহাতে ছয় শতাধিক বাড়িঘর ভস্মীভূত হয় আহত হন অর্ধ শতাধিক মানুষ তবে এখন পর্যন্ত কোন নিহতের খবর পাওয়া যায় নাই এই অগ্নিকান্ডে দেড় সহস্রাধিক বস্তিবাসী গৃহহীন হইয়াছেন তাহাদের আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ফায়ার বিগ্রেডের লোকজন প্রাথমিকভাবে গ্যাসের চুলার আগুন অথবা শর্ট সার্কিট হইতে এই আগুনের সূত্রপাত বলিয়া ধারণা করিতেছেন তবে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হইতে জানা যায়, দ্বিতল তিনতলা টিনের বাড়ি ঘেঁষিয়া তৈরি একটি পোশাক কারখানার পাশে ঝুটের স্তূপে আগুন লাগিলে তাহা দ্রুত টিনের বাড়িতে ছড়াইয়া পড়ে অতঃপর গ্যাসলাইনের সংস্পর্শে আসিয়া তাহা আরও তীব্র আকার ধারণ করে যেভাবেই আগুন লাগুক না কেন এই ঘটনাটি দুঃখজনক ইহাতে দরিদ্র বস্তির মানুষ নিঃস্ব হইয়া পড়িয়াছেন এখন তাহাদের পুনর্বাসনে যথাসম্ভব সকল কিছুই করিতে হইবে

বেগুনবাড়ি বস্তির একজন বাসিন্দার অভিযোগ হইল, জমি দখল করিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরাইয়া দেওয়া হইয়াছে এই অভিযোগ সত্য কিনা আমরা জানি না তবে এই রাজধানীর বুকে এমনতর ঘটনা যে ইতোপূর্বে অনেক ঘটিয়াছে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই সাধারণত ঢাকায় যেসব বস্তি আছে তাহার অধিকাংশই গড়িয়া উঠিয়াছে সরকারি বা কোন প্রতিষ্ঠানের জমির উপর তাহার পর দখলদারি বজায়, সাময়িক অর্থনৈতিক লাভ, প্রান্তিক মানুষের আবাসনের চাপ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া বস্তি গড়িয়া তোলা হইলেও একসময় নানা কারণে এই জমি উদ্ধার করা কঠিন হইয়া পড়ে বস্তির জমির মালিকানা নিয়াও দেখা দেয় দ্বন্দ্ব বিবাদ তখন প্রতিপক্ষ গ্রুপ বা একক মালিকানা দাবিকারী ব্যক্তি জমি উদ্ধারের স্বার্থে বস্তিতে আগুন লাগাইয়া দেয় বা দিতে পারে ইহাতে অসহায় বস্তিবাসীর অনেকেই হতাহত হয় এবং জীবনের শেষ সম্বলটুকু হারাইয়া পথে বসিয়া যায় খোলা আকাশের নিচে বসবাস করিয়া তাহারা মানবেতর জীবন যাপন করে

বেগুনবাড়ির যে বস্তিটি আগুনে ভস্মীভূত হইয়া গেল, সেইখানে যাহারা বসবাস করিতেন তাহাদের অধিকাংশই গার্মেন্টস শ্রমিক গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক এক্ষণে দেশের প্রধান রফতানি শিল্প হইলেও আমরা ইহার শ্রমিকদের জীবন মানোন্নয়নের ব্যাপারে সত্যিই উদাসীন ইহাছাড়া বস্তিতে থাকে রিক্সাচালক, কাজের মহিলাসহ বিভিন্ন শ্রেণীর নিম্নআয়ের মানুষ কর্মজীবী এইসব মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নে বা তাহাদের ন্যায্য অধিকার প্রদানে আমরা বরাবরই অনাগ্রহী তাই এই সমস্যার কোন কুল-কিনারা হইতেছে না

বস্তুত বস্তি এলাকা ঘনবসতি সংকীর্ণ হওয়ায় নানা দিক দিয়াই ইহা ঝুঁকিপূর্ণ এখানে যেভাবে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ লাইন দেওয়া হয় তাহা বিপজ্জনক অনেক সময় এই লাইন দেওয়া হয় চোরাই পথে ফলে বিপদের আশংকা সব সময়ই থাকে তাহাছাড়া বস্তিগুলি মাদকের বিস্তার, নানা অপরাধমূলক অসামাজিক কর্মকান্ডের জন্য পরিচিত এগুলি সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের অনুকূল নহে এইভাবে বস্তিগুলিকে ঝুঁকিমুক্ত না করিতে পারিলে এইখানে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিতে থাকাই স্বাভাবিক এই ব্যাপারে সকলেরই এখন সতর্ক সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কোন্নয়নে অংশীদারি সংলাপ



লেখক: মুহাম্মদ রুহুল আমীন  |  বৃহস্পতিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১২, ১২ আশ্বিন ১৪১৯


বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সংহতিকরণের লক্ষ্যে গত ১৯ ২০ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে দুদেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে অংশীদারি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক মানচিত্রে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এমন এক সংলাপ সভা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কি প্রভাব বিস্তার করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বৈঠকের সুবিধাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ কিভাবে তার পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে তার নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন
প্রথমেই জানা দরকার সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অংশীদারি সংলাপের পটভূমি গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে মে তারিখে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারি সংলাপের যৌথ ঘোষণা (Joint Declaration on Bangladesh US Partnership Dialogue) স্বাক্ষরিত হয় ফলে উভয় দেশ প্রতিবছর দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল বিষয় অংশীদারি সংলাপে অন্তর্ভুক্ত করে বলিষ্ঠ, গতিময়, সৃজনশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কাঠামো রচনায় প্রত্যয় ঘোষণা করে সেই প্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বরের ঢাকা-ওয়াশিংটন বার্ষিক অংশীদারি সংলাপের প্রথম দফায় আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে আলোচিত হতে থাকবে উভয় দেশের প্রথম দফা বার্ষিক অংশীদারি সংলাপ শেষ হবার এক সপ্তাহ পর আগামী ২৬ ২৭ সেপ্টেম্বর উভয় দেশের স্পর্শকাতর সামরিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সামরিক সংলাপের তারিখ ধার্য করা হয়েছে
যে কোন দ্বিপাক্ষিক বহুপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো সংলাপ কারণ, পারস্পরিক  আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বা দেশসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা তাদের বিভিন্ন জড়তা অপছন্দের বিষয় বা উপাদানসমূহ নির্মূল করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থরক্ষায় কার্যকর চুক্তি, এমওইউ (MOU) চূড়ান্ত ঘোষণা প্রভৃতি পর্যায়ের সম্পর্ক কাঠামো গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে
পররাষ্ট্র নীতির সংলাপ কৌশলের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের প্রকৃতি পরিধির তাত্পর্য অনুধাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার সংলাপের উদ্দেশ্য লক্ষ্যসমূহ এবং সেই লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রসমূহ পর্যালোচনা করলে সহজেই বুঝা যাবে উক্ত সংলাপ বাস্তবায়ন কতটুকু কঠিন জটিল
হিলারীর ঢাকা সফরকালে স্বাক্ষরিত অংশীদারিত্ব ঘোষণার লক্ষ্যসমূহ ছিল () বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, () বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের লক্ষ্যসমূহ অর্জনের চেষ্টা করা, () বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে উভয় দেশের অভিন্ন স্বার্থ সংরক্ষণ করা, () আন্তর্জাতিক অংগনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অংশীদারি চুক্তিকে উভয়ের জাতীয় স্বার্থ অর্জনে কার্যকর করা এবং () বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের একে অন্যের প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বের চেতনা বহন করা
সব লক্ষ্যসমূহ অর্জনে যে ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের অংগীকার করা হয় তার মধ্যে মূলত বাণিজ্যে, উন্নয়ন নিরাপত্তাকে সর্বাধিক বিবেচ্য বিষয় হিসেবে অভিহিত করা হয় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক সংলাপে বিষয়গুলোকে সমধিক গুরুত্ব দিলেও আরো অনেক বিষয় সংলাপের টেবিলে নিয়ে আসা হয় সেগুলো হলো-() খাদ্য নিরাপত্তা, () মা শিশু স্বাস্থ্য, () পরিবার পরিকল্পনা, () জলবায়ু পরিবর্তন, () গণতন্ত্রের শক্তিশালীকরণ, () নারীর ক্ষমতায়ন, () মানবাধিকার সংরক্ষণ, () সুশীল সমাজের বিকাশ, () গ্রামীণ ব্যাংক, (১০) গণমাধ্যমের ভূমিকা ইত্যাদি পূর্বেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে, ১৯ সেপ্টেম্বরের আলোচনায় মূলত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন মিটিং অনুষ্ঠিত হবে তবে দ্বিতীয় দিনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুযেমন নিরাপত্তা কৌশলগত বিষয়সমূহ নিয়ে সংলাপ চলবে সে মতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথম দিনে নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা তিনটি ইস্যুতে আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয় এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাস দমন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের সুযোগ বৃদ্ধি, মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ একাউন্টে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তিকরণ, বাংলাদেশে বর্ধিত উন্নয়নে সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক কোটামুক্ত সুবিধা দেয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে
প্রশ্ন হলো এত অসংখ্য বিষয়ে সীমিত সময়ের আলোচনা সংলাপে কি কি লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়? যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশের মাটিতে বসে যে কোন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এমন অসংখ্য বিষয় অন্তর্ভুক্তকরণে কেবল বিরক্তিকর অবস্থারই সৃষ্টি হবে এমন সব সংলাপে পূর্বাহ্নেই সুপরিকল্পিত, সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট, স্বল্প এ্যাজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয় তাতে সংলাপের গতিবিধি এবং তার কার্যকারিতার গন্তব্য পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ সৃষ্টি হয় এলোমেলো, বিক্ষিপ্ত অসংখ্য এজেন্ডার অবতারণা কেবল রচনা লিখন রচনা পাঠের আসরের চিত্র প্রদর্শিত করে এবং তা কোন ফলপ্রসূ লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিক নির্দেশনা দিতে পারে না
দ্বিতীয়ত, দুদেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস বিশাল সংলাপ বহরের নেতৃত্ব দেন ওয়াশিংটন সংলাপে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ দূতাবাস ছাড়াও বাণিজ্য, বিদ্যুত্ জ্বালানি, শ্রম জনশক্তি, স্বরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করেছেন বিশাল সংলাপ টিমের বহর দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সকল লক্ষ্য এবার অর্জিত হচ্ছে নিঃসন্দেহে সংলাপ বৈঠকে অংশ নেয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিবৃন্দের পেছনে যে বিশাল অর্থ ব্যয়িত হয়েছে, তার পূর্ব পরিকল্পনা কি সুদূরপ্রসারী ছিল? ব্যয়িত অর্থের বিনিময়ে সংলাপের অর্জনের জমা-খরচ লভ্যাংশের অংক মিলানো হয়েছে কি? একটু ভেবে চিন্তে অগ্রসর হলে বিশাল ব্যয়ের ভার অনেকটা হ্রাস করা যেত পররাষ্ট্র পর্যায়ের আলোচনায় পররাষ্ট্র সচিবসহ কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি সৃজনশীল কার্যকর টিম গঠন প্রয়োজন ছিল বহু আগেই এবং সে ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রতিনিধিবৃন্দের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সমমর্যাদায় প্রতিনিধিবৃন্দের উপস্থিতি ছিল সংলাপ বাস্তবায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত পত্রিকা মারফত জেনেছি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারী ওয়েনডি আর শারমেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কোন্ কোন্ মন্ত্রণালয়ের কারা কারা উপস্থিত ছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ অবগত হলে বিশ্লেষণে সুবিধা হতো
চতুর্থত, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে অনুষ্ঠিত সংলাপের দ্বিতীয় দফা দুদেশের সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এতে স্বরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা যুক্ত হয়েছেন আগামী ২৬ ২৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংলাপকে তাইসামরিক সংলাপঅভিহিত না করেপ্রতিরক্ষা সংলাপহিসেবেই বিবেচিত করা হচ্ছে হঠাত্ কি কারণে সামরিক সংলাপকে পরিবর্তন করেপ্রতিরক্ষা সংলাপেপরিণত করা হলো, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন এতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিময়তা বৃদ্ধি পাবে ঢাকা-ওয়াশিংটনেরপ্রতিরক্ষা সংলাপেরবিষয়বস্তু পূর্বাহ্নেই যথার্থ পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে পরিশীলিত করা উচিত তাহলে ২৬ ২৭ তারিখের অনুষ্ঠেয় সংলাপে বাংলাদেশ প্রতিনিধিগণ সুদূরপ্রসারী প্রতিরক্ষা-লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন
পঞ্চমত, সদ্য সমাপ্ত সংলাপের লক্ষ্যসমূহ বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলো বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের বিষয় বাহ্যিক প্রতিফলনে হঠাত্ অনেকেই ভেবে খুশী হবেন যে, সংলাপের লক্ষ্য ক্ষেত্রের সবগুলোই বাংলাদেশের স্বার্থ-বান্ধব রাজনৈতিক বাস্তববাদের (Political realism) অন্ধ অনুসারী যুক্তরাষ্ট্র স্বীয় ক্ষমতা স্বার্থচিন্তা পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থে লক্ষ্যে কেন সংলাপে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, প্রশ্ন ভাবা উচিত কূটনৈতিক যেকোন উদ্যোগ সফল হয় অংশগ্রহণকারী পক্ষের পারস্পরিক স্বার্থার্জনের দর কষাকষির মধ্য দিয়ে সদ্য সমাপ্ত সংলাপের আলাপচারিতায় মনে হতে পারে কেবল বাংলাদেশের স্বার্থ   লক্ষ্য বাস্তবায়নের একপক্ষীয় এজেন্ডা চরিতার্থ করতে যুক্তরাষ্ট্র মহানুভব বন্ধু-রাষ্ট্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ  এটা যদি সত্যি হয় তাহলে সব বাংলাদেশীর আনন্দ-উচ্ছ্বাস উপচে পড়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের আপাতঃ অদৃশ্য অথচ সুদূরপ্রসারী কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য এখন থেকে জারি রাখা সংলাপ বৈঠকে প্রচ্ছন্ন রয়েছে তার একটা তালিকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরে তৈরি করলে এবং সেই যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাব বাংলাদেশের প্রতিনিধিবৃন্দের মন মানসে জাগরিত থাকলে সংলাপ পরিচালনায় অধিকতর সফলতা লাভের সম্ভাবনা থাকবে
ঢাকা থেকে প্রকাশিতদ্য ডেইলী স্টারের১৫ সেপ্টেম্বর সংখ্যার শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ‘Partnership talks with US’ শীর্ষক খবরে মার্কিন স্বার্থের বিষয়ে আলোকপাত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণবাণিজ্য বিনিয়োগ সহযোগিতার কাঠামো চুক্তি’ (Trade and Investment Corporation Framework Agreement-Ticfa) টার দ্রুত বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হবেন প্রসংগত উল্লেখযোগ্য যে, গত প্রায় বছর ধরে বাংলাদেশের শিল্প কারখানায় কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের মান (Labor standard) নির্ধারণ বিতর্কে জড়িয়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দীর্ঘপ্রতীক্ষিত টিকফা চুক্তি বাস্তবায়ন হতে পারেনি
পরিশেষে আমরা যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শক্তিশালী স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজনে উভয় দেশের মধ্যে ঘন ঘন সংলাপ বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার উপর সমধিক গুরুত্ব প্রদানে উভয় দেশের নীতি নির্ধারকগণের প্রচেষ্টার প্রতি যথোচিত সম্মান শুভেচ্ছা প্রদর্শন করছি উভয় দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে এসকল সংলাপ পারস্পরিক সম্মান সহযোগিতার মূলনীতি মেনে অনুষ্ঠিত হলে উভয় দেশের পররাষ্ট্র নীতিকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যেতে পারবে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার পথে বাংলাদেশের মত উদীয়মান প্রতিশ্রুতিশীল উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন অনুরূপভাবে বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য লাভে বাংলাদেশের কূটনীতি অধিকতর দক্ষতা অর্জন করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা বন্ধুত্বের বন্ধনে পারস্পরিক সহযোগিতার মূলনীতি লালিত হোক দুই  দেশের সম্প্রতি শুরু হওয়া নীতির সংলাপ সম্ভাবনা
n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mramin68@yahoo.com